• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

এখন লেখাপড়া করছে ঋষি পল্লীর ছেলে মেয়েরা

  সোহেল রানা, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ০৪ নভেম্বর ২০১৮, ১২:২১

সিরাজগঞ্জ
ঋষি পল্লীর ছেলে মেয়েদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে নৈশকালীন ক্লাস

মিঠুন, আকাশ, বিশাল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। দ্রুতি, সবুজ পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মিতু পড়া লেখা করে চতুর্থ শ্রেণিতে। এদের সবারই বাড়ি সলঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিমানা ঘেষা ঋষি পল্লীতে। এদের বাবা-দাদার পেশা জুতা সেলাই ও জুতা তৈরিসহ চামড়ার কাজ। বর্তমানে অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে কেউ কেউ। 

ঋষি পল্লীতে রয়েছে ব্যাপক হারে বাল্য বিয়ের প্রবণতা। প্রায় হাজার লোকের বসবাস এই পল্লীতে। ৯০ ভাগ লোক নিরক্ষর। মেনে চলে নানা কুসংস্কার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া লেখার মত প্রায় ৬০/৭০ জন শিশু রয়েছে এখানে। এরা সবাই পরিশ্রমী। বাবার সাথে জুতা সেলাইয়ের কাজ করে। অনেকে কুড়ায় রান্নার লাকড়ী। কেউবা পানির খালি বোতল। সবাই ঝড়ে পড়ছে শিক্ষার আলো থেকে। এগিয়ে আসেনি সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থা। 

এমতাবস্থায় ঋষি পল্লীতে শিক্ষার আলো ছড়াতে ভাবতে থাকেন রায়গঞ্জ উপজেলার সলঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ ফ ম জহুরুল ইসলাম। অভিভাবকদের নিয়ে বসেন বৈঠকে। প্রথম দিকে মেলেনি তেমন সাড়া। অনেক অভিভাবকের কথা আমরা গরীব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। কর্তাদের পায়ের ধুলিই আমাদের কামনা। লেখা পড়া দিয়ে আমাদের কোনো কাজ নেই। হাল ছাড়েনি আ ফ ম জহুরুল ইসলাম। একাধিকবার বৈঠক করে স্কুলমুখী করেন ঋষি পল্লীর শিশুদের। এ দিকে শিশুরা বিদ্যালয়ে আসলেও পড়া শোনায় এগুতে পারছে না। কারণ ঋষি পল্লীর শিশুদের পড়া লেখার পরিবেশ নেই বাড়িতে। তাগাদা নেই তাদের অভিভাবকদের। 

বিষয়টি অনুধাবন করেন আ ফ ম জহুরুল ইসলাম। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পড়া লেখায় উত্তরণ ঘটাতে শিক্ষকদের এবং ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নিয়ে বসেন পরামর্শ বৈঠকে। পরামর্শ মোতাবেক পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে নৈশকালীন ক্লাসের ব্যবস্থা করেন। এখন আর পড়া লেখায় পিছিয়ে নেই  মিঠুন, আকাশ, বিশাল, দ্রুতি, সবুজ, মিতুসহ ঋষি পল্লীর প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীরা। শুধু তাই নয় মিঠুন, আকাশ, বিশাল দ্রুতি, সবুজ, মিতুরা বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা রাখছে। পল্লীর কোনো বালিকার বিয়ের কথা হলেই জানিয়ে দিচ্ছে প্রধান শিক্ষক আ ফ ম জহুরুল ইসলাম স্যারকে। ফলে বাল্য বিয়ের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে ঋষি পল্লীর শিশু কিশোরী। 

সরেজমিনে রায়গঞ্জ উপজেলার সলঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় অর্ধশতাধিক ঋষি পল্লীর শিশুরা একটি শ্রেণি কক্ষে পড়া লেখা করছে। 

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী মিতু দাসের সাথে কথা হয় । সে বলে আমরা আগে বাড়িতে পড়তে বসতাম না। কারণ আমাদের মা বাবা বলত কারেন্টের বিল বাড়ছে। পড়া লেখা করে কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
সলঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ ফ ম জহুরুল ইসলামের জানান, তিন জন খণ্ডকালীন শিক্ষক রাখা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত সাড়ে ৯ পর্যন্ত ঋষি পল্লী শিশুদের ক্লাস করানো হয়। এরা এখন শুধু পড়া লেখাতেই নয় নাচে গানে এবং খেলাধুলায় ব্যাপক পারদর্শী হয়ে উঠেছে। 

রায়গঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আক্তারুজ্জামানের সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে আগেই অবগত হয়ে পরিদর্শন করেছি। পরিবেশটি খুব ভালো লেগেছে। দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আ ফ ম জহুরুল ইসলামের মত শিক্ষক থাকলে পড়া লেখা থেকে কোন শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে না।
 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড