• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

বিলুপ্তির পথে সিলেটের হাওরের শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ

  ফয়ছল আহমদ, সিলেট

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:১২
হাওড়ের তীর ঘেষা উদ্ভিদ
কমে যাচ্ছে হাওরের তীর ঘেষা উদ্ভিদ (ছবি: দৈনিক অধিকার)

এক সময় নৌকা ভ্রমণে গেলে দেখা যেত নদী কিংবা হাওড়ের তীর ঘেষে সাদা কাশবন, করসের ফাঁকে ফাঁকে পানকৌড়ির উড়াউড়ি। সেই সঙ্গে স্বচ্ছ জলরাশির মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হিজলসহ নানা রকম জলঘেষা গাছের সারি। জ্যোৎস্না রাতে জলের সঙ্গে বনের এই মিতালী এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করতো। কিন্তু এখন হেলেঞ্চা, পানিকলা, দুধিলতা, গুঞ্জিকাটা, কলমি লতা, বনতুলসী লতা জাতীয় উদ্ভিদ আর সচারাচার চোখে পড়ে না। 

সিলেট অঞ্চলের হাওরের সঙ্গে হিজল, করসসহ অসংখ্য উদ্ভিদের নাম অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাওরকে নানা প্রজাতির মৎস্যসহ প্রাণিজ সম্পদে সমৃদ্ধ রাখতে এসব উদ্ভিদের ভ‚মিকা অপরিসীম। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য; পরিবেশের জন্য উপকারী এসব উদ্ভিদের অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। 

উদ্ভিদবিদরা জানিয়েছেন, সিলেটের হাওর থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে এমন উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা শতাধিক। হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখতে এসব উদ্ভিদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতনমহল।

পরিবেশের জন্য উপকারী অনেক উদ্ভিদের অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে (ছবি : দৈনিক অধিকার)

কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে রয়েছে- বুনো গোলাপ, মাখনা, দেউরি, আশহান, দুদুল, কাঁটাঝাউ, পাথুই, কার্ড, পউরা, আরাইল, কেশুর, আগরা, চিচরা, উপল, কুই, বলুয়া, বালাডুমুর, পানিকলা, দুধিলতা, গুঞ্জিকাটা ও বনতুলসী। এছাড়া হাওরের অতি পরিচিত উদ্ভিদ কচুরিপানা, আমড়া, সিংরা, দূর্বা, শাপলা, চাইল্লা, ঢোলকলমি ও হেলেঞ্চা  প্রভৃতি উদ্ভিদগুলো সিলেটসহ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরের এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য সার্বিক পরিবেশের ওপর।

হাওরপাড়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ অঞ্চলের অনেক উদ্ভিদই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেকগুলো বিলুপ্তির পথে। এতে  মৎস্য সম্পদের প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় হাওরের নানা প্রজাতির মাছেরও বিলুপ্তি ঘটছে।  এসব উদ্ভিদ বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে অনেক ছোট-বড় প্রাণিদের বাস্তুস্থান। কৃষি ও মৎস্যবান্ধব এসব  উদ্ভিদ বিলুপ্ত হওয়ার কারণে দেশের আমিষ উৎপাদনের অন্যতম উৎস হাওরাঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনা ক্রমেই ম্লান হচ্ছে। 

দক্ষিণ সুরমার লতিফা-শফি চৌধুরী মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আমিরুল আলম খান বলেন, হাওরের উদ্ভিদ জগৎকে রক্ষার জন্য আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এই উদ্ভিদকূলকে রক্ষা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সকলে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ভূমিকা রাখলে তা রক্ষা করা সম্ভব। তা না হলে হাওরের ঐতিহ্যবাহী এসব উদ্ভিদ একদিন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে পরিবেশ তথা মৎস্য সম্পদের ওপর।

এখনই উদ্যোগী না হলে হাওরের ঐতিহ্যবাহী এসব উদ্ভিদ একদিন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে (ছবি: দৈনিক অধিকার)

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে হাওর এলাকার মানুষজন ব্যক্তিস্বার্থে প্রকৃতি ধ্বংস করে অবকাঠামোগত পরিবর্তন করছেন। এছাড়া কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র জলকপাট ও বাঁধ নির্মাণে হাওরাঞ্চলের উদ্ভিদ বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ। এতে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান উৎপাদন ও পর্যাপ্ত মৎস্য আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ভিদ দিনে দিনে কমে গিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার কারণে কয়েক বছর ধরে সবজিসহ বিভিন্ন কৃষি ফসল উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।

এ বিষয়ে সিলেট ট্যুরিস্ট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহমদ বলেন, আগে বর্ষা মৌসুমে সিলেটের হাওরগুলোতে নৌকা ভ্রমণে গেলে হাওর তীরে হরেক রকমের উদ্ভিদ চোখে পড়ত। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। এসব উদ্ভিদ বিলুপ্ত হওয়ায় হাওরের সৌন্দর্যটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, হাওরাঞ্চলের উদ্ভিদ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীরা হাওরের পানি শুকিয়ে মাছ আহরণ করতে গিয়ে হাওরের পানি না থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্ত হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মাছ তার আবাস্থল ও খাদ্য না পাওয়ায় মাছের বংশবৃদ্ধি সঠিকভাবে করতে পারছে না। তাই এসব উদ্ভিদকে রক্ষা করার জন্য হাওর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আলাদা নজরদারি করা প্রয়োজন।

ওডি/ এফইউ


 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড