• শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

টেবিলের উপর পা তুলে মোবাইলে গেমস খেলছেন শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষে ঝুলছে তালা

  মো. গোলামুর রহমান, লংগদু (রাঙ্গামাটি)

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩:৩২
প্রাইমারি স্কুল

প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে শিশুদের শিক্ষা জীবনের শুরু। আর সেখানটাতেই যদি পড়া লেখা নিয়ে হয় লুকোচুরি, তাহলে শিশুদের আর শেখার জায়গাটি কোথায়? প্রশ্ন অভিভাবকদের।

বলা হচ্ছে, রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলাধীন আটারকছড়া ইউনিয়নের উত্তর ইয়ারিংছড়ি (উল্টা ছড়ি) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। স্কুলটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল চলাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষক আর সাথে তিনজন সহকারী শিক্ষক বসে বসে গল্প করছেন। সাংবাদিক এবং জনপ্রতিনিধিদের দেখে সহকারী তিনজনই কাগজ কলম হাতে নিয়ে অফিসেই লেখালেখির কাজ শুরু করে। প্রধান শিক্ষক চুপটি মেরে বসে থাকে।

প্রধান শিক্ষক রমেন চাকমার কাছে স্কুলে চলাকালীন সময়ে ক্লাস রুম তালা ঝুলানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, কই তালা মারা। যখনই সংবাদিক বলেন, আপনি আমার সাথে আসেন দেখি ক্লাস রুম খোলা আছে কি না। তখন তিনি বলেন, ছাত্র ছাত্রী নাই তালা খুলে কি হবে? প্রধান শিক্ষকের কাছে ঐদিনের ছাত্র ছাত্রী হাজিরা এবং শিক্ষক হাজিরা খাতা দেখতে চাইলেও দেখাতে ব্যর্থ হন তারা। প্রধান শিক্ষক সহকারী শিক্ষককে বলেন, 'তোমার কাছে খাতা!' আর সহকারী বলেন, 'আপনার কাছে।' পরবর্তীতে কেউ আর দেখাতে পারেনি।

এছাড়াও অফিস কক্ষেই সিগারেট (ধূমপান) করার বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলে তিনি চুপ করে থাকেন। অফিসে বসে দাবা খেলা, তামাক খাওয়া নিত্য দিনের কাজ বলছেন অভিভাবকরা।

স্কুলের বাথরুম এবং প্রাক-প্রাথমিক রুমের বেহাল দশার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি। যেখানে প্রাক-প্রাথমিক ক্লাস রুমটি থাকার কথা পরিপাটি ও বিভিন্ন খেলনা দিয়ে সাজানো। সেখানে চেয়ার টেবিল আর বেঞ্চ ছাড়া কিছুই ছিল না।

ঐদিন একজন ছাত্র ছাত্রীও স্কুলে নাই কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান শিক্ষক বলেন, পাশে হাই স্কুলে অনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানে সবাই চলে গেছে। কিন্তু সঠিক বিষয়টি জানতে গিয়ে দেখা গেলো, হাইস্কুলে প্রাইমারির কোনো ছাত্র ওখানে নাই।

স্কুলটিতে একজনও মুসলিম শিক্ষক নাই। মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের ধর্মীয় শিক্ষা কিভাবে পড়ানো হয় প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, এখানে ধর্মীয় শিক্ষক নাই ৭ বছর। আমরাই ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা পড়াই। এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, আমি শিক্ষক চেয়েছি, শিক্ষা অফিস শিক্ষক দেয়নি। এছাড়াও স্কুলে একটি সরকারী ল্যাপটপ থাকার কথা থাকলেও, ল্যাপটপটি কোথায় এটার কোনো উত্তর দেয়নি প্রধান শিক্ষক।

একই স্কুলের সহকারী শিক্ষক সুজন চাকমা ক্লাস না নিয়ে অফিসের চেয়ারে বসেই টেবিলের উপর দুই পা তুলে দিয়ে মোবাইলে গেমস খেলার নেশায় ব্যস্ত থাকার অভিযোগ করেছে অভিভাবকরা। যার প্রমাণও প্রতিনিধির হাতে দিয়েছেন তারা।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোতালেব হোসেনের কাছে স্কুলের এই বেহাল দশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলে ভালো করে ক্লাস হয় না, তাই ছাত্ররাও যায় না।

এছাড়া অফিস কক্ষের বেহাল দশা এবং স্কুলের ল্যাপটপের বিষয়ে তিনি বলেন, ল্যাপটপ একটি স্কুলে সরকারীভাবে পেয়েছি। কিন্তু এখন সেটি কোথায় আছে প্রধান শিক্ষক জানে। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা আমিও বেশ কয়েকবার তাদের বলেছি ছাত্রদের দিয়ে হলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সহ সভাপতি মনির হোসেন বলেন, আমরা চাই স্কুলটি পরিবর্তন করতে কিন্তু ছাত্র ছাত্রী ঠিক মত আসে না। আবার শিক্ষকরাও তেমন মনযোগী না। যার ফলে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রুস্তম আলী রুপ চান বলেন, স্কুলটির বেহাল দশা দীর্ঘদিন যাবত। শিক্ষকদের অবহেলার কারণে ছাত্র ছাত্রী স্কুলে আসে না। পুরো স্কুলে মুসলিম কোনো শিক্ষক নাই, সবাই পাহাড়ী হওয়ায় বাচ্চারা স্কুলে আসতে চায় না। কারণ ছোট ছোট ছাত্ররা তাদের ভাষা সহজে বুঝতে পারে না। এছাড়া হেলা অবহেলায় দিন যাচ্ছে স্কুলটির।

অভিভাবক ও ইয়ারিংছড়ি সেনামৈত্রী স্কুলের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্কুলটির শিক্ষকরা নিয়ম করে অনিয়মিত আসে। আজ দুজন আসলে, আগামীকাল অন্য দুজন আসে। তাছাড়া এখান থেকে পাশের হাই স্কুলে যখন ছাত্রগুলো যায়, এরা বাংলাটা পর্যন্ত বানান করে পড়তে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার এম কে ইমাম উদ্দীন বলেন, যেহেতু বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি, অবশ্যই খুব শীঘ্রই আমরা এর ব্যবস্থা নিবো। আশা করি দু-একদিনের মধ্যে স্কুলটির পরিবেশ পরিবর্তন হবে।

এ বিষয়ে লংগদু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অঃদাঃ) মো. মাসুদ রানা বলেন, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড