• শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

নতুন প্রজন্ম মনে রাখবে মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সির কথা

  শাকিল মুরাদ, শেরপুর ১৬ মার্চ ২০১৯, ১৫:৩০

শেরপুর
গণযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি

স্বাধীন স্বদেশভূমির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের দুর্নিবার বাসনা, যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব, একক সাহস, উদ্যম আর একাগ্রতার আরেক নাম জহুরুল হক মুন্সি। স্বাধীনতা যুদ্ধে গণযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি'ই একমাত্র গণযোদ্ধা অসম্মান্য বীর। যিনি দুইবার বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের গেজেট নোটিফিকেশন নম্বর ৮/২৫/ডি-১/৭২-১৩৭৮। ক্রমিক নম্বর ৩৯১ এবং ৪০০। মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি’র ভূমিকার কথা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ধানুয়া-কামালপুর বিজয়ে জামালপুর-শেরপুর জেলায় তার নাম শুনেননি এমন কেউ নেই। কল্পনা হলেও অসম্ভব সত্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সির, বীর প্রতীক (বার) বীরত্বের স্মৃতি কথা। তেমনি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্রাজোড় গ্রামের কৃষকের সন্তান জহুরুল। তিনি বর্তমানে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার পৌর শহরের পশ্চিম বাজার মহল্লার বাসিন্দা। একাত্তরের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া লাখো মুক্তি সেনাদের মধ্যে তিনি একজন।

১৯৭১সালের ডিসেম্বরে পাক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এতে লাখো বাঙালির রক্তে মুক্ত হয় জামালপুর। উত্তোলিত হয় সবুজের বুকে লাল পতাকা। মুক্ত হয় হাজার হাজার বন্দি জনতা। শ্লোগানে মুখরিত হয় শহরের আঙ্গিনা। জামালপুর পাক বাহিনীর দূর্গে আঘাত হানার পেছনে অসীম সাহসী বীরের মধ্যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন জহুরুল হক মুন্সি। ওই যুদ্ধে যারা বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন তাদের একজন হলেন তিনি।

একাত্তরে জহুরুল ২৬ বছরের টগবগে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। আজ তিনি বয়সের ভারে অনেকটাই শান্ত। তবুও তার দুঃসাহসী ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে আবার তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠেন। ফিরে যান সেই অগ্নিঝরা দিনে। একের পর এক বলে যান অগ্নিঝরা দিনের না বলার স্মৃতির গৌরবময় অধ্যায়। যা আজো তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় একাত্তরের রণাঙ্গনে।

জহুরুল হক মুন্সি বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। ১৯৬৪ সালে হঠাৎ আমি খেয়াল করি সামরিক প্রশিক্ষণ নিবো। পরে ডক ইয়ার্ড থেকে তিন মাসের ছুটি নিয়ে চলে যাই আনসার ক্যাম্পে। অবশ্য ছুটি নেয়াতে খুব একটা আর্থিক ক্ষতিও হয়নি। কারণ প্রশিক্ষণকাল তিন মাসে মাসিক পঁয়তাল্লিশ টাকা করে দেয়া হয় আমাকে। পরের বছর ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে আবার এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নেই।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় বাঙালিদের উপর পাকিস্তানিদের হামলার খবর নারায়ণগঞ্জে পৌঁছলে আমিসহ কিছু শ্রমিক রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে ব্যারিকেডের সৃষ্টি করি। ব্যারিকেড ভাঙতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক নারায়ণগঞ্জে ঢুকার খবর পেয়ে ডক ইয়ার্ডের অস্ত্রখানার তালা ভেঙে ৩০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল লুট করে প্রতিরোধের চেষ্টা করি।

২৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জ বন্দর ও শহরে তুমুল যুদ্ধের একপর্যায়ে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান তারা। ওই সময় সেখান থেকে থ্রি নট থ্রি রাইফেলটি নিয়ে আমি এলাকায় চলে আসি। এরপর ১১নং সেক্টরের অধীনে কামালপুর রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। ১১নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ভারতের মেঘালয়ের তুরা জেলার মাহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে প্রথমে ব্রিজ-কালর্ভাট উড়িয়ে দেয়ার ট্রেনিং নেন। পরে যুদ্ধের ট্রেনিং নেন তুরাতে। এরপর হায়ার ট্রেনিং নেন চেরাপুঞ্জিতে।

৬ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলার তৎকালীন ট্রেজরীতে অবস্থানরত পাক ক্যাম্পে ছদ্মবেশে কলা বিক্রেতা সেজে কলার ভিতর বিষ মিশিয়ে ২৮ জন পাক সেনাকে হত্যা করি। সেসময় ৩০ জন পাক সেনার জন্য ৩০ টি কলা নিয়ে গেলেও ২ জন কলা না খাওয়ার কারণে তারা বেচে যায়।

এছাড়া ১৩ নভেম্বর ১১ সেক্টরের আওতায় কামালপুর-বক্সীগঞ্জ সড়কের ঝোড়ার পাড় নামক স্থানে আমার নেতৃত্বে এক দল মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্র বাহিনীর সহায়তায় এক সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের ৬ টি জিপ উড়িয়ে দিয়ে ১১২ জন পাকসেনা হত্যা করা হয়। সেইসাথে ১৩ জন পাক সেনাকে জীবিত অবস্থায় ধরে পার্শ্ববর্তী কর্ণঝোড়া পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করি। ওই যুদ্ধে মিত্র বাহিনীর মেজর রতন সিংসহ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত এবং ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ২০ জন মিত্রবাহিনীর সদস্য আহত হয়।

তিনি বলেন, চিলমারী, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কুড়িগ্রাম, কামালপুর ও জামালপুর শহরে সন্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমাকে মুক্তিবাহিনী থেকে মিত্রবাহিনীতে স্থানান্তর করে। ব্রিগেডিয়ার সৎ সিং বাবাজী ও মেজর জেনারেল হযরত সিং নাগরার নেতৃত্বে নভেম্বরের প্রথম দিকে বকশীগঞ্জের কামালপুর এলাকায় মাইন পুঁতে গাড়ি উড়িয়ে পাক মেজর আইয়ুবকে হত্যা করি। ১৪ নভেম্বর কামালপুরের ঝড়াইপাড় এলাকায় তুমুল যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৬টি গাড়ি বিধ্বস্তসহ ১১২ জন সেনাকে মেরে ১৩ জনকে ধরে নিয়ে কর্ণজোড়া বাজারে টাঙিয়ে মেরেছি।

তিনি আরও বলেন, শেরপুর শহরের সুরেন বাবুর বাড়ি দখল করে তৎকালে রাজাকার কামারুজ্জামান যে টর্চার সেল তৈরি করে নিরীহ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা ও নির্যাতন চালাতো। অবশেষে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানকে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল শনিবার রাতে ফাঁসির দণ্ডে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয়।

কুখ্যাত কামারুজ্জামান এবং দেশে কামারুজ্জামানের মতো আরও সকল রাজাকারের বিচার না হওয়া পর্যন্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পাবে না। তাই বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার অনুরোধ রাজাকাররা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন আপনি ভয় পাবেননা। তাদের কঠিন বিচার করে সাজা দিন। তা না হলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বৃথা যাবে। জহুরুল হক মুন্সির এই বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার থেকে তাকে ডবল বীর প্রতীক (বার) খেতাব দেয়া হয় বলে তিনি জানান।

এই হচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী বীরপ্রতীক (বার) এর কাহিনী। তার নামের বীরত্ব ভূষণ পদবীর পর (বার) কেন? কোন যুদ্ধে কোন সৈন্য একাধিকবার কোন বীরত্ব ভূষণ পদবী পায়, তাহলে তার নামের শেষে বার যোগ হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধুমাত্র একজনই সেই সম্মানের অধিকারী। আর তিনিই হলেন জহুরুল হক মুন্সী। ১৯৭৩ সালের গেজেটে তাকে দুইবার বীরপ্রতীক উপাধি দেয়া হয়।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড