• বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

মাত্র ৩ টাকায় মাসজুড়ে পানি

  কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ

১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৫১
বিশুদ্ধ পানি
বিশুদ্ধ পানি নিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসছেন গ্রামের নারীরা ( ছবি : দৈনিক অধিকার )

নওগাঁর খরা পীড়িত ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র অঞ্চলে খাবারসহ দৈনন্দিন প্রতিটি কাজের একমাত্র ভরসা পুকুর আর কুপের পানি। তাও ফুরিয়ে যায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে। বছরের ৯ থেকে ১০ মাস এ অঞ্চলে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। শত বছরের প্রাচীন এই দুর্ভোগ লাঘবে আশার আলো ছড়াচ্ছে স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে সম্মিলিত উদ্যোগে স্থাপিত ‘কমিউনিটি পানি সরবরাহ প্রকল্প’। আবার পানি সরবরাহ এই প্রল্পের আওতায় একজন মানুষ মাত্র ৩ টাকায় মাস জুড়ে অনায়াসে পাবেন বিশুদ্ধ পানি। এতে করে বরেন্দ্র এলাকার চিরচেনা দুঃসহ চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে জেলার পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর উপজেলা ও পত্নীতলা-ধামইরহাট উপজেলার আংশিক এলাকা ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিতি। এসব এলাকার ভূগর্ভস্থ ২শ থেকে ৩শ ফুট অভ্যন্তর পর্যন্ত রয়েছে কঠিন শিলা পাথরের স্তর। এর নিচে রয়েছে পানির স্তর। 

বর্ষাকালে পানি পেলেও অন্য সময়ে এক ফোঁটা পানিও পড়ে না এসব নলকুপ থেকে। পানি সংগ্রহে যুদ্ধে নামতে হয় এসব এলাকার মানুষদের। বিশেষজ্ঞদের মতে ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এ সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রতি বছরই প্রকপ হচ্ছে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট। 

খরা মৌসুমে এ অঞ্চলের নারী-পুরুষদের পানি সংগ্রহে ছুটতে হতো গ্রাম থেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে গভীর নলকুপের দিকে। কোথাও বড় দিঘী অথবা পুকুরে যেতে হতো তাদের । কখনো কখনো বাধ্য হয়ে এলাকার ডোবা-নালার পানি ব্যবহার করতে হতো তাদের। এতে করে পানি বাহিত নানা রোগের প্রকোপও ছিল বরেন্দ্র এলাকার যত্রতত্র। 

ঠিক সেই মুহূর্তে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে জেলার সাপাহারে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রথম স্থাপন করা হয় কমিউিনিটি বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ প্রকল্প। স্থানীয় এমপি (বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী) বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, এলজিইডি বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থায়নে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা ব্যায়ে গ্রামে সাবমারসিবল মটরের সাহায্যে প্লাস্টিকের ট্যাংকি উঁচু স্থানে পাইপ লাইনে ট্যাপকল বসিয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ির উঠানেও পানি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

এই সরবরাহে শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বাড়তি কোনো অর্থ পানির জন্য দিতে হয় না। পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুয়ায়ী এই অর্থ নেওয়া হয়। এতে করে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাসে ৩ থেকে ৪ টাকা করে খরচ পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় জেলার সাপাহার উপজেলার ৫০টি গ্রামে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই সংখ্যা আরো বেড়েছে। 

উদ্যোক্তরা জানিয়েছেন মাত্র ৩ টাকায় মাস জুড়ে পানি পেয়ে এলাকাবাসীর কাছে এই প্রকল্প অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার পানির কোন অপচয়ও নেই। কারন উদ্যোক্তারা প্রতিটি ট্যাংকির পাশেই পৃথক আরও একটি পাইপ বসিয়েছেন। ট্যাপ হতে অতিরিক্ত পানি সেই পাইপ দিয়ে আবারও ভূগর্ভস্থ গিয়ে ফ্লিটার হয়ে সেই পানি চলে আসছে মূল পাইপে।

উপজেলার গোডাউনপাড়া, কাবুলপাড়া, তুড়িপাড়া, তাজপুর পশ্চিমপাড়া, তাজপুর পূর্বপাড়া, তেহরিয়া, খোট্টাপাড়া, মানিকুড়া, দীঘিপাড়া, কল্যানপুর, মালিপুর, বড়ডাঙ্গা, ভিকনা ও ইসলামপুরসহ স্থাপিত পানি সরবরাহ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা দেখা গেছে এসব এলাকার মানুষ এখন অনায়াসে বিশুদ্ধ খারার পানি পাচ্ছে। কেউ ট্যাংকির নিচে প্রধান ট্যাপকল থেকে গ্রামের গৃহবধূরা পানি সংগ্রহ করছে।

সাপাহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাজাহান চৌধুরী জানান, গত ১০ বছরের এক হিসেবে দেখা গেছে উপজেলার গ্রামগুলোতে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে যত নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। তার ৭০ ভাগ নলকূপই গায়েব হয়ে গেছে। যেগুলো আছে তাতে পানি উঠে না। এই খাতে যা ব্যয় হয়েছে তাতে সরকারের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয়নি।

তিনি বলেন স্থানীয় এমপি (বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী) সাধন চন্দ্র মজুমদার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমপির নিজস্ব তহবিল, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, এলজিইডির যৌথ অর্থায়নে মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় এই প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রকল্পে সাড়ে ৪শ ফুট পর্যন্ত গভীরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মোটর বসিয়ে উঁচু ট্যাংকির মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে পানি। যার সুবিধা পেতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাসে দিতে হয় মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। 

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানান, এলাকার বিশুদ্ধ খাবার পানির দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনা মোতাবেক এলাকায় কমিউনিটি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এছাড়া জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অন্যান্য উপজেলাতেও এই ধরনের প্রকল্প চালু করার জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ডিজাইন করে পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে। 

ওডি/এসএএফ 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড