• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

সিন্ডিকেটের কবলে সিলেটের চামড়ার বাজার

  সিলেট প্রতিনিধি

১৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:৩০
কম দামের কারণে ফেলে রাখা চামড়ার স্তূপ
কম দামের কারণে ফেলে রাখা চামড়ার স্তূপ (ছবি: দৈনিক অধিকার)

সিলেটে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে বিভিন্ন মাদ্রাসা, মৌসুমী ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। মৌসুমী ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রাস্তায় ও নদীতে ফেলে প্রতিবাদ করেছেন। তারা চামড়ার দাম কম থাকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছেন। অপরদিকে চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পাওয়া, পুঁজি স্বল্পতা, ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, এ পেশায় লোকজন কমে যাওয়াকে চামড়ার মূল্যে ধস নামার কারণ হিসেবে বলেছেন। চামড়ার কম দামকে গরীবের পেঠে লাথি বলে বর্ণনা করেছেন সচেতন মহল। 

সিলেটে কোরবানীর রাত থেকে বিভিন্ন মাদ্রাসা, মৌসুমী ও ক্ষুদ্র-প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা চামড়া এনে বিক্রির জন্য জুতসই কোন দাম না পেয়ে রাস্তায় ফেলে যান। অনেকে আবার চামড়ার কোন ক্রেতাই খুঁজে পাননি। তারা শেষ পর্যন্ত রাস্তায় চামড়া ফেলে যান। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কোরবানির বর্জ্যের সাথে অবিক্রিত প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া সংগ্রহ করে সিসিকের ময়লার ভাগাড়ে পুঁতে ফেলেছে। কোরবানিদাতা ও বিভিন্ন মাদ্রাসা এসব চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দিলে তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে নগরীর বিভিন্ন এলাকাতে। পরে সিসিক নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এ সকল পরিত্যক্ত চামড়া সংগ্রহ করে তা সিসিকের নির্ধারিত ময়লা ফেলার স্থান পারাইরচকে পুতে ফেলে।

জানা যায়, সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রতি পিস চামড়ার দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। এমনকি অনেক ব্যবসায়ী বাকিতে চামড়া কিনতেও রাজি না হওয়ায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ রাস্তায় চামড়া ফেলে প্রতিবাদ করে। পরে চামড়াগুলো ময়লার সাথে তুলে নেয় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। এদিকে দিন শেষে সবাই একইভাবে প্রতিবাদ জানাতে থাকলে অবিক্রিত চামড়া নিয়ে সিলেট জেলার বেশির ভাগ এলাকাতেই মানুষ বিপাকে পড়েন। 

মঙ্গলবার সকালে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে চামড়ার স্তূপ চোখে পড়ে। পরে সেগুলো ভাগাড়ে নিয়ে যায় কর্তৃপক্ষ। চামড়ার এমন দামের কথা জেনে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও দাবি করলেন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি চামড়া বাজার। সিসিকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান বলেন, নগরী থেকে প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া ডাম্পিং করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন মোড়ে এসব চামড়া রাখা ছিল। পরে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়। এবার এত চামড়া কেন অবিক্রিত রয়ে গেল তা বোধগম্য নয় বলেও জানান তিনি।

এদিকে কোরবানির ঈদে পশুর চামড়ার পাইকার না পাওয়ায় বালাগঞ্জে কুশিয়ারা নদীতে চামড়া ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা। এমন ঘটনা ঘটেছে সিলেটের আরও বেশ কয়েকটি উপজেলায়। চামড়া কেনার লোক না পাওয়ায় সারাদিন এবং রাতে পাহারা দিয়ে অপেক্ষার পর বাধ্য হয়েই মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার পাঁচটি মাদরাসার প্রায় চার শতাধিক চামড়া কুশিয়ারা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

এছাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বালাগঞ্জ ফিরোজাবাগ মাদরাসা, বালাগঞ্জ মহিলা মাদরাসা, তিলকচানপুর আদিত্যপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা, সুনামপুর মাদরাসা, দক্ষিণ গৌরীপুর মাদরাসার অনেকগুলো চামড়া নদীতে ফেলে দেয়া হয়। সবমিলে প্রায় কয়েক হাজার পশুর চামড়া নদীতে ভাসিয়ে দয়া হয়। ফিরোজাবাগ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোরবানি দেয়া পশুর চামড়া সংগ্রহ করে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত মাদরাসার রাস্তায় রাখা হয়। কেউই এসব চামড়া কিনতে আসেনি। চামড়ার দুর্গন্ধে বাসাবাড়ি থেকে বের হতে পারছিলেন না মানুষ। এজন্য এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে কুশিয়ারা নদীতে চামড়াগুলো ভাসিয়ে দেয়।

শাহজালাল চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো: ছমির উদ্দিন জানান, গত বছর কোরবানীর সময় সিলেট থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আড়তদার ও খদ্দেরদের কাছ থেকে ৬৫/৭০ টাকা দামে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া ক্রয় করেছিলেন। এরপর সেই চামড়া লবণ দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করার পর ট্যানারী মালিকরা সিলেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয়ের জন্য দর বেঁধে দেন ৪০/৪৫ টাকা। এতে ব্যবসায়ীরা প্রায় চার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনেছেন। ট্যানারী মালিকরা ২০১৫ সাল থেকে তাদের কাছে পাওনা টাকা এখনো পরিশোধ করেনি। সিন্ডিকেটের কথা অনেকে বলেছেন। সিলেটে কোন সিন্ডিকেট হয়নি। আগে চামড়া ব্যবসায় হাজারের অধিক লোক ছিল। এ ব্যবসায় কয়েক বছর থেকে লোকসানের কারণে তা কমে শ’য়ের মতো হয়েছে। পূঁজি সংকট, ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, ব্যবসায় লোকজন কমে যাওয়ায় চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায়নি।

সিলেটের যুব সংগঠক ও সমাজকর্মী শাহীন আহমদ বলেন, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া বিক্রেতারা ন্যায্য মূল্য পাননি। ফলস্বরুপ তারা প্রতিবাদ করে রাস্তায় নদীতে চামড়া ফেলেছেন। এতে বেসরকারী মাদ্রাসা, গরীবলোকেদের পেঠে লাথি মারা হয়েছে।

সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ভালো দাম না পাওয়ায় চামড়া বিক্রেতারা রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান। সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সিসিক কর্তৃপক্ষ সেগুলো অপসারণ করে পারাইরচকে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা হয়েছে। ভাগাড়ে ফেলা চামড়া প্রায় ১০টন হবে বলে জানান তিনি।

ওডি/এএন 
 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড