• বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কুষ্টিয়া-১ আসনে নৌকার পরাজয়ের নেপথ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি, দলীয় কোন্দল

  আতিয়ার রহমান, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া):

১৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১৯:১৪
এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ আসনের নৌকা প্রার্থী এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ। ছবি- সংগৃহীত

সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি, দলীয় কোন্দল ও দালাল শ্রেণীর নামধারী কথিত কতিপয় নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ায় কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। ট্রাক প্রতীক নিয়ে দৌলতপুর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি আলহাজ্ব রেজাউল হক চৌধুরী বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয় অর্জন করলেও নৌকার প্রার্থী দৌলতপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ হয়েছেন তৃতীয়। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন দৌলতপুর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি আফাজ উদ্দিন আহমেদের বড় ছেলে নাজমুল হুদা পটল।

বিগত ৫ বছরে আওয়ামী লীগ দলীয় মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, নিজ প্রয়োজনে বা কাজের জন্য কেউ দেখা করতে গেলে তাদের সাথে অসাদাচারন, সর্বদা ডিগবাজি মারা কতিপয় দালাল শ্রেণীর নামধারী নেতাদের প্রাধান্য দেওয়াসহ তাদের নিয়ে চলাফেরা ও দাওয়াত নির্ভর কর্মকান্ড পরিচালনা করায় আওয়ামী লীগ মনোনিত নৌকার প্রার্থী এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরেছেন বলে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ ভোটার ও নেতা-কর্মীদের অভিমত। এ

ছাড়াও বিএনপি দলীয় চরাঞ্চলের এক সময়ের ত্রাস লালচাদ বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড মরিচা ইউনিয়নের হাটখোলাপাড়া গ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী উজ্জল সর্দারকে প্রাধান্য দিয়ে তার নেতৃত্বে হাটখোলাপাড়া গ্রামে আওয়ামী দলীয় দুই কর্মীকে নির্মম ও নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা, শান্ত চিলমারীকে অশান্ত করে ৩জন গ্রামবাসীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুই ইউনিয়নের নিরীহ ও নৌকা পাগল সাধারণ মানুষ সরওয়ার জাহান বাদশাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা পেয়েও বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয় বরণ করতে হয় তাকে।

দৌলতপুর আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আরও জানান, দৌলতপুর ইউনিয়নের বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের ত্যাগী প্রবীণ নেতা রেজওয়ানুল হক রেজু, অড়িয়ার গণমানুষের নেতা ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আল মামুন, বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকে দৌলতপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি পদে থাকা মথুরাপুরের শামছদ্দিন আহমেদ পরিবার সহ নির্যাতিত আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা- কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে নিজ পছন্দের লোকজন নিয়ে দৌলতপুর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করে তাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া এবারের নির্বাচনে পরাজয়ের আরো একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তারা।

এছাড়াও রয়েছে ভুঁয়া মুক্তিযোদ্ধা বানানোর কারিগর ও ফিলিপনগরের বিতর্কিত ব্যক্তি এমপি কপালে হায়দার আলীকে সর্বদা গুরুত্ব দেওয়া, জাপা থেকে আ. লীগ সর্বদা ডিগবাজি মারা দালাল নামে খ্যাত মথুরাপুরের এক নেতা যিনি এমপি'র প্রতিনিধি নামে নিজেকে সর্বদা জাহির করতে পছন্দ করতেন এবং তারাগুনিয়ার এক ফুরফুরে নেতাকে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব দিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে বাঁধাগ্রস্থ করা, ভাতার কার্ড করার নামে ছিন্নমূল মানুষের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াও নৌকার ভরাডুবির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে দৌলতপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও।

শুধু তাই নয়, নিজ এলাকা ও নিজ ইউনিয়নের জনগণের সাথেও ছিল বেশ দূরত্ব। এমনকি সদ্য বিগত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ৫বছরে দৌলতপুরে দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন না হওয়ায় সুশীল সমাজের মানুষেরও আস্থা অর্জন করতে পারেননি তিনি। অথচ ২০১৮ সালের নির্বাচনে সময় এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ দৌলতপুরকে আধুনিক ও মডেল দৌলতপুর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভেড়ামরা- ফিলিপনগর-প্রাগপুর হয়ে মেহেরপুরের মুজিবনগর পর্যন্ত রেল সড়ক নির্মাণের। ছিল ভেড়ামারা-প্রাগপুর ফোরলেন করার প্রতিশ্রুতি। প্রাগপুর সীমান্তে স্থলবন্দরের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। খলিসাকুন্ডিতে বিনোদন পার্ক, ফিলিপনগরে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ষ্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

যার একটিও আলোর মুখ দেখেনি। তিনি মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ দলীয় সাধারণ নেতা-কর্মীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে গুটিকয়েক নামধারী নেতা ও চিহ্নিত দালালদের সাথে নিয়ে ভুরিভোজ করে ৫টি বছর কাটিয়েছেন এমন অভিযোগও করেছেন তৃলমূলের নেতা ও কর্মীরা। দৌলতপুরের ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের বাদ দিয়ে নিজের শ্বশুরসহ ফিলিপনগরের প্রায় ১৩জন দলের অস্তিত্বহীন ব্যক্তিদের নিয়ে দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করেন যাদের দু’একজন বাদে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার পক্ষে তাদের কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। এমনকি তিন ভাগে বিভক্ত দৌলতপুর আওয়ামী লীগকে একত্রিত করাসহ সুসংগঠিত করারও কোন ভূমিকা নেননি তিনি। আর এমন অভিযোগও রয়েছে খোদ দলের অভ্যন্তরেই। আর এসব কারণেই এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার দূর্গে হানা দিয়েছে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তার কর্মী সমর্থকরা। ফলে তিনি তীরে ভিড়াতে পারেননি তরী।

যদিও তিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্যে অভিযোগ করে বলেছেন, ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরে আমরা প্রয়াত নেতা আফাজ উদ্দিন আহমেদের কনিষ্ঠপুত্র এজাজ আহমেদ মামুনকে উপজেলা নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন এনে দিতে সহযোগিতা করেছিলাম। তার পক্ষে নির্বাচন করে তাকে জয়লাভ করিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সব সময় উল্টো পথেই চলেছে। তারা ৫ বার নৌকায় ভোট নিয়েছেন কিন্তু নৌকায় ভোট দেননি বা নৌকাকে সমর্থন করেনি। ১৯৯১ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তারা নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এবারও তারা নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নৌকার তলা ফুটো করলেন বলে অভিযোগ করেন।

সর্বপরি জনসম্পৃক্ততা না থাকার পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিজ গতিতে চলার কারণে নৌকার দূর্গে হানা দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী। আর এমনটাই মনে করেন দৌলতপুরের সচেতন মহল।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়াীর নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব রেজাউল হক চৌধুরী চৌধুরী ৮৯ হাজার ২৭৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী ঈগল প্রতীকের অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজমুল হুদা পটল ৫৩হাজার ১০৫ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন এবং ৪৮হাজার ৯৬১ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন নৌকার প্রার্থী আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড