• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

বাংলাদেশিদের ভারত বিদ্বেষ কি কেবল ক্রিকেটের ক্ষেত্রেই?

  ক্রীড়া ডেস্ক

১২ জুলাই ২০১৯, ০২:৫৭
শাহাবাগে বিশ্বকাপ ক্রিকেট
শাহাবাগে বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপভোগ করছেন উপস্থিত জনতা। (ছবি : সংগৃহীত)

চলতি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সেমিফাইনালের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ভারতের পরাজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের সমর্থকদের ব্যাপক উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

যদিও বাংলাদেশ এর আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে। তবে ভারতের এই হার অনেককেই আনন্দিত করেছে, যা তারা প্রকাশ করেছেন নিজেদের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, কমেন্ট কিংবা শেয়ারের মাধ্যমে।

'বিবিসি বাংলা'র ওয়েবসাইটে সেমিফাইনালে ভারতের এই পরাজয় নিয়ে প্রকাশিত খবরের কমেন্টে রুনেট বড়ুয়া নামে এক পাঠক লিখেছেন, 'অহংকার পতনের মূল। প্রতিপক্ষকে সম্মান করাও খেলার অংশ, যা ভারত কখনো দেয়নি।'

তার এই কমেন্টের শেষ দিকে প্রতিপক্ষকে খোঁচা দিয়ে বানানো বিজ্ঞাপনেরও সমালোচনা করা হয়েছে। 

তাছাড়া আজিজা আইরিন নামে আরেকজন লিখেছেন, 'আমি খুব খুশী। নিউজিল্যান্ডকে অভিনন্দন।' একই সঙ্গে আইশা রহমান মন্তব্য করেছেন, 'ভারতের দর্প ভেঙে চুরমার।'

আবু সালেহ তার কমেন্টে লিখেছেন, 'ভারতের প্রতি এদেশের মানুষের কতটা ঘৃণা সেটা তারা ক্রিকেট খেলায় পরাজিত হলে রাস্তাঘাট আর ফেসবুক দেখলে বোঝা যায়।'

ঠিক একইভাবে নিজেদের স্ট্যাটাস ও কমেন্টের মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং দেশটির ক্রিকেটারদের মুন্ডুপাত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যে এই ভারত বিদ্বেষ কি শুধুই ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই?

অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ ও ভারত মধ্যকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক আগে থেকেই অনেক ভালো। যদিও এই সম্পর্ক এখনও অপরিবর্তিত, তবুও বাংলাদেশিদের মধ্যে তাদের ভারত বিদ্বেষ আঞ্চলিক ক্রিকেটের পাশাপাশি রাজনীতিও ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

ধনি আউট

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরছেন এমএস ধনি। (ছবিসূত্র : মুম্বাই লাইভ)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষক রাজীব নন্দীর মতে, ক্রিকেটের এই জয়-পরাজয়ে আনন্দ ও ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত আবেগি হয়ে ওঠছেন।

তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় ২২ গজের খেলার মধ্যে রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও অসমাপ্ত প্রসঙ্গগুলো চলে আসা খুবই স্বাভাবিক।'

উদাহরণ হিসেবে এই শিক্ষক বলেন, 'ভারত হারলে তাদের কাশ্মীরের স্বাধীনতাপন্থি মানুষের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ কাজ করে, আবার বাংলাদেশ যখন ইংল্যান্ডকে চট্টগ্রাম টেস্টে পরাজিত করে তখন চট্টগ্রামের স্থানীয় পত্রিকায় বড় করে 'ব্রিটিশ বধ' শিরোনামে হেডলাইন হয়। আবার অনেকে বলেন, পাকিস্তানকে বাংলাদেশ ক্রিকেটে হারালে একাত্তরের বিজয়ের আনন্দ পায়।'

বিষয়গুলো সাধারণ জনতার 'ছদ্ম বাস্তবতা' তৈরির প্রবণতা থেকে আসে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'এক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা সমাধান না করেই জাতীয়তাবাদী বা দেশাত্মবোধ চিন্তাধারা থেকে জন্ম নেওয়া অপ্রয়োজনীয় আবেগকে প্রাধান্য দেয় মানুষ।'

এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবায়েদা নাসরিন বলেন, 'উপমহাদেশে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টার কারণেও মানুষের মধ্যে ভারত বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে।'

তার মতে, 'বলা হয়ে থাকে, বিশ্বকাপে আইসিসি চায় ভারত ফাইনাল খেলুক। স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, ভারত ফাইনাল খেললে তাদের দর্শক, বড় বড় বিজ্ঞাপন সংস্থা, সম্প্রচার স্বত্বের হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয় আইসিসি।'

যে কারণে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক হিসেব বাদেও মনস্তাত্বিকভাবেও বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারত বিরোধিতা তৈরি হয়। যা একরকম স্বাভাবিক বলেই মনে করেন বেশিরভাগ সমাজবিজ্ঞানীরা।

জোবায়েদা নাসরিনের মতে, 'ঐতিহাসিকভাবে দেখতে গেলে, দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হওয়ার কারণে এখনও উপমহাদেশের দেশগুলোতে ধর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।'

তিনি বলেন, 'ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা বিজেপি যখন ভারতে নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং সেখানে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নির্যাতন হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতাও প্রভাবিত হয়।'

তাছাড়া সীমান্তে সংঘাত, আঞ্চলিক রাজনীতি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ভারতের আধিপত্য ও দেশটির উগ্র হিন্দুত্ববাদের ক্রমাগত উত্থান বাংলাদেশিদের মধ্যে অবচেতনভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হয়েছে। যা খেলার ফলাফলের মাধ্যমে প্রকাশ পায় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

যে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকার ফলে মানুষের এই জাতীয়তাবাদী চেতনার বহি:প্রকাশ অনেকাংশে স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক তীব্র হয় বলে মনে করেন ঢাবির এই শিক্ষক। তার মতে, 'সোশ্যাল মিডিয়া হলো আগুনে ঘি ঢালার মতো।'

আরও পড়ুন :- ভারতকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প

নাসরিন বলেন, 'বিশ্বকাপ চলাকালীন সময় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, শিশু নির্যাতনসহ বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে; যা নিয়ে তরুণ সমাজ সামাজিক মাধ্যমে খুব একটা আলোচনা করেনি, যতটা না বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ভারতের হার নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে।'

ওডি/কেএইচআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড