• মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৬  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

শিরোনাম :

থেরেসা মে : ব্রেক্সিট ইস্যুতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোট জানুয়ারিতে||'নির্বাচনে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপ আহ্বান'||রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রস্তাব আলোচনা বর্জন করেছে চীন ও রাশিয়া||৩০০ কোটি টাকায় দুটি রুশ হেলিকপ্টার কিনছে বিজিবি||বরখাস্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ হোসে মরিনহো||সু চি’কে দেওয়া পুরস্কার প্রত্যাহার করল দক্ষিণ কোরিয়া||নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডও বিদ্যমান : সিইসি||জামায়াতের ২২ নেতার ‘ধানের শীষ’ বাতিলে আদালতে রুল||যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে বিএনপি   ||প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধের অঙ্গীকার করল বিএনপি 

ইতিহাস, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জেলা ঝিনাইদহ

  শাহারিয়া্র রহমান রকি, ঝিনাইদহ ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৪৬

ঝিনাইদহ
গনিতবিদ কেপি বসুর বাড়ি

বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা ঝিনাইদহ। এ জেলার পূর্বে মাগুরা, উত্তরে কুষ্টিয়া আর দক্ষিণ ও পশ্চিমে যশোর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার পাশাপাশি ভারতের ২৪পরগোনা ও নদীয়া জেলা রয়েছে। নদী বিধৌত এ জেলার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব প্রাপ্তদের মধ্যে এক জনের বাড়ি ঝিনাইদহে। রয়েছে মরমী কবি পাগলা কানাই এর বাড়ি। 

নদ-নদীর জন্ম সাধারনত পাহাড় থেকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার সীমান্ত এলাকায় ভারতের অনেক পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। আর সেখান থেকেই জন্ম অনেক নদীর। পদ্মা, নবগঙ্গা, ইছামতি মাথাভাঙ্গাসহ বিভিন্ন নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এমনই ১২ টি নদী প্রবাহিত ঝিনাইদহ জেলার ওপর দিয়ে। 

জানা যায় বহু বছর আগে খ্রিষ্টের খ্রিস্টের জন্মের পর এই জনপদের সৃষ্টি হয়েছিল। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ব্রিটিশরা এখানে শাসন করার জন্য একটি ফাঁড়ি স্থাপন করে। সেই সময় থেকে ব্রিটিশরা টানা শাসন করতে থাকে। 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বট গাছ

পরে তাদের শাসন আরও সুদৃঢ় করতে ১৮৬৩ সালে এই অঞ্চলে মহকুমা প্রতিষ্ঠা করেন। যার জেলা বানানো হয় যশোর আর মহকুমা বানানো হয় কোটচাঁদপুর উপজেলা অংশকে। এর এক বছর পর গোটা ঝিনাইদহ অংশকে মহকুমার অধীনে নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। এই মহকুমায় শাসনের সকল প্রকার কাগজ ও অন্যান্য জিনিসপত্র আনা হতো যশোর জেলা থেকে।

পরবর্তী সময় নদী বিধৌত এ জেলার নদী গুলোতে তুলনামূলক ভাবে বেশি ঝিনুক পাওয়া যেত। আর এই ঝিনুক থেকে তৈরি হতো চুন। ফলে ব্রিটিশদের ব্যবসার বড় অংশ ছিল এটি। আর এই ঝিনুকে পাওয়া যেত প্রচুর মুক্তা। ফলে কলকাতার বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখানে জাহাজে আসত মুক্তা সংগ্রহের জন্য। এ ভাবে এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ঝিনুকদহ। 

পরবর্তী সময় ব্রিটিশ শাসন শেষ হবার পর ১৯৪৭ সালের পর সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলের নাম হয় ঝিনাইদহ। 

ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ ড. বি এম রেজাউল করিম জানান, এক সময় দহ শব্দটি ব্যবহার হত দোহা হিসাবে। আর দহ শব্দের অর্থ হচ্ছে জলাশয়। অন্যদিকে নদ-নদী থেকে প্রাপ্ত ঝিনুক থেকে তৈরি করা হত চুন। ফলে এই অঞ্চলের নামকরণ হয় ঝিনাইদহ।

তিনি আরও জানান, নবগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর পাশে উঁচু জায়গাগুলোতে ঝিনুক জ্বালিয়ে তৈরি করা হত চুন। আর নদীর পাড় ঘেষেই এ ব্যবসা ছিল জমজমাট। এখন আর এখানে তেমন কেউ চুন তৈরি করে না। 

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সম্মুখ প্রতিরোধ যুদ্ধ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ঝিনাইদহের বিষয়খালী বাজার নামক স্থানে। ২৫ মার্চ রাতে যশোর ক্যন্টনমেন্ট থেকে প্রায় ৩০ গাড়ি পার্ক সেনা ঝিনাইদহের ওপর দিয়ে কুষ্টিয়া অভিমুখে রওনা হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিকামী জনতা চিন্তা করে আবারও এই রাস্তা দিয়ে পাক-সেনারা । তাই যদি বিষয়খালী বেগবতি নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজ ভেঙে ফেলা হয় তাহলে আর আসতে পারবেনা।

তাই ঝিনাইদহ জেলার মুক্তিকামী জনতা এবং ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার, বিডিআর, পুলিশ এসডিও থেকে অস্ত্র  নিয়ে পহেলা এপ্রিল ভেঙে ফেলে ব্রিজ। এতে বিষয়খালী নদীর দুই পাশে মুক্তিকামী জনতার সাথে পাকহানাদারদের প্রথম সম্মুখ প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত। এই যুদ্ধে ২৮ জন নাম জানাসহ নাম না জানাও অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। 

এ দিনের পর হানাদারদের তীব্র আক্রমনে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে তারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় ঝিনাইদহ। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে ২০১২ সালে বিষয়খালী বাজারে নির্মিত হয় ন্মারক ভাষ্কর্য। 

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
মহান মুক্তিযুদ্ধে যে ৭ জন  বীর যোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পেয়েছেন তাদের মধ্যে হামিদুর রহমানের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুরের খোর্দ্দখালিশপুর গ্রামে (বর্তমানে হামিদনগর)। ১৯৪৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশপরগোনা জেলার চাপড়া থানার ডুমুরিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আক্কাছ আলী, মাতার নাম কায়দাছন নেছা। 

পরবর্তী সময় দেশ ভাগের পর ভারত থেকে চলে আসেন বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর থানার খোর্দ্দখালিশপুর গ্রামে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় ১৯৭০ সালে হামিদুর রহমান যোগদেন সেনা বাহিনীর সিপাহী পদে। পরে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাড়িতে চলে আসেন হামিদুর।

এরপর দেশমাত্রিকার টানে মৌলভিবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের ধলই নামক স্থানে যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। একের পর ঘায়েল করতে থাকেন পাকহানাদারদের। 

ধলই বিওপিতে ছিল পাকবাহিনীর শক্তঘাঠি। এটি মুক্ত করা গেলে মুক্ত হবে বিস্তীর্ণ এলাকা। তাই ২৮ অক্টোবর প্রতুষ্যে সেখানে হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে আক্রমণ শুরু করে মুক্তিবাহিনী। সেখানে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে হানাদার বাহিনী। তবুও পিছু হটেনি মুক্তিবাহনীর সদস্যরা। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ শত্রুপক্ষের একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় হামিদুর রহমানের কপালে। বীরদর্পে শহীদ হলেন তিনি। 

 

এভাবে ৫ দিন যুদ্ধের পর মুক্ত হয় ধলই বিওপি। সে সময় হামিদুরের মৃতদেহ দাফন করা হয় সীমান্তের অল্পদূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি জায়গা। সেখান থেকে দীর্ঘদিন পর ২০০৭ সালে মৃতদেহ নিয়ে এসে দাফন করা হয় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবর স্থানে। 

তার নামানুসারে নিজ গ্রামে রয়েছে স্মৃতি যাদুঘর, রয়েছে সরকারি হামিদুর রহমান কলেজ। গ্রামের নামকরণও করা হয় হামিদনগর। জিনাইদহ জেলার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র জেলা স্টেডিয়ামের নামকরণও করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্টেডিয়াম। 

বারো আওলিয়ার বারবাজার
১৬৪২ সালের পর যশোর ও খুলনার বিস্তীর্ণ এলাকা জয়ের গৌরব অর্জন করেন বাগেরহাটের পরশমণি শ্রেষ্ট আওলিয়া হযরত খান জাহান আলী। তিনি ১৬৫৯ সালে (৮৬৩) হিজরী ২৩ অক্টোবর ইহধাম ত্যাগ করেন। 

তিনি এক সময় নিজের আত্মরক্ষার্থে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হয়ে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতুপুর প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বৃহত্তর যশোর জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার হাকিমপুর হয়ে বারোবাজার অভিমুখে রওনা দেন। পথিমধ্যে জনসাধারণের পানীয় জলের তীব্র কষ্ট দেখে তিনি এ অঞ্চলে অগনিত দিঘি আর পুকুর খনন করেন। কিংবদন্তি আছে, একই রাতে এ সব জলাশয় খনন করা হয়েছিল। 

এক সময় হযরত খানজাহান আলী বেলাট দৌলতপুরের পূর্ব দিকে বাদুগাছা গ্রামের প্রভাবশালী শ্রীরাম রাজাধীরাজের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। এবং কিছুটা বাধাগ্রস্ত হন। ফলে তিনি মুসলিশ ধর্ম প্রচারে অধিক উৎসাহী হয়ে এই বারোবাজারে এক যুগকাল অবস্থান করেন তার দৃঢ় মনোবল উদারতা, দানশীলতা ও মাহনুবভতায় এলাকাবাসী মুগ্ধ হয়ে পড়েন। এলাকার অনেক অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণে ঝুঁকে পড়েন। এভাবে একযুগ অবস্থান করেন। ফলে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন একে একে ১২ টি মসজিদ।

বারআউলিয়া বারবাজারের বার মসজিদের একটি

পরবর্তী সময়ে মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করা হয় এ  সকল মসজিদ। এর মধ্যে সাতগাছিয়া মসজিদ, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, গোড়ার মসজিদ, পীরপুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ,  নুনপোলা মসজিদ, পাঠাগার মসজিদস হ ১২ টি মসজিদ। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিদর্শন ৩২ গম্বুজবিশিষ্ট সাত গাছিয়া আদিনা মসজিদ ও বারোবাজার গলাকাটা দিঘির ৬  গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। যে মসজিদটি অনন্তকাল ধরে  মাত্র দুটি ভিত্তির ওপর দন্ডায়মান রয়েছে।  

এভাবেই এই অঞ্চলটি দেশের বুকে  পরিচিতি লাভ করে বার আওলিয়ার বারোবাজার হিসেবে। এখনও অগনিত ভ্রমণপিপাসুরা এখানে আসেন ইতিহাসের এই স্থানটি দর্শনে।   

এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ 
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মল্লিকপুর গ্রামে অবস্থিত এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ, বয়স আনুমানিক ৩শ বছর অবস্থান ২.০৮ একর জমির ওপর। ১৯৮২ সালের দিকে গাছটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। কালের পরিক্রমায় মূল গাছটি মারা গেলেও বর্তমানে বেঁচে থাকা তৃতীয় প্রজন্মের গাছগুলি। বর্তমানে এখানে গাছের সংখ্যা ২১ টি, শুরুতে এ সংখ্যা ছিল অর্ধশতাধিক। 

এশিয়ার বৃহত্তম এই বটগাছটি দেখতে এখনও অনেক দর্শনার্থী এখানে আসে। আবার বটের ছায়ায় একটু স্বস্তির নিশ্বাসও নিতে পারে দর্শনার্থীরা। দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা তৈরি করতে ২০০৯ সালে জেলা পরিষদ থেকে সামাজিক বন বিভাগ যশোরের অধীনে গাছের মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। 

পরে ২০১৫/২০১৬ অর্থ বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যায়ে গেস্ট হাউজ, টয়লেট, গেট, টিউবওয়েল স্থাপনসহ বেশকিছু সংষ্কার কাজ করা হয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে এখানে রাখা হয়েছে একজন নৈশ প্রহরী। 

ঢোল সমুদ্র দিঘি
জেলার ইতিহাসের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান ঢোল সমুদ্র দিঘি। এটি পরিচিত মুকুট রাজার দিঘি নামে। ঝিনাইদহ জেলা শহরের পূর্বে বিজয়পুর ছিল রাজা মুকুট রায়ের রাজধানী। আর বাড়িবাথান এলাকায় ছিল রাজার বিরাট গোশালা। এ কারণে লোকজন তাকে বৃন্দাবনের নন্দ মহারাজ বলত।

পানের বরজ

এক সময় রাজার শাসনামলে এই এলাকায় জলকষ্ট দেখা দেয়। খাল, বিল, পুকুর, ডোবা কোথাও পানি ছিল না। ফলে পুকুর খননের প্রয়োজন দেখা দেয়। বাড়ি বাথান এলাকায় রাজা একটি পুকুর খনন করেন। গভীর থেকে গভীরতর করার পরেও পুকুরে পানি ওঠেনি। একদিন রাজা স্বপ্ন দেখলেন তার ছোট স্ত্রী পুকুরে নেমে নাচলে পানি উঠবে। ফলে পরদিন রাজার ছোট স্ত্রী পুকুরে নেমে নাচতে থাকলেন। 

আস্তে আস্তে মাটি ফেটে উঠতে থাকে পানি। এক পর্যায়ে নিচ থেকে রানীর গলা পর্যন্ত পানি ওঠে যাওয়ায় সে রাজাকে ওপরে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য বললেও ঢোলের শব্দে তা শোনা যায়নি। ফলে পুকুরের পানিতে ডুবেই রানীর মৃত্যু হয়। সেই থেকেই পুকুরটি ঢোল সমুদ্র দিঘি নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে দর্শনার্থী আসে দিঘিটি দেখার জন্য। ১৯৩৩ সালে দিঘিটি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। 

মরমী কবি পাগলাকানাই
‘জিন্দা দেহে মুরদা বসন থাকতে কেন পরন, মন তুমি মরার ভাব জাননা’, ‘আমি মরে দেখেছি, মরার বসন পরেছি’, ‘ঘর বেঁধেছে এক কামিল কারিগর’ এমন হাজারো দেহ তত্ত্ব ভিত্তিক গান রচনা করেছেন মরমী কবি পাগলা কানাই। ৯ মার্চ ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে ঝিনাইদহ জেলার মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পাগলা কানাই। 

পরে বেড়বাড়ি গ্রামে বোন সরলার বাড়িতে বেড়াতে এসে সেখানেই থেকে যায়। একবার দুর্গাপূজাতে কালীগঞ্জ উপজেলার নলডাঙ্গা রাজবাড়ী মন্দিরে গান গাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তার গান শোনেনি। কিন্তু পাগলা কানাই মন্দিরের পিছনে বসে মা মা বলে গান গাইছিলেন , এ সময় মন্দিরের প্রতিমা ঘুরে তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে সময় থেকেই সে কোলকাতা ও বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করে দেহ তত্ত্বভিত্তিক গানের কবি হিসাবে। 

পরে বেড়বাড়ি গ্রামেই কবি স্থানীয় এক পাগলীকে বিয়ে করে দেহ তত্ত্বভিত্তিক গানের ওপর ভিত্তি করেই সারা জীবন কাটিয়ে দেন। পরে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বেড়বাড়ি গ্রামেই ইহধাম ত্যাগ করেন। সেখানে কবির মাজার প্রাঙ্গনে রয়েছে পাগলাকানাই স্মৃতি যাদুঘর, তার গানকে চর্চার জন্য রয়েছে পাগলাকানাই সংগীত চর্চা কেন্দ্র। 

প্রতি বছর মরমী কবি পাগলা কানাই এর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে এখানে বিরাট স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভার পাশাপাশি চলে পাগলা কানাই এর গান, বসে মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণিজনদের পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের আগমন ঘটে। সৃষ্টি হয় উৎসব মুখর পরিবেশ। 

গণিত বিদ কেপি বসু
বিজগণিতের ৬ টি সূত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি গণিতবিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে কিপি বসু (কালপিদ বসু)। তার আবিষ্কৃত সূত্রগুলো বর্তমানে ভারতবর্ষে প্রচলিত আছে বলে কথিত রয়েছে। তিনি ঝিনাইদহ জেলার হরিশংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 

প্রথমে তার বাড়িতে ছিল একটি আট চালা টিনের ঘর। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় রাস্তার পাশে আলোয় লেখাপড়া করতেন তিনি। লেখাপড়া শেষে করে ঢাকার তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের গণিতের শিক্ষকতা করতেন। সে সময় চাকরির টাকা দিয়ে গ্রামে নির্মাণ করেন একটি বাড়ি। 

ঢাকায় চাকরিরত অবস্থায় ছুটিতে বেড়াতে এসে থাকতেন হরিশংকরপুর গ্রামের বাড়িতে। থাকার ঘরের পাশাপাশি নির্মাণ করেন একটি বড় মন্দির ঘর। পরে ১৯১৪ সালে তিনি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। পরে তার মৃতদেহ বিভিন্ন সড়ক যোগে কলকাতার নিমতলা শ্মশানের নিয়ে দাহ করা হয়। যে সড়কগুলো দিয়ে কেপি বসুর মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই সড়কগুলোর নামকরণ করা হয় কেপিবসু সড়ক। আজও তার স্মৃতিবহন করে চলেছে হরিশংকরপুর গ্রামের বাড়িটি। 

ঝিনাইদহ জেলার ম্যাপ

সরকারি কেসি কলেজ
জেলার সব থেকে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি কেসি কলেজ। বর্তমানে এখানে ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছেন অনেকে। ঝিনাইদহে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য আব্দুল হাই এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন।

১৯৬০ সালে শিক্ষানুরাগী কেশব চন্দ্র পাল কলেজ প্রতিষ্ঠান জন্য নিজ জমি দান করেন। পরে তার নামানুসারে কলেজের নামকরণ করা হয় কেসি কলেজ। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করণ করা হয়। 

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ
১৯৬৩ সালের ১৮ অক্টোবর ঝিনাইদহে চরমুরারীদহ এলাকায় ১০৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় ক্যাডেট কলেজ। শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকার রাখছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে কেউ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে, নৌবাহিনী, পুলিশ বাহিনী কিংবা সাংস্কৃতিক জগতকেও এগিয়ে নিচ্ছে। 

বাংলাদেশের বর্তমান নৌপুলিশের ডিআইজি শেখ মো. মারুফ হাসান, বিশিষ্ট অভিনেতা তৌকির আহমেদ ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলেন।

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০৭ জন। আয়োতনের দিক থেকে ৩য় অবস্থানে রয়েছে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ।

মোবারকগঞ্জ চিনিকল
দক্ষিণের জেলা ঝিনাইদহের একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান মোবারকগঞ্জ চিনিকল। কালীগঞ্জ শহরের নলডাঙ্গা এলাকায় ১৯৬৫ সালে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিষ্ঠা করা হয় চিনিকলটি। পরের বছর থেকেই মাড়াই কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর মিলটি থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় চিনি উৎপাদিত হয় আর এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জীবিকা জড়িত অগনিত মানুষের।