• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ঠান্ডা মাথায় দুইজনকে একই স্টাইলে খুন করে সুরভি

  নিজস্ব প্রতিবেদক

০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৫৭
ধানমন্ডিতে জোড়া খুন
গ্রেফতার গৃহকর্মী নাহিদা আক্তার সুরভি (ছবি : সংগৃহীত)

রাজধানীর ধানমন্ডিতে শিল্পপতির ফ্ল্যাটে তার শাশুড়ি আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতিকে নৃশংসভাবে হত্যার দায় স্বীকার করেছে তাদের নতুন গৃহকর্মী নাহিদা আক্তার সুরভি। একই সঙ্গে খুন করার ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন তিনি। তার বর্ণনায় বুঝা যায় খুনটি সে খুব ঠান্ডায় মাথায় করেছেন এবং পেশাদার খুনি স্টাইলে খুন করেছেন। তবে তার দেওয়া বর্ণনায় বিভ্রান্তিকর তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। এতে সন্দেহ করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।         

রবিবার (৩ নভেম্বর) রাত ১০টায় রাজধানীর আগারগাঁও থেকে সুরভি আক্তারকে গ্রেফতার করে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। ওইদিন সন্ধ্যায় আগারগাঁও বস্তিতে আত্মগোপনের চেষ্টা করলে পত্রিকায় ছবি দেখে সুরভিকে পুলিশে তুলে দেয় স্থানীয় জনতা। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয় ধানমন্ডি থানায়। 

তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া বাড়ির নতুন গৃহকর্মী সুরভি। গ্রেপ্তারের পর সুরভি জানায়, স্বর্ণালঙ্কার লুট করতে সে একাই ফল কাটার ছুরি দিয়ে দুজনকে হত্যা করেছে। কিন্তু ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আবার বলেছে ভিন্ন কথা। সে বলেছে, বাসা থেকে বের হতে বাধা দেওয়ায় খুন করেছে দুজনকে।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সুরভির ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, সে মানসিক ভারসাম্যহীন; নয়তো চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে। তাকে ১০ দিনের রিমান্ড চান তারা।

ডিবি পুলিশ সূত্র জানায়, ৩ বছর আগে নিহত আফরোজা বেগমের বাসার পাশের পানের দোকানদার সুমনের সঙ্গে সুরভির পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সময় ঢাকার একটি শপিংমলে সুরভি ক্লিনার হিসেবে কাজ শুরু করে। কিছুদিন মিরপুরের একটি গার্মেন্টেও কাজ করে সে। সুরভি তার বড় বোনকে নিয়ে আগারগাঁও বিএনপির বস্তিতে ভাড়া থাকত। সংসারে টানাপোড়েনের কারণে পান দোকানি সুমনকে সুরভি জানায়, যে কোনো বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেও সে রাজি আছে। এর সূত্র ধরে নিহতের জামাতার গাড়িচালক বাচ্চু সুরভিকে ওই বাসায় নিয়ে যায়।

ঘটনার দিন দুপুরের পর ওই বাসায় আর কাজ করতে না চাওয়ার কথা জানাতে বাচ্চুকে একাধিকবার ফোন দেয় সুরভি। কিছুক্ষণ পর বাচ্চুর ফোনটি বন্ধ পায় সে। এতে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা মারা দেখে সুরভি। এ সময় আফরোজা বেগমের কাছে দরজার চাবি চায় সে। কিন্তু তিনি চাবি না দিয়ে তাকে বকাঝকা করেন। অন্য গৃহকর্মী দিতিও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে বিকালে দুজনকেই হত্যা করে ফ্ল্যাট ছাড়ে সে।

অন্যদিকে সুরভির বক্তব্য ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে পাওয়া তথ্যচিত্রের বরাত দিয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, গত শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিমের ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসায় ঢুকে সুরভি। নিহত আফরোজা বেগমের জামাতার বডিগার্ড বাচ্চু তাকে ওই বাসায় নিয়ে যান। এর পাঁচ দিন আগে বাচ্চুর সঙ্গে সুরভির পরিচয় হয়। ঘটনার দিন বিকাল সোয়া ৪টার দিকে মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবার ফ্ল্যাট থেকে সুরভিকে নিয়ে আফরোজা বেগম পঞ্চম তলায় নিজের ফ্ল্যাটে যান। সেখানে কথা বলে সুরভিকে নতুন গৃহকর্মী হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর মাঝেই বাচ্চু খারাপ আচরণ করে সুরভির সঙ্গে। এতে সে এই বাসায় কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একপর্যায়ে বাচ্চু বাসা থেকে বের হয়ে গেলে সুরভিও চলে যেতে চায়। এ সময় গৃহকর্মী দিতি তাকে বাধা দিলে গেস্টরুমে দুই গৃহকর্মীর মধ্যে ঝগড়া ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে সুরভি রান্নাঘরে গিয়ে ফল কাটার বড় ছুরি নিয়ে এসে সেটি দিয়েই দিতির গলা, বুক ও পিঠে আঘাত করে।

হাতে ছুরি নিয়ে ঠান্ডা মাথায় পাশের ঘরে গিয়ে আফরোজা বেগমকেও বাসা থেকে চলে যাওয়ার কথা জানায় সুরভি। তিনি জানতে চান, দিতি চিৎকার করল কেন? সুরভি বলে, চলে যেতে চাওয়ায় দিতি বাধা দিয়েছে, তাই ঝগড়া হইছে। এ সময় আফরোজাও রেগে বলেন, তোকে তো বাচ্চুও যেতে নিষেধ করছে। এখন যেতে পারবি না, ও (বাচ্চু) এলে যাস। এ সময় সুরভি আফরোজা বেগমের ঘাড়ে, বুকে ও পিঠে ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরে সামনে থাকা একটি আইফোন ও আফরোজার হাতের স্বর্ণের বালা নিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যায় সুরভি।

রক্তমাখা শরীরে চারতলায় নেমে একটি বাথরুমে হাত-পা ধুয়ে নিচে নামে। বাড়ির দারোয়ানকে ভুল বুঝিয়ে ৬টা ১০ মিনিটে ওই বাড়ি ছাড়ে সে। ভবনের অদূরে রক্তমাখা সেন্ডেল ফেলে চলে যায় মিরপুর; তারপর মহাখালী। এর মধ্যেই আইফোনটি চার হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। সেই টাকার বেশিরভাগই খরচ করে ফেলেছে বলেও জানিয়েছে সে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার বাচ্চুও প্রথম থেকে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন, তথ্য গোপন করেছেন। তিনি বলেছিলেন, সুরভিকে তিনি চিনতেন না। এক পান বিক্রেতার মাধ্যমে তার সঙ্গে সুরভির পরিচয় হয়। অথচ হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন আগেও বাচ্চুর সঙ্গে যে সুরভির কথা হয়েছে তার প্রমাণ মিলেছে। ঘটনার আগে-পরে মোবাইল ফোনে ৫০টিরও বেশি কল আদান-প্রদান হয় তাদের মধ্যে। 

তাদের মোবাইল কলের সূত্র ধরেই শনিবার ভোলার কালুপুরে সুরভির গ্রামের বাড়িতে তার পরিবারের সন্ধান পায় পুলিশ। স্বজনদের দিয়ে যোগাযোগ করানো হয় সুরভির সঙ্গে। এই ফোনকলের সূত্র ধরেই রবিবার সন্ধ্যার পর আগারগাঁও এলাকায় সুরভির সন্ধান মেলে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল্লাহেল কাফি জানান, সুরভি হত্যার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, বাসা থেকে বের হতে না দেওয়ায় দুজনকে একাই হত্যা করেছে সে। তবে তার বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক হওয়ায় সন্দেহ করছে পুলিশ। 

এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, তার কথা শুনে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে। আবার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভানও করতে পারে। মামলাটি বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত শুক্রবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসায় খুন হন গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম এবং তার গৃহকর্মী দিতি। ঘটনার দিন বিকালে ওই বাসায় কাজ করার জন্য এক গৃহকর্মীকে নিয়ে এসেছিলেন আফরোজা বেগমের মেয়ের জামাতা মনির উদ্দিন তারিমের ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চু।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ কিলিং মিশনে অংশ নেয় হত্যার দিনই নিয়োগ পাওয়া আনুমানিক ২১ বছরের নতুন গৃহকর্মী ছাড়াও কয়েকজন। খুনের আগে ওই শিল্পপতির বাড়ির সামনে জড়ো হয় ওই গৃহকর্মীসহ খুনির দল। জোড়া খুনের পর ঠান্ডা মাথায় ফ্ল্যাট ও ভবন থেকে বেরিয়ে এলাকা ছাড়ে তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এ হত্যার সঙ্গে নতুন গৃহকর্মীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ওই নারী কাজের বুয়ার বেশে বাসায় ঢুকেছিলেন সঙ্গে ছিলেন গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার বাচ্চু। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বাচ্চু চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যা ৫টা ৩২ মিনিটে ওই নতুন গৃহকর্মী ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় নামেন। এরপর তিনি লিফটে ওঠেন। এ সময় লিফটের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় ওই নারীর দুই পায়ের স্যান্ডেলে রক্ত লেগে থাকতে দেখা যায়।

এ দিকে জোড়া এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রবিবার (৩ নভেম্বর) ধানমন্ডি থানায় অজ্ঞাত এক নারীসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত আফরোজার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা। আসামিরা হলেন- বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড নুরুজ্জামান, আফরোজা বেগমের মেয়ে দিলরুবার স্বামী কাজী মনির উদ্দিনের বডিগার্ড বাচ্চু, বাড়ির কেয়ারটেকার বেলাল, প্রিন্স ও অজ্ঞাত ২৭ বছরের এক নারী। অজ্ঞাত ওই নারী ছাড়া বাকি ৪ জনই পুলিশ হেফাজতে ছিলেন।

তবে শিল্পপতি কাজী মনির উদ্দিন তারিমের পিএস বাচ্চুকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য মতে অভিযুক্ত নতুন গৃহকর্মী সুরভীর খোঁজে পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল সম্ভাব্য সব জায়গায় অভিযান চালায়। অবশেষে তাকে গ্রেফতারে সফল হয় পুলিশ।

ওডি/এআর 

অপরাধের সূত্রপাত কিংবা ভোগান্তির কথা জানাতে সরাসরি দৈনিক অধিকারকে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড