• বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কুমার নদ এখন যেন এক ময়লার ভাগাড়

  জে রাসেল, ফরিদপুর

০৬ জুন ২০২৩, ১০:৪০
কুমার নদ এখন যেন এক ময়লার ভাগাড়
কুমার নদ (ছবি : অধিকার)

ফরিদপুর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদের বুকে কচুরিপানার কারণে নদীর পানি দেখা যায়না। ময়লা আবর্জনা দেখে মনে হয় এ যেন এক ময়লার ভাগাড়। নদের পানিও ব্যবহার করা যায় না।

যদিও নানা কারণে কুমার নদের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। ফরিদপুর শহর গড়ে উঠেছে এই নদের দুই পারে। এই শহরকে টিকিয়ে রাখতে হলে কুমার নদকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। এজন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে এমনটিই দাবি জনগণের।

এ অবস্থায় কুমার নদের কচুরিপানা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত ১ জুন ফরিদপুরের কুমার নদ সহ সকল নদনদীর কচুরিপানা পরিষ্কারের লক্ষ্যে এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার সভায় সভাপতিত্ব করেন।

সভায় জানানো হয়, আগামী ১৭ জুন থেকে জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদারের নেতৃত্বে ফরিদপুরের কুমার নদীতে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কচুরিপানা পরিষ্কার অভিযান শুরু হবে। নদী সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যক্রম চলবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কুমার নদের বুকে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে কচুরিপানা আর নানা জঞ্জাল। শহরের সকল ড্রেনগুলো এসে মিশেছে নদীতে। নদীর পানি দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই পানি ব্যবহার করলে শরীর চুলকায়।

নদীতে গোসল ও কাপড়চোপড় কাচার কাজে আসা লোকজন বলেন, তারা নিতান্ত বাধ্য হয়ে এই পানি ব্যবহার করেন। এই পানিতে গোসল করলে শরীরে খুজলি পাঁচড়া হয়।

শহরের মূল অংশে দেখা গেলো বাজার ও বাসাবাড়ির যাবতীয় ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে। রান্নাঘরের আবর্জনা ছাড়াও রয়েছে মালসামানার কার্টন, পলিথিন এমনকি মল-মূত্র পর্যন্ত। হাজি শরিয়তুল্লাহ বাজারের পাশে ড্রেন দিয়ে আসছে পতিতালয়ের ঘরের নোংরা পানি এমনকি ব্যবহৃত কনডমও।

সেখানে গোসল করতে আসা এক লোক বলেন, আমরা এই পানি দিয়ে অজু করতে পারিনা।

এ দিকে শহরের দুটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য ড্রেন ও পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। রথখোলার বাসিন্দা সুকুমার নাথ বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আমাদের বলেছিলেন এই নদীর পাড়ে হাতির ঝিলের মতো করে দিবেন। তার কিছুই আমরা পেলাম না। অথচ ছোটবেলায় দেখেছি সারাদেশ থেকে আমাদের নদীতে বড় বড় নৌকা ও স্টিমার আসতো। এখন নদীতে গোসলও করতে পারিনা। শহরের অম্বিকাপুরে নতুন একটি ঘাটলার বিপরীত পাড়ে দেখা গেলো বড়সড় ঘর তৈরি করা হচ্ছে নদীর জায়গা জুড়ে পোল্ট্রি ফার্ম করার জন্যে।

নদীর দুই পাড় যেন ক্রমেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। নদীর পাড়ের জায়গা দখল করে প্রভাবশালীরা ঘর তুলছে। দিনে দিনে বাড়ছে নদীর পাড় দখলের প্রতিযোগিতা। শহরের প্রান্তে কুমার নদের উৎস মুখের কাছে চুনাঘাটা হতে অম্বিকাপুর পর্যন্ত দুই পাড় পুনখননের সময় দখলমুক্ত হলেও আবারো সেখানে বেদখল হয়ে যাচ্ছে নদীর পাড়। নদীর পাড়ে ঘর তুলে মুরগি খামার করে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে।

শহরের বুকে দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়নি। শহরের বর্জ্য বুকে নিয়ে কুমার নদ এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। ফরিদপুর হয়ে গোপালগঞ্জের আড়িয়াল খাঁ ও মধুমতী নদীতে মিশেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই কুমার নদ। তবে বিভিন্নস্থানে খননের পরপরই নদী ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে একসময়ের স্রোতস্বিনী কুমার বর্তমানে অনেক স্থানে অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে।

ফরিদপুর ও মধুখালী উপজেলার সীমানাবর্তী বারভাগদিয়ার নিকটে পুনখননের পরেও জেগে উঠেছে মাঝনদীর বুক।

ফরিদপুর শহরের বুকে কুমার নদের দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ দখলদারদের নানা স্থাপনা। এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করতে না পারায় শহরের বুকে কুমার নদ পুন:খনন করা যায়নি। দখল ও দূষণে জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় শহরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পৌরসভার সকল ড্রেনের ময়লা পানি ফেলা হচ্ছে কুমার নদে। এসব ড্রেন দিয়ে আসছে স্যুয়ারেজ লাইনের পয়:বর্জ্য। নদীর বুক জুড়ে এখন কচুরিপানা আর ময়লার স্তূপ জমে এঁদো ডোবার মতো হয়ে গেছে। পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পরিণত হয়েছে মশার আতুর ঘর। এই পানিতেই নিতান্ত বাধ্য হয়ে কিছু মানুষ গোসল করছেন।

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক পান্না বালা বলেন, ফরিদপুরের এই কুমার নদের প্রকল্প হাতে নেয়ার পরে আমরা অনেক আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে এলেও তার কিছুই বাস্তবায়ন হলো না। কুমার নদ এখন একটি মরা খালে পরিণত হয়েছে। পৌরসভার সকল ড্রেন ও নালা এসে পড়েছে নদীর বুকে।

তিনি বলেন, কুমার নদকে বাঁচাতে হবে। ফরিদপুরবাসীর প্রত্যাশা এই নদীর সংস্কার করা হবে। নদীর পানি দূষণমুক্ত করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা খুবই জরুরি।

ফরিদপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র মনিরুল ইসলাম বলেন, এই কুমার নদ আগে অনেক স্রোতস্বিনী নদী ছিলো৷ কিন্তু দিনে দিনে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। বাজারের ও বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে। যদিও শহরের বুকে কুমার নদে বাসাবাড়ি ও বাজারের বর্জ্য না ফেলার জন্য আমরা নদীর পাড়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সকলকে নিষেধ করে দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, শহরের ড্রেনের মুখগুলোর বিকল্প পথ খুঁজে বের করার বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, কুমার নদের পাড়ে বিভিন্ন অবকাঠামো থাকায় শহরের মধ্যকার দুই কিলোমিটার পুন:খনন করা সম্ভব হয়নি। তবে এখানে নদীর যে নাব্যতা থাকার কথা তা রয়েছে। নদীর পানির দূষণ দূরীকরণে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

উল্লেখ্য, কুমার নদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৮ সালে কুমার নদ পুন:খনন ও ৬১টি পাকা ঘাটলা নির্মাণ কাজ শুরু করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কুমার নদে ১০ কোটি ঘনমিটার পানিপ্রবাহের মাধ্যমে ২৩ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে সেচ-সুবিধা দিয়ে ৩৪ হাজার ১০৪ হেক্টর টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড