৬ বছরেও মিলেনি প্রতিবন্ধী স্কুলের সরকারি স্বীকৃতি

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:২২

  কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ

পনেরো বছরের কিশোর সাখাওয়াত হোসেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী সে। নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না। কথা বলে বেশ দ্রুত এবং সাজিয়ে গুছিয়ে। তবে কথা বলতে বলতে মুখ দিয়ে লালা পড়তে থাকে। তবু তার অসহায়ত্বের কথা, না পাওয়ার কথা, কষ্টের কথা বলতে ছাড়ে না। 

সে নওগাঁর পোরশা উপজেলার কপালীর মোড়ে অবস্থিত মোবারক হোসেন প্রতিবন্ধী স্কুলের ছাত্র। এছাড়া মোমিন হায়াত (১৩), আব্দুল মোমিন (১২), ফারজানা খাতুন, জামিলা খাতুন, মনিরা খাতুন, শাবানা পারভীন, বিপ্লব কুমার, শ্রীমতি অনামিকা, শ্রী সাজু এরা সকলেই প্রতিবন্ধী। এরকম ২৫৪ জন শিশু-কিশোরের মধ্যে কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, কেউ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, কেউ বাক প্রতিবন্ধী, কেউ অটিস্টিক, কেউ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী, কেউ সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী আবার কেউ ডাউন সিনড্রোম প্রতিবন্ধী। এরা সকলেই ওই একই স্কুলে লেখাপড়া করছে। 

এদের মধ্যে ১৩১ জন ছাত্র আর ১২৩ জন ছাত্রী। সোমবার তাদের স্কুলে গিয়ে তাদের নানা আকুতির সম্মুখে পড়তে হয়। এদের সকলের দাবি এই স্কুলটিকে সরকার স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুক। এরা সমাজে বোঝা হয়ে বাঁচতে চায় না। ওই স্কুলের প্রতিবন্ধী শিশুদের দাবি, দীর্ঘ ৬ বছর ধরে স্কুলটি পরিচালনা করছেন এলাকার সমাজসেবী শাহজাহান আলী। এরা ভাইয়েরা মিলে তাদের প্রয়াত পিতার নামানুসারে এই মোবারক হোসেন প্রতিবন্ধী স্কুলটি স্থাপন করে অদ্যাবধী চালিয়ে আসছেন। 

স্কুলের ১৭ জন শিক্ষক কর্মচারী বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। শুধু পাঠদানই নয়, প্রতিবন্ধী এসব শিশুদের পয়ঃনিষ্কাশনসহ সকল ধরনের পরিচর্যা করে আসছেন। তারা বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। বরং নিজেদের পয়সা খরচ করে ওইসব প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে থাকেন। 

প্রতিবন্ধী হলেও তারা তাদের শিক্ষকদের কষ্ট বুঝতে পারে। আর সে কারণেই তারা স্কুলটির সরকারি স্বীকৃতি ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং তাদের স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য স্কুল ভ্যান প্রদানের দাবি করছে। তাদের আশঙ্কা, শিক্ষক কর্মচারীরা বিনা বেতনে আর কতদিন তারা চালাবেন? স্কুলটি যদি বন্ধ হয়ে যায়? তাহলে তাদের জ্ঞানার্জনের পথও তো বন্ধ হয়ে যাবে। এমন দুশ্চিন্তায় উল্লিখিত প্রতিবন্ধী শিশুদের যেন পেয়ে বসেছে।

নওগাঁর পোরশায় সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘মোবারক হোসেন প্রতিবন্ধী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। বিদ্যালয়টি নানান সমস্যায় জর্জড়িত হলেও ২৫৪ জন বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে এখানে। বিদ্যালয়টিতে ১৭জন শিক্ষক ও কর্মচারী বিনা বেতনে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে স্থানীয় এমপির কাছ থেকে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে সামান্য কিছু সাহায্য পেলেও প্রতিষ্ঠার ৬ বছরেও মিলেনি সরকারের স্বীকৃতি।

জানা গেছে, নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুর বাজারের মাষ্টারপাড়ার মৃত মোবারক হোসেনের পুত্র শাহজাহান আলী কয়েক বছর পূর্ব থেকে একটি প্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার চিন্তা ভাবনা করে। এই চিন্তা ভাবনা থেকেই উপজেলার নিতপুর কপালির মোড়ে ২০১৩ সালে ১০ শতাংশ জমির ওপর এই প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। তার বাবার নামেই ‘মোবারক হোসেন প্রতিবন্ধী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামকরণ করা হয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ইটের পাঁচটি আধাপাকা ঘর আছে। ঘরের জানালা, দরজা নেই। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষকসহ বর্তমানে ১৭জন শিক্ষক ও কর্মচারী আছেন। পাঁচ বছর বয়স থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে ২৫৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। গড়ে প্রতিদিন ৭০-৮০জন ছাত্র ছাত্রী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। ছাত্র ছাত্রীদের নিকট থেকে কোনো বেতন ভাতা নেয়া হয় না। প্রয়োজনীয় খেলনা সামগ্রী, হুইল চেয়ার সংকট ও শ্রেণীকক্ষ না থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের বারান্দায় বসে ক্লাস করতে হয়। স্কুলের একটি মাত্র গাড়ি থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না।

বিদ্যালয়ের বেশ কজন ছাত্র-ছাত্রীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই স্কুলে লেখাপড়া করে তারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এখানকার শিক্ষকরা তাদের খুব আদর যত্ন করেন। তবে শ্রেণিকক্ষ, হুইল চেয়ার ও বেঞ্চ সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীদের মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হয়। এতে করে অনেক শিক্ষার্থীর কষ্ট হয় এমনকি কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মচারীরা জানায়, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের পাঠদান করতে গিয়ে তাদের নানা রকম সমস্যায় পড়তে হয়। তারা তাদের মনমতো কাজ করে যখন যেটা চায় সেটা না পেলে কান্নাকাটি করে মারধর করে। বিদ্যালয়ের নানান সংকটের মধ্যেও তারা সেচ্ছায় পাঠ দান করে যাচ্ছেন। কোনো প্রকার বেতন ভাতা না থাকার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা।

মোবারক হোসেন প্রতিবন্ধী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মওদুদ আহম্মেদ বলেন, স্কুলে কোনো প্রকার থেরাপি রুম, যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে আমরা একটা বাচ্চাকেও সঠিক সেবা দিতে পারছি না। বর্তমানে ২৫৪জন প্রতিবন্ধী ছাত্র ছাত্রীর আশ্রয়স্থল হয়ে পড়েছে স্কুলটি। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন অবকাঠামোগত কিছু সহযোগিতা করেছেন। বাকি যাবতীয় খরচ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে চালানো হয়। স্কুলটি সরকারের স্বীকৃতিসহ জাতীয় করণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছেন তিনি।

পোরশা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকজন প্রতিবন্ধীকে ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন উপজেলা সমাজসেবা অফিস। তবে স্কুলটির স্বীকৃতি বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না বলে জানালেন তিনি।

শিক্ষকদের প্রত্যাশা এক সময় এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। এই আশায় বুক বেঁধে কোনো প্রকার সুযোগ সুবিধা ছাড়াই নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে শিক্ষাবান্ধব বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে এলাকার সচেতন মহলের দাবি অচিরেই এই প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হোক।