• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

শ্রীনগরে ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেটে খেলার মাঠ দখলের পাঁয়তারা

  রিয়াদ হোসাইন, মুন্সীগঞ্জ

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:১৩
ওয়ারিশ সার্টিফিকেট
ওয়ারিশ সার্টিফিকেট (ছবি: দৈনিক অধিকার)

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় ভুয়া ওয়ারিশ সার্টিফিকেট তৈরি ও নামজারি করে সর্বসাধারণের একটি খেলার মাঠ দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার কোলাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইকশা গ্রামের তফসিলভুক্ত আরএস ১২৫১ নম্বর দাগের ৪৯ শতাংশ (জমি) গাইনবাড়ি খেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে একটি মহল দখল করে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

মাঠটি এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলাসহ অত্র এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যও মাঠটি ব্যবহার করে আসছেন এলাকাবাসী। অথচ মাঠটি দখলের লক্ষ্যে মহলটির কারসাজিতে ২০১৬ সালের ২১ অক্টোবর গোপাল চন্দ্র ঘোষ, নিতাই চন্দ্র ঘোষ, হারান চন্দ্র ঘোষ, অনিতা রানী ঘোষ, সবিতা রানী ঘোষ এবং লিটন চন্দ্র দে, অর্পন চন্দ্র দে, শ্যামা রানী দে গংদের নামে একই দিনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একাধিক ওয়ারিশ সনদপত্র উত্তোলন করা হয়েছে।
 
অনুসন্ধানে জানা যায়, আরএস ১২৬৭ নম্বর দাগের ১৫ শতাংশ শ্মাশান খোলা যা সিএস পর্চায় উল্লেখ রয়েছে। এসএ ১০২৯ দাগের ৪৯ শতাংশ ভূমির নিলাম ক্রয় সূত্রে মালিক মহিউদ্দিন খান। তিনি ১৯৬১ সালে বিক্রয় করেন মো. দলিল উদ্দিন গংদের কাছে। মো. দলিল উদ্দিন গং ১৯৮২ সালে বিক্রি করেন আলী আহমেদ গংদের কাছে। যেহেতু এটি একটি খেলার মাঠ হিসেবে এলাকায় বিশেষভাবে প্রয়োজন সেক্ষেত্রে আলী আহমেদ গংরা স্থানীয় ক্লাবে দান করে দেন। বর্তমানে আদর্শ পল্লী সংসদ নামে ক্লাবটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এরপরে ১৯৯৩ সালে মজিবর রহমান খান গং অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে লিজ আনেন। 

এর বিরুদ্ধে শাজাহান দেওয়ান মজিবর রহমান গংদের বিবাদী করে মামলা করেন। মামলার রায় পান বিবাদী মজিবর রহমান গং। এত কিছু হওয়ার পরেও জমিটি মাঠ হিসেবেই ব্যবহার হয়ে আসছে। 

অন্যদিকে আরএস রেকর্ড ভুলক্রমে আনন্দ সুন্দরী গংদের নামে লিপিবদ্ধ হয়। যাদের নামে রেকর্ড হয়েছে তারা এই গ্রামের অধিবাসী নন। গ্রামে তাদের কোনো প্রকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় শাজাহান দেওয়ান গং মাঠের ২৩ শতাংশ ও শ্মাশানের ১৫ শতাংশ জমি নিজের নামে দলিল করে নেন।

এ বিষয়টি জানার পরে আদর্শ পল্লী সংসদের সাধারণ সম্পাদক এলাকাবাসীর পক্ষে শহিদুল ইসলাম মামুন খান নামজারি বাতিলের জন্য শ্রীনগর ভূমি অফিসে মিসকেস করেন। মিসকেসটির রায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে শাজাহান দেওয়ান গং শহিদুল ইসলাম মামুন খানকে প্রধান আসামি করে কোর্টে মামলার করেন। যার কারণে মিসকেসটির শুনানি স্থগিত রয়েছে। 

এছাড়া মাঠের বাকি ২৬ শতাংশ রহস্যজনক ওয়ারিশ দেখিয়ে নামজারি করে নেওয়া হয়েছে। যা কিনা বাতিল চেয়ে ভূমি অফিসে আবেদন করা হয়েছে। যাদের ওয়ারিশ দেখিয়ে নামজারি করা হয়েছে তারা এক বছরেও কেউ সংশ্লিষ্ট অফিসে উপস্থিত হননি।
 
এছাড়া দোগাছি এলাকার দিলিপ চক্রবর্তী ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাইকশার সাবেক মেম্বার আব্দুল ওহাব দেওয়ান তাদের ওয়ারিশ দেখিয়ে নামজারি করা হয়েছে তারা কেউই ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নন। ওয়ারিশ সনদ বাতিলের জন্যও কোলাপাড়া ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে চেয়ারম্যান এখনো কোনো সুরাহা করতে পারেননি। তবে তিনি বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
 
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুস ছাত্তার (১০২) বেপারী বলেন, যাদের ওয়ারিশ বলা হচ্ছে তাদের আমি কখনো গ্রামে দেখিনি। 

এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকার এসএম ইউনুছ (৬২) ও সাবের সিকদার (৬৫) জানান, আমরা ছোটকাল থেকে এই মাঠে খেলাধুলা করেই বড় হয়েছি। আদর্শ পল্লী সংসদ নামে আমাদের ক্লাবটি ১৯৯০ সালের পরে বর্তমান নামকরণ করা হয়। মাঠে এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পাশাপাশি যে কোনো ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও এলাকাবাসী ব্যবহার করে থাকেন। বর্ষার সময় মাঠটি পানিতে ডুবে থাকে।

এলাকাবাসী মাহবুব আলমসহ (৬৫) অনেকে বলেন, দীর্ঘদিনের সর্বসাধারণের খেলার মাঠ কীভাবে মালিকান হয়ে গেল! আমাদের তা জানা নেই। এ সময় স্থানীয়রা মাঠ বেদখল করে নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করেন।
  
এ বিষয়ে আদর্শ পল্লী সংসদের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মামুন খান জানান, গ্রামবাসীর পক্ষে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ও নামজারি বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে আবেদন করেছি। গ্রামবাসীর প্রাণের দাবি খেলার মাঠটি যেন বেদখল না হয়। সেই সঙ্গে যারা সরকারি সম্পত্তির জাল দলিল ও ভুয়া ওয়ারিশ বানিয়ে এলাকায় সমস্যার সৃষ্টি করে তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করেন তিনি।

ক্রয় সূত্রে মালিক দাবি করা ইউসুফ দেওয়ান (৬৫) বলেন, জালাল খার বিক্রিত জমি দলিল দারগা নামে একজনের কাছে বিক্রি করা হয়। তার কাছ থেকে আমি এই জমি ক্রয় করেছি। অপরদিকে শহিদুল ইসলাম (৫০) বলেন, আমরা ১৯৮২ সালে এসএ মালিক মহিউদ্দিন খানের কাছ থেকে সম্পত্তি ক্রয় করেছি। 

কোলাপাড়া ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা ইউপি সদস্য শিল্পী আক্তারের কাছে ওয়ারিশ সনদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়ারিশদের পক্ষে সনদের জন্য লোক এসেছিল। তাই প্রাথমিক তদন্ত সাপেক্ষে চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাই। ওয়ারিশ সনদের জন্য যারা আবেদন করেছেন তারা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা বা আপনার চেনা জানা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সুদত্তর দিতে পারেননি।

ওডি/ এফইউ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড