• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

নিজ দেশে ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের দুই শর্ত||এ পি জে আব্দুল কালামের স্মৃতিতে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী  ||উদ্বেগ থাকলেও ভারতের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ||ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি ঢাকতেই ছাত্রদলের কাউন্সিল বন্ধ : রিজভী ||কাশ্মীরে জঙ্গি অনুপ্রবেশের অভিযোগে সীমান্তে‌ হাই অ্যালার্ট||ভারতের পর এবার বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের||সোমবার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেবেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক||মেক্সিকোয় কুয়া থেকে ৪৪ মরদেহ উদ্ধার করল বিজ্ঞানীরা||অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না : কাদের    ||সৌদির তেল স্থাপনাতে হামলায় ইরানকে দায়ী করল যুক্তরাষ্ট্র

ছিঁচকে চোর থেকে ইউপি চেয়ারম্যান, শূন্য থেকে কোটিপতি

  সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৩১
ইউপি চেয়ারম্যান
ইউপি চেয়ারম্যান নবীদুল ইসলাম (ছবি : দৈনিক অধিকার)

অল্প সময়ের ব্যবধানে ছিঁচকে চোর থেকে কীভাবে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, প্রভাব-পতিপত্তি ও কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় তার জলজ্যান্ত উদাহরণ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউপির চেয়ারম্যান নবীদুল ইসলাম (৩৬)। সরেজমিন ঘুরে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

কিশোর বয়সেই নিষিদ্ধ চরমপন্থি দলের সঙ্গে দরিদ্র নবীদুলের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন্ধকার জগৎ ছেড়ে তার বাহিনীর সঙ্গে নবীদুলও আলোর পথে চলে আসেন। এর তিন বছরের ব্যবধানে ২০০১ সালে সয়দাবাদ ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল হোসেন খুন হয়। নবীদুল ওই মামলায় প্রধান আসামিদের তালিকায় থাকলেও সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে সকল আসামি পরবর্তীতে মামলা থেকে খালাস পেয়ে যায়।

এরপর ২০০৪ সালে বিএনপি সমর্থক নবীদুল আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। পরে তিনি ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হন। এরপর অভাবের তাড়নায় ছিঁচকে চুরি ও ছোটখাট অপরাধে জড়িয়ে পড়তে থাকে সে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ‘অভি এন্টারপ্রাইজ’ বাসে হেলপারিও করেছেন তিনি। এ অবস্থায় দলের ভেতরেও সে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তার শুরু করে। 

২০১০ সালে মূলিবাড়িতে বেগম খালেদা জিয়ার জনসভাস্থলে ট্রেন পোড়ানোর ঘটনার পর নবীদুলের ভাগ্য খুলতে থাকে। আলোচিত এ ঘটনাকে পুঁজি করে সে মামলা থেকে বাঁচাতে ও মামলায় ফাঁসাতে বিএনপি সমর্থিত কারিগর ও প্রামাণিক সম্প্রদায়ের তালিকা করে বিশাল অর্থ বাণিজ্য করে বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় বিশাল বাহিনী গঠন করে ধীরে ধীরে সে পুরো এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে অবস্থিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক নিয়ন্ত্রণসহ সেখানকার পুরাতন সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয় হতো তার মাধ্যমেই। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বমোহনপুর চর থেকে অবৈধভাবে বালু কেটে ট্রাকে করে বিক্রির কমিশন পেত সে। এছাড়াও পঞ্চসোনা ও গাছাবাড়ির বালুমহালও চলত তার ইশারায়। বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের জায়গায় মহাসড়কের মুলবাড়ির এলাকায় তার নেতৃত্বে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয় ট্রাক লোড-আনলোড পয়েন্ট। যেখানে অর্ধশতাধিক ট্রাক প্রতিদিন মালামাল লোড-আনলোড করে এবং দুই শতাধিক শ্রমিক এ কাজের সঙ্গে জড়িত। এছাড়াও এলাকার মাদক কারবারিরা তার ছত্রছায়ায় কারবার চালায় বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এরপর ২০১৫ সালে সদর থানা আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক সাইফুল ইসলাম খুন হয়। এ মামলা থেকে বাঁচাতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে নবীদুলের বিরুদ্ধে।

ট্রাক লোড-আনলোড পয়েন্ট (ছবি : দৈনিক অধিকার)

এ দিকে, একই বছরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পান তিনি। এ অবস্থায় ২০১৬ সালে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নবীদুল। ২০১৮ সালে দলের সম্মেলনে আবারও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন তিনি। 

এসব পোস্ট-পদবি ও প্রভাব খাটিয়ে নবীদুল ইতোমধ্যেই ২০টির মতো ট্রাক কিনেছিলেন, বর্তমানে রয়েছে ১২ থেকে ১৩টি। প্রায় ৪০ লাখ টাকায় কেনা মাইক্রোবাসে চলাচল করেন তিনি। মহাসড়কের পাশে মূলিবাড়ি এলাকায় ক্রয়কৃত সাড়ে ৪ শতক জায়গায় নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল পাঁচতলা ভবন। যা বর্তমানে ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পৈত্তিক ভিটায় রয়েছে দুইতলা বিশিষ্ট আরেকটি ভবন। সেখানে দুই স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার বসবাস। সম্প্রতি হজব্রত পালন করেছেন। তার আগে অন্তত পাঁচ হাজার লোককে দাওয়াত করে মজলিস দিয়েছিলেন নবীদুল।

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ের দক্ষিণ অংশে ২২ একর জায়গায় সম্প্রতি গড়ে উঠেছে সোলার পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্প। সেখানে মাটি ভরাট ও জায়গা প্রস্তুতের পাঁচ কোটি টাকার কাজেও তার ভাগ রয়েছে।

সরেজমিনে গেলে ট্রাক লোড-আনলোড পয়েন্টে দায়িত্বরত আব্দুস সালাম জানান, ‘এলাকায় যাই হোক চেয়ারম্যান তো জানেই। লোড-আনলোড পয়েন্ট চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণেই আছে। আগে এখান থেকে আয়-রোজগার ভালো হলেও বর্তমানে কিছুটা ভাটা পড়েছে।’

নবীদুলের পৈত্তিক বাড়ির পাশের বাসিন্দা ও তার চাচাতো ভাই মুদি দোকানদার মামুন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার কিছু জায়গা দখল করে নবীদুল দুইতলা বাড়ি ও বাড়ির গেট নির্মাণ করেছে। তার প্রভাবের কারণে এ বিষয়ে কিছুই করতে পারছি না।’

চেয়ারম্যানের চাচাতো শ্যালক দুখিয়াবাড়ি কাঁঠালতলা এলাকার কালাম আলী জানান, ‘নবীদুলকে ভ্যান চালাতেও দেখেছি। এক সময় সে ছিঁচকে চোরও ছিল। রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে শূন্য থেকে কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় নবীদুল তার উদাহরণ।’

এ দিকে, চেয়ারম্যানের ইচ্ছাই চলে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সদস্য পরিষদে আসেন না। এমন অভিযোগ করেছেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাজী সেলিম। তিনি বলেন, পরিষদের সকল বরাদ্দ চেয়ারম্যানের ইচ্ছায় ভাগ-বণ্টন হয়। প্রকল্পগুলো সদস্যদের মধ্যে কিছুটা বণ্টন হলেও রাজস্বখাতের এক ভাগ আয়ের টাকা এককভাবে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন।  

নির্মণকৃত পাঁচতলা ভবন (ছবি : দৈনিক অধিকার)

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউপি চেয়ারম্যান নবীদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমার দুধেল গরুর খামার রয়েছে। এক সময় হোটেল ব্যবসা করেছি। সে কারণে আমার কিছু টাকা-পয়সা হয়েছে। আর যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করি সেটি বড় ভাইয়ের। পৈত্রিক ভিটার দুই তলা বাড়ি মায়ের জমানো টাকায় নির্মিত। তবে, পাঁচতলা ভবনটি আমার নিজস্ব। যমুনা নদীর বালুমহালে আমার কিছু অংশ আছে। মহাসড়কের পাশে অনেক আগে থেকে দুইটি লোড-আনলোড পয়েন্ট রয়েছে। যার একটি আমার নিয়ন্ত্রণে চলে। বর্তমানে সেতুর গোলচত্বর থেকে নলকা পর্যন্ত অনেকেই পয়েন্ট গড়ে তুলেছেন।’ এ সময় নিজের মালিকানায় ১২টি ট্রাক থাকলেও চারটির কথা স্বীকার করেন তিনি। 

ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজস্বখাতের এক ভাগ আয়ের টাকা ইউএনও স্যারের মাধ্যমে মিটিং করেই প্রকল্প তৈরি করা হয়। ওই টাকায় আমি কোনো কাচা কাজ করি না, শুধু পাকা বা দৃশ্যমান কাজ করি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা মুঠোফোনে জানান, মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ট্রাক লোড-আনলোড পয়েন্টগুলো উচ্ছেদের জন্য অনেক আগেই জেলা প্রশাসকের অফিসে পত্র দেওয়া হয়েছে। তারাই উচ্ছেদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। 

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিমপাড় থানার ওসি সৈয়দ শহিদ আলম জানান, লোড-আনলোড পয়েন্টের ট্রাকগুলো সেতু পারাপারের জন্য মহাসড়কে ওঠার সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে মাঝে-মধ্যেই ঘটে দুর্ঘটনা। এখানকার ধুলোবালির কারণে মহাসড়কে চলাচলকৃত যানবাহনগুলোকেও নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জায়গাটি সেতু কর্তৃপক্ষের হওয়ায় আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারছি না।

ওডি/আইএইচএন

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড