• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

লোকে তাকে ডাকে সালমা পাগলি

  কুলাউড়া প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:০৬
সালমা
স্বামীর প্রতারণার শিকার সালমা (ছবি : দৈনিক অধিকার)

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার সালমা স্বামীর প্রতারণা ও জালিয়াতির খপ্পরে পড়ে এখন রাস্তার পাগল। লোকে তাকে ডাকে সালমা পাগলি। টগবগে যুবতী সালমা অনাহারে অর্ধাহারে এখন কঙ্কালসার। পিতা-মাতাহীন এতিম সালমার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিয়ে প্রতারক স্বামী মিজান এখন দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে আয়েশি সংসার করছেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সালমার এক প্রতিবেশীর থেকে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সদপাশা গ্রামের মৃত ময়না মিয়ার মেয়ে সালমাকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে পার্শ্ববর্তী রাউৎগাও ইউনিয়নের মনরাজ গ্রামের আত্তর আলীর ছেলে মিজানুর রহমান। বিয়ের বছর দেড়েক আগেই মারা যায় সালমার বাবা-মা। চাচার সঙ্গে আলোচনা করেই সালমার বিয়ের বিষয় পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন আগে তার চাচাও মারা যান। পরে চাচাতো ভাইদের তত্ত্বাবধানেই মিজানের সঙ্গে বিয়ে হয় সালমার। 

বিয়ের পর পরিবারের সম্মতিতেই মিজান শ্বশুরের রেখে যাওয়া বাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থেকে যায়। কারণ, ময়না মিয়ার কোনো ছেলে সন্তান নেই। দুইজনই মেয়ে। সেই হিসেবে শ্বশুরের রেখে যাওয়া ঘরেই স্ত্রী সালমাকে নিয়ে সংসার করতে থাকে মিজান। সুন্দরভাবে চলছিল তাদের সংসার। প্রায় চার বছর এ বাড়িতেই সংসার করে তারা। এক পর্যায়ে স্ত্রী সালমাকে বুঝিয়ে মিজান বাড়িসহ শ্বশুরের রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। এতে স্ত্রী সালমাও সরল মনে স্বামীকে বিদেশে যেতে বাবার রেখে যাওয়া যতটুকু জায়গাজমি (বাড়িসহ) ছিল, সব বিক্রি করে সমস্ত টাকা স্বামীর হাতে তুলে দেয়। এরই মধ্যে সালমা দুই সন্তানের জননী হয়। বর্তমানে সন্তান দুইটির বয়স যথাক্রমে ১০ ও ১১ বছর।

এরপর মিজান স্ত্রী সালমা ও দুই সন্তানকে নিজের বাড়িতে রেখে বিদেশে (ওমান) পাড়ি জমায়। সালমার সংসার সেখানেও ভালোই চলছিল। এর দুই বছর পর মিজান ছুটিতে দেশে এসে কুলাউড়ার বাদে মনসুর গ্রামে শিউলি নামের এক মেয়েকে স্ত্রী সালমার অজান্তে গোপনেই বিয়ে করে। বিয়ের পর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে মিজান আবারও ওমানে চলে যায়। পরে দ্বিতীয় বিয়ের খবর শুনে সালমা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। শুরু হয় সালমা ও তার স্বামীর মনোমালিন্য ও দূরত্ব। 

এভাবেই স্বামী মিজান দেশে এসে দুই সন্তানকে এতিমখানায় দিয়ে আবারও চলে যায় বিদেশ। স্বামী-সন্তানসহ সর্বস্বান্ত সালমা আরও ভেঙে পড়েন। স্বামীর প্রতারণা ও দুই সন্তানকে কোল থেকে কেড়ে নেওয়ায় সালমা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। কোনোভাবেই সে এসব মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু তাকে মিজান কিংবা তার পরিবারের কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এরপর মিজান সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

এ দিকে, সালমার আপন বলতে কেউ নেই। চাচাতো ভাইয়েরাও গরীব, দিনমজুর। সালমার চিকিৎসা কিংবা ভরণ-পোষণেরও সাধ্যও নেই তাদের। তবুও তারা চেষ্টার ত্রুটি করেনি। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর মিজান স্ত্রী সালমার চিকিৎসা করাতে রাজি হয়। পর্যায়ক্রমে চার থেকে পাঁচ হাজার করে দুই-একবার টাকা দেয় মিজান। এতে সালমা প্রায় সুস্থ হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে আবারও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় মিজান। এরপর এক বছর থেকে আবারও মিজান যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় সালমা এখন বদ্ধ পাগল। কেউ তার খোঁজ নেয় না। ৩২ বছর বয়সী যুবতী সালমাকে বিক্রিত ওই বাবার বাড়ি কিংবা বাড়ির আশেপাশেই দিনরাত ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। 

সালমার এই পরিণতিতে তার স্বামী মিজানকে দায়ী করে নামপ্রকাশ না করার শর্তে সদপাশা গ্রামের সালমার প্রতিবেশী একজন বলেন, মিজান পিতা-মাতা ও স্বজন হারা অসহায় এতিম মেয়েটির সঙ্গে প্রতারণা করেছে, জালিয়াতি করেছে। মিজানের উচিৎ সালমার দায়িত্ব নেওয়া, তার যত্ন নেওয়া। চিকিৎসা করালেই সালমা সুস্থ হয়ে উঠবে। 

তিনি আরও বলেন, পিতামাতা ও স্বজনহারা সালামার এই পরিণতির জন্য মিজান আল্লাহর কাঠগড়া থেকে রেহাই পাবে না। যুবতী একটা মেয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া পাগল। যেকোনো সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটতে পারে। যার দায়ভার সে এড়াতে পারবে না।

এ ব্যাপারে তিনি কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করে সালমার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। 

এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেহা ফেরদৌস চৌধুরী পপি বলেন, সালমার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনাটি জানা ছিল না। কেউ কোনো অভিযোগও করেনি।

তিনি আরও বলেন, সালমার পক্ষে কেউ অভিযোগ বা যোগাযোগ করলে বিষয়টি স্থানীয় বা প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড