• মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় কোরাম পূরণে ভুয়া পরীক্ষার্থী

  জে রাসেল, ফরিদপুর

১৫ মে ২০২৩, ১৭:১৩
বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় কোরাম পূরণে ভুয়া পরীক্ষার্থী

ফরিদপুরে বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নিয়োগে দুর্নীতির বারামখানায় পরিণত হয়েছে ফরিদপুর শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (গার্লস স্কুল)। এই প্রতিষ্ঠানে বসে নীরবেই নিয়োগ দুর্নীতির কার্যক্রম চলে আসছে।

যার মূল রহস্যে ডিজি প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত থাকেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা। বিশেষ করে পরিকল্পিতভাবে পূর্ব নির্ধারিত চূড়ান্ত প্রার্থী ও কোরাম পূরণের জন্য তাদের স্বজনদের পরীক্ষার্থী সাজিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

এছাড়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভুয়া পরীক্ষার্থী এবং বাকি আবেদনকারীদের জানানো হয় না পরীক্ষার তারিখ। যার জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নেয়া হয় ফরিদপুরের এই স্বনামধন্য বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

গত ১২ মে শুক্রবার সকাল ১০টায় এই প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় জেলার মধুখালী উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের। এই প্রতিষ্ঠানে বসেই নিরাপদে দুর্নীতির মাধ্যমে ১৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও আয়া পদে প্রার্থী নিয়োগ দেন নিয়োগ কমিটি।

যার প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। যেখানে ডিজি প্রতিনিধি, মধুখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকসহ নিয়োগ কমিটির ৫ সদস্যই উপস্থিত ছিলেন।

পরীক্ষা চলাকালীন অনুসন্ধানে উঠে আসে যার প্রমাণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে কর্মী নিয়োগে নামে মাত্র পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। যে পরীক্ষার কথা অনেক আবেদনকারীই জানে না। তাদের অজান্তে ভুয়া পরীক্ষার্থী ও স্বজনদের নিয়ে কোরাম পূরণ করে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এ খবরে সেখানে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়ে যার সত্যতা।

পরীক্ষা চলাকালীন দেখা যায়, তিনটি পদে ১১জন পরীক্ষার্থী নিয়ে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এরমধ্যে লক্ষ্য করা যায়- আয়া পদে মাত্র তিনজন পরীক্ষা দিচ্ছে, যা পরীক্ষার কোরাম পূরণের শর্ত পূরণের জন্য। এর মধ্যে মাঝে বসে ছিল আন্নিকা আক্তার নামে এক প্রার্থী।

তার আগে-পেছনে বসে পরীক্ষা দিতে দেখা যায়- ঋতু খানম ও খাদিজা আক্তার নামে দুই পরীক্ষার্থীকে। এই দুজনের মধ্যে একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং অপরজন অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, দেখতেও বেশ স্মার্ট। কিন্তু মাঝের প্রার্থী আন্নিকা আক্তার মাত্র এসএসসি পাশ করেই বিয়ে করে বর্তমানে এক সন্তানের জননী।

অভিযোগ আছে- এই আন্নিকা আক্তারকেই ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পূর্বেই নির্ধারণ করে নামেমাত্র এই দুজনকে আবেদন দেখিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হয়। যার সত্যতাও মিলে এই দুজনের আচরণে। তারা বার বার পরীক্ষার হলে আন্নিকাকে সহযোগিতা করতে থাকে। পরে এক পর্যায়ে তাদের সাথে কথাবলাকালীন বিষয়টি স্পষ্ট ফুটে উঠে। অথচ এই পদে পপি নামে এক প্রার্থীকে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে কিন্তু সেই আবেদনকারী জানেই না আজ তার নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

তার পরের সাড়িতে অর্থাৎ মাঝের সাড়ি বসে পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় তিনজনকে। এরমধ্যে প্রথম থেকে দ্বিতীয় সাড়িতে বসেছিল মো. হাসান মোল্যা নামে পূর্ব নির্ধারিত এক ব্যক্তি। যাকে সহযোগিতা করার জন্য দুই পাশেই বসে ছিল নামে মাত্র সাজানো দুই পরীক্ষার্থী। এ পদের বিনিময়ে হাতিয়ে নেন ৫ লক্ষ টাকা।

নিরাপত্তাকর্মী পদে তিন নম্বর সাড়িতে বসে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় তিনজনকে। যার মধ্যে বসেছিল মুজাহিদ নামে এক পরীক্ষার্থী। তার আগে-পেছনে বসে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় আপন দুই ভাইকে। যার মধ্যে প্রথম দিকে বসা কাওছার নামে এক ব্যক্তি পরীক্ষা দেয়, যে মুজাহিদের বড় ভাই। প্রকৃতপক্ষে নামধারী কাওছার মূল আবেদনকারী ছিলেন না, তার প্রকৃত নাম মুস্তাহিদ। তিনি কাউছার সেজে ভুয়া পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেন।

অপর দিকে মুজাহিদের পেছনে বসে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় তার আরেক আপন ভাই মো. শামীম শেখকে। যিনি বর্তমানে শ্রীরাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী পদে কর্মরত। অভিযোগ আছে- এই পদেও জন্যও ৫ লক্ষ টাকা নেয়া হয়।

অপর দিকে এই পরীক্ষায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে পরীক্ষা দিতে আসে ভাঙ্গা উপজেলার আশা এনজিওর লোন অফিসার মুনছুর নামে এক ব্যক্তিকে। যিনি নিজেই বিষয়টি জানান। এনজিওতে তার বেতন ত্রিশ হাজার টাকা। অথচ এই ব্যক্তি কবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে, কবে আবেদন করেছেন কিছুই বলতে পারেনি।

এ দিকে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছুটে আসেন শ্রীরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আরিফুর রহমান। প্রথম দিকে তিনি বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সাংবাদিকদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হোন। এরপর তিনি অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এখানে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ দুর্নীতি হচ্ছে। কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। আমরা সকল শর্ত মেনে পরীক্ষা নিতেছি। তবে পূর্ব নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রহরী পদে মুজাহিদ, পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে হাসান মোল্যা ও আয়া পদে আনিকার কথা অস্বীকার করেন।

যদিও রাতে ফলাফলে বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: ইউনুস আলী মিটুর সাথে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা প্রহরী পদে মুজাহিদ, পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে হাসান মোল্যা ও আয়া পদে আনিকার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এ দিকে পরীক্ষা চলাকালীন সেখানে উপস্থিত থাকা মধুখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, আমি এসব কিছুই জানি না। কোনো অনিয়মের অভিযোগ আমি পাইনি।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড