• শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বন্দর নগরী ভৈরব এখন ‘ছিনতাই’ নগরী

  ভৈরব প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:০১
আহত ব্যক্তি
ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত ব্যক্তি (ছবি : দৈনিক অধিকার)

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সন্ধ্যা নামলেই ‘ছিনতাই’ আতঙ্ক কেঁপে ওঠে সাধারণ জনগণ। এই বন্দর নগরী এখন ‘ছিনতাই’ নগরীতে পরিণত হয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে গেল দুই সপ্তাহে ঘটছে ৭টিরও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা। শুধু মাত্র নগদ টাকা আর দামি মোবাইল ফোন হাতিয়ে শান্ত হয়নি ছিনতাইকারীরা। তাদের ধারালো ছুরিকাঘাতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। হঠাৎ করে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় ছিনতাই আতঙ্কে শহরের ব্যবসায়ী ও পথচারীরা।

জনমনে প্রশ্ন উঠেছে কিছু দিন পর পর একের পর এক ছিনতাইকারীকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হচ্ছে। তারপরও কেন কমছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে ভৈরব থানার ওসি মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, শহরে প্রায় অর্ধশতাধিক চিহ্নিত ছিনতাইকারী থাকলেও এদের অনেকেই এখন জেলে রয়েছে। তবে, ভৈরবের সঙ্গে আশপাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নরসিংদীর যোগাযোগ ভালো থাকার কারণে প্রতিদিন রেল ও সড়ক পথে ছিনতাইকারীদের একাধিক চক্র এই শহরে প্রবেশ করছে।

ফলে তারা সুযোগ বুঝে ছিনতাই শেষে আবার সটকে পড়ে। তাছাড়া ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ না দেওয়ার কারণেও সহজে কাউকে আটক করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বন্দরনগরী ভৈরব। একই সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌ পথের রয়েছে অবাধ যোগাযোগ। ফলে শহর এবং শহরের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কল-কারখানাসহ শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও এই ভৈরবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছের আড়তসহ কয়লার একটি বড় মোকাম রয়েছে। ফলে শহরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মালামাল আমদানি-রপ্তানি করা হয়। আর এসব নগদ টাকা লেনদেনের জন্য শহরে ৩৫টিরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে।

এসব ব্যাংকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে টাকা জমা না দিতে পারলে বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। ছিনতাইকারীদের চক্র সুযোগ বুঝে অতর্কিত হামলা চালিয়ে কেড়ে নেয় নগদ টাকা এবং দামি মোবাইল ফোন। আর এসব মালামাল দিতে সামান্য দেরি করলেই ছিনতাইকারীদের হাতে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে করে ছুরিকাঘাত। এতে একের পর এক ঘটছে হতাহতের ঘটনাও।

জানা গেছে, গেল ৩০ আগস্ট শহরের মনামরা ব্রিজ এলাকায় রাত ৯টার দিকে পিয়াস নামে এক ব্যবসায়ীর বুকে ছুরিকাঘাত করে নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় স্বপন নামে এক ছিনতাইকারী। পরে গুরুতর আহত পিয়াসকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর শহরের নাটাল মোড়ে রাত ১০টার দিকে এক পথচারীকে ছুরিকাঘাত করে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে পাঠায়।

৯ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে পৌর কবরস্থানের সামনে দুইজনকে ছুরিকাঘাত করে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। শহরের শুভ নামে এক চিহ্নিত ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভৈরব বাজারের কর্মস্থল থেকে রিয়াদ হোসেন ও আক্রাম আহমেদ নামে দুই বন্ধু রিকশাযোগে বাড়ি ফেরার পথে শহীদ আইভি রহমান পৌর স্টেডিয়ামের সামনে ছিনতাইকারী কবলে পড়ে। এ সময় তাদেরকে ছুরি ঠেকিয়ে দামি দুটি মোবাইল ফোনসহ ৩টি সেট হাতিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।

এছাড়াও গত ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একই এলাকায় আব্দুস সালাম এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়াও রাত ৯টার দিকে এক রিকশাচালককে ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরের রেল স্টেশন সড়কের পলাশের মোড় থেকে পৌর কবরস্থান, নাটাল মোড় থেকে ফেরিঘাট, রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেলওয়ে কোলনী মন্দির, মেঘনা জ্বালানী তেলের ডিপো ঘাট থেকে মনামরা ব্রিজ, ভৈরব বাজারের হলুদপট্টি থেকে লালপুর ঘাট, উপজেলা পরিষদ থেকে শম্ভুপুর রেল গেইট, শহীদ আইভি রহমান পৌর স্টেডিয়াম থেকে চন্ডিবের শহীদ আইভি রহমান চত্বর সড়ককে বেছে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। ফলে এসব সড়কে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও শহরের অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভিন্ন অলি-গলিতে সুযোগ পেলে ছিনতাইকারী হাতিয়ে নেয় নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র।

যদিও ভৈরবে বেঙ্গল, হাইওয়ে, রেলওয়ে থানাসহ ভৈরব বাজার ফাঁড়ি ও নৌ পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই শহরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পও রয়েছে। এরপরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে ছিনতাইকারীরা। এসব ছিনতাইকারীদের অধিকাংশ সদস্যের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছর। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা এবং ছিনতাইকারীদের একের পর এক ঘটনা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা ঝড়।

এদিকে কেউ কেউ আবার এসব ঘটনার জন্য রাজনৈতিক মহলের নেতাদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করছেন। আবার কেউ নাগরিক আন্দোলনের জন্যও ডাক দিচ্ছেন।   

এ প্রসঙ্গে ভৈরব থানার ওসি মো. মোখলেছুর রহমান জানান, প্রায় প্রতিদিনই একজন, দুইজন আবার কখনো তার চেয়েও বেশি সংখ্যায় ছিনতাইকারীকে আটক করছে পুলিশ। তাছাড়া গেল এক বছরে পুলিশের হাতে প্রায় ৩ শতাধিক ছিনতাইকারী ধরা পড়েছে। পরে মামলা দিয়ে তাদের সবাইকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। 

ওসি জানান, প্রতিদিনই ছিনতাইকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এর পেছনের কারণ হলো মাদক। আর মাদকের বা নেশার টাকা জোগাড় করতেই এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ না দেওয়ায় এবং হাতেনাতে আটক করতে না পারার কারণে অনেকেই রয়েছে পর্দার আড়ালে। তাই, সবাইকে সচেতন হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে সমাজের প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকরা যদি তাদের সন্তানের প্রতি নজর রাখেন, কখন সে বাসা থেকে বেরোচ্ছে, কখন বাসায় ফিরছে, কার সাথে মিশছে। তাহলে সমাজ থেকে কমবে শিশু-কিশোর অপরাধ এবং কমবে ছিনতাইয়ের ঘটনা। 

ওডি/এসজেএ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড