• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

সেতু নির্মাণে অনিয়ম

পিলারের সক্ষমতা পরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি সেতু নির্মাণের অভিযোগ

  রাণীনগর, নওগাঁ প্রতিনিধি ১৮ মে ২০১৯, ১৪:১৩

নির্মাণাধীন ব্রিজ
নওগাঁর রাণীনগরে নির্মাণাধীন ব্রিজ। (ছবি : সংগৃহীত)

নওগাঁর রাণীনগরে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যেই নির্মাণাধীন ৩টি ব্রীজের পিলারের ভার বহন সক্ষমতা পরীক্ষা (পাইল লোড টেস্ট) ছাড়াই পাইল ক্যাপ, বেজ ঢালাইসহ ওয়াল নির্মাণ কাজও প্রায় সম্পূর্ণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় দায়সারা কাজ করতে দেখা গেলেও রাতের আঁধারে চুপিসারে পুরোদমে চালিয়েছে সেতুর পাইলিংয়ের কাজ। পাইল লোড টেস্ট না করে সেতু নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে পাইলের সাথে সাথে সেতুর বিভিন্ন অংশ ডেবে গিয়ে সেতু ভেঙে পড়াসহ ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল। সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টসহ দরপত্রের ফটোকপি চাইলে নওগাঁর সড়ক ও জনপদের কর্তাব্যক্তিদের অযুহাত আর তালবাহানার যেন অন্ত নেই!

স্থানীয় প্রকৌশলী আবু তারেকের মতে, সেতু নির্মাণের শুরুতে নিদিষ্ট স্থানে মাটি শক্তি পরীক্ষা অর্থাৎ সেখানকার মাটি কতটুকু লোড নিতে সক্ষম সেটা পরীক্ষার পর পাইলের কাঠামো তৈরি করে পাইল (খাম্বা) নির্মাণ করা হয়। বড়-ছোট সেতু ভেদে পাইলিং কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। সেই পাইলগুলোর ইন্টিগ্রেটি (খাম্বার অখণ্ডতা) পরীক্ষা, পাইল লোড টেস্টসহ (খাম্বার ভারবহন সক্ষমতা পরীক্ষা) বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। পাইল লোড টেস্ট বলতে, দরপত্র মোতাবেক সেতুর ডিজাইন লোডের দেড়গুণ বেশি ভারী বস্তু পাইলের ওপর চেপে ভার বহন সক্ষমতা পরীক্ষা করাকে বুঝায়। এ সময় ভারী বস্তু অথবা সিমেন্ট-বালির বস্তা, পিষ্টন, ডায়াল গেজ, প্রেসার গেজ, রেফারেন্স গেজ মেশিন সাধারণত ব্যবহার করা হয়। যার প্রস্তুতি নিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। ওই ভারী বস্তুগুলো পাইলের উপর কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত রাখতে হয়। পাইল ও মাটির ঘর্ষণের (ফ্রিক্শন) মাধ্যমে মাটির ভিতর লোড স্থানান্তর করে লোড বহনে সক্ষম কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এসব কার্য সম্পাদনের সময় যদি পাইলগুলো ১২ থেকে ২৫ মিলিমিটার ডেবে যায় তাহলে ওই পাইলের পাশে আরও একটি করে পাইল নির্মাণ করা যেতে পারে। আর যদি ২৫ মিলিমিটারের বেশি ডেবে যায় তাহলে পুনরায় নতুন করে পাইলের কাঠামো তৈরি করতে হবে। কোনো ঠিকাদার যদি এই সব কার্যসম্পূর্ণ না করেই সেতু নির্মাণ করে তাহলে এই সেতুর উপর দিয়ে ভারী যান চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। পাইল ডেবে যাওয়ার সাথে সাথে সেতুর উপরের বিভিন্ন অংশগুলোও ডেবে যায়, যার ফলে ব্যস্ততম সড়কের এই সেতুগুলো ধীরে ধীরে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।

তবে সেতু নির্মাণ কাজের তদারকি কর্মকর্তা নওগাঁর সড়ক ও জনপদের উপসহকারী প্রকৌশলী মিনহাজুর রহমান স্বপন দাবি করে বলেন, এখন আর ১০/১৫ দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে ২৪/৩৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। আধা ঘণ্টায় অত্যাধুনিক মেশিন দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে লোকজন এসে নির্মাণাধীন সেতুগুলোর সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। সেই অত্যাধুনিক মেশিনটির নাম ও সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টসহ দরপত্র মোতাবেক তথ্য ও ফটোকপি চাইলে, ‘অত্যাধুনিক মেশিন’ এর নাম তিনি জানেন না ও তার কাছে এসব তথ্য থাকে না মর্মে সড়ক ও জনপদের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দেন তিনি।

সড়ক ও জনপদের এই কর্মকর্তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় ওই প্রকৌশলী সাংবাদিকদের জানান, নির্মাণাধীন ৩টি সেতুর দরপত্রে যদি পাইল লোড টেস্ট করার কথা থাকে তাহলে অল্প খরচের মধ্যেই হয়ে যাবে। আর ‘অত্যাধুনিক মেশিন’ কি? তা আমার জানা নেই। তবে বড় বড় সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘অত্যাধুনিক’ হিসেবে পিডিএ টেস্ট (খাম্বার গতীয় বিশ্লেষণ) করা হয়। কিন্তু পিডিএ টেস্ট অনেক ব্যয়বহুল, তাছাড়া এই সব সেতুর পাইলের উপর পিডিএ টেস্টের আয়োজন করা সম্ভব না। ভার নিতেই পারবে না। আমার জানা মতে, দেশে হাতেগোনা কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পিডিএ অর্থাৎ পাইল ডাইনামিক অ্যানালাইসিস করার সরঞ্জামাদি রয়েছে। তবে যাদের পিডিএ করার মেশিন বা সরঞ্জামাদি রয়েছে তারা অবশ্য অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়। প্রতিটি সেতুর পাইল টেস্টের জন্য সর্বনিম্ন ৩ লক্ষ থেকে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেয়। কিন্তু এই ৩টি সেতুর লোড টেস্ট করার জন্য নিজ খরচে একজন ঠিকাদার কেন অতিরিক্ত ৪/৫ লক্ষ টাকা খরচ করবে?

জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে আবাদপুকুর হয়ে কালীগঞ্জ সড়কে চলাচলরত যাত্রী-সাধারণও নির্বিঘ্নে সব ধরনের ভারী যান চলাচলের লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু সংলগ্ন নতুন করে ৪টি সেতু ও ২৪টি কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। দরপত্র আহ্বানের পর এসব সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ কাজের যৌথ দায়িত্ব পেয়েছেন, নাটোর জেলার ঠিকাদার মীর হাবিবুর আলম, এমএ মিজান ও ইউনুস এ্যান্ড ব্রাদার্স নামক প্রতিষ্ঠান। ৪টি সেতুর নির্মাণ ব্যয় ২৮ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার সাইফুল ইসলাম ও সেতু সংলগ্ন রাজাপুর গ্রামের আব্দুল মালেক, আব্দুল আজিজ, আব্দুর রহিমসহ অনেকই জানান, পাইল লোড টেস্ট করতে আমরা দেখিনি। পাইল, ক্যাপ, ওয়ালসহ সেতু নির্মাণে কি ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে তাও জানা সম্ভব নয়! কারণ তারা তো দিনের বেলায় পাইলের কাজই করেনি। রাতের আঁধারে পুরোদমে নির্মাণ কাজ করেছে। সেই সময় তো রাত জেগে ওখানে থাকা সম্ভব নয়। আর তারা তো দরপত্রটা দেখাতে চায় না। আধুনিক মেশিন বা পুরাতন যেটা দিয়েই হোক পাইল লোড টেস্ট যদি করতো তাহলে অন্তত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দেখা যেত। কিন্তু তারা সেগুলো করেইনি। এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে তাদের কাছে দাবি, দরপত্র মোতাবেক নির্মাণ কাজ আমরা দেখে নিতে চাই। পাইল লোড টেস্ট না করে সেতু নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাসহ সেতুর স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তদারকি প্রকৌশলী মো: মুনছুর আলী বলেন, নির্মাণাধীন সেতু গুলোতে কাস্ট-ইন-সিটু পাইল করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার টেকনো ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে লোকজন এসে পাইল লোড টেষ্টসহ সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পূর্ণ করে গেছেন। অত্যাধুনিক মেশিন দিয়ে লোড টেস্ট করা হয়েছে। তবে ওই মেশিনের নাম কি তা জানি না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ঢাকাতে গিয়ে ‘টেকনো’ অফিস থেকে জানতে পারবেন। অত্যাধুনিক মেশিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে ভাড়া নিয়ে সকল কার্য সম্পাদন করেছেন।

এ ব্যাপারে নওগাঁর সড়ক ও জনপদের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল মুনছুর আহমেদের কাছে উপরোক্ত বিষয় সংক্রান্ত জানতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে সাংবাদিককে বলেন, লোড টেস্ট না হলে আপনার কি? সেতু ভেঙে গেলে আপনার কি হবে? কার জেল জরিমানা হবে? আমার চাকুরি যাবে? কিছুই হবে না! তবে সব দায়ভার আমাদের, কারণ সরকার সড়ক ও জনপদ বিভাগকে দায়িত্ব দিয়েছেন। বিষয়গুলো আমরাই দেখবো! নির্মাণাধীন ৩টি সেতুর ডিজিটাল পদ্ধতিতে সব ধরনের টেস্ট করা হয়েছে। কাজে কোনো প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না। তবে ‘অত্যাধুনিক মেশিন’ এর নাম তিনিও বলতে পারেননি।

নওগাঁর সড়ক ও জনপদের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হামিদুল হক বলেন, রাণীনগরে নির্মানাধীন সেতুগুলোর সব রকমের টেস্ট সম্পূর্ণ করা হয়েছে। আমার দপ্তরের সুপারভিশন কর্মকর্তা সব সময় এসব কাজের দেখাশুনা করছেন। চলমান কাজে কোনো প্রকারের অনিয়ম হচ্ছে না। সেখানে অনেক ভালোমানের কাজ করা হচ্ছে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
SELECT id,hl2,parent_cat_id,entry_time,tmp_photo FROM news WHERE ((spc_tags REGEXP '.*"location";s:[0-9]+:"রানীনগর".*')) AND id<>64080 ORDER BY id DESC LIMIT 0,5

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড