• রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ 

২৬ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের বৃহত্তম অংশে অরক্ষিত বেড়ীবাঁধ

  শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)

২৯ এপ্রিল ২০২৩, ১১:০৫
২৬ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের বৃহত্তম অংশে অরক্ষিত বেড়ীবাঁধ
অরক্ষিত বেড়ীবাঁধ (ছবি : অধিকার)

আজ ২৯ এপ্রিল! স্বজন হারাদের আঁতকে উঠার দিন। এখনো উপকূলের বাসিন্দারা ডুকরে ডুকরে কাঁদে প্রিয়জনের শোক তুলে। গণহারে কবর হয়েছিল, লাখে লাখে মরেছে মানুষ। মানুষের লাশ আর লাশ ভেসে এসেছে। আজ ৩২ বছর পেরিয়েও চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের স্বজন হারানোর আহাজারি থামেনি।

বাঁশখালী উপকূলের হতভাগারা এখনো বুঝে পায়নি স্বপ্নের টেকসই বেড়ীবাঁধ। নিত্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার উপকূলবাসী থাকে নানা শঙ্কায়। বেড়ীবাঁধ না থাকায় উপকূলের মানুষজন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে হারাচ্ছে মাথা গুঁজে থাকার একমাত্র ভিটেমাটি ও বসতঘর। কারো কারো ভিটে সমুদ্রের অতলে হারিয়ে গেছে বহু আগে।

উপকূলীয় অঞ্চলের স্বপ্নের বেড়ীবাঁধ আজোও স্বপ্নের মতো থেকে গেছে। বেড়ীবাঁধ সংস্কারের কাজ বুঝে পায়নি উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন। বর্ষায় ডুবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইক্লোন, বন্যায় তাদের হারাতে হয় বেঁচে থাকার নানা ফসলি জমি ও লবণের মাঠ। গত বছরের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সমুদ্রের জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে বিভিন্ন ধরণের ফসলি জমি।

উপজেলার নিম্নাঞ্চলে সবজি ক্ষেত ও ধানি জমি পানিতে ডুবে গেছে। এতে ক্ষেত নষ্ট হয়ে কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়ীবাঁধ নির্মাণ করা হলেও স্বপ্নের টেকসই বেড়ীবাঁধ এখনো অধরাই থেকে গেল। বাঁশখালীর প্রায় ২৬ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত এলাকার বৃহত্তম অংশ জুড়ে এখনো অরক্ষিত বেড়ীবাঁধ। বর্ষা আসলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে এখনো ভয়ে নির্ঘুম রাত পোহাতে হয় উপকূলের লোকজনকে।

বিশেষ করে খানখানাবাদ, বাহারছড়া অংশে, সরলে, শীলকূপের জালিয়াখালী জলকদরখাল সংলগ্ন বেড়ীবাঁধ, গন্ডামারা-শীলকূপ হয়ে পশ্চিম চাম্বল জলকদর খাল, বাংলাবাজার হয়ে শেখেরখীল ফাঁড়িরমুখ, ছনুয়াসহ এসব উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো নির্মাণ করা হয়নি পূর্ণাঙ্গ টেকসই বেড়ীবাঁধ। জোয়ারের মাত্রা বেড়ে গেলে, বৃষ্টি-বন্যায় সহসা পানি ডুকে পড়ে এ অঞ্চলের লোকালয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ সংকটের কথা মনে করে তারা আঁতকে উঠে এখনো।

আজ ঐতিহাসিক ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। ভয়াল একটি রাত! এদিন ‘ম্যারি এন’ নামক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় পুরো উপকূলীয় অঞ্চল। লাশের পরে লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল চারদিকে। নদী-নালা, ডোবায়, খাল-বিল, সমুদ্রে ভেসেছিল মানুষের লাশ আর লাশ। গরু, মহিষ, ভেড়ার মরদেহের স্তূপ যেন ভয়াল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই আঘাতের নিদারুণ দৃশ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতোবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ এর আগে আর কখনো সম্মুখীন হয়নি। পরদিন বিশ্ববাসী অবাক হয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বংসলীলা দেখে। কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব বিবেক। নির্বাক হয়ে থাকিয়ে ছিল জাতী। স্বজন হারানোর অস্থিরতায় বোবা কান্নায় ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল সমগ্র দেশের বিবেক।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল ভয়ংকর এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লক্ষ আটত্রিশ হাজার লোক নিহত হয়েছিল এবং চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় আর এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো উপকূল।

স্মরণকালের ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরও বেশি। মারা যায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ।

উপকূলবাসী আজও ভুলতে পারেনি সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি। শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং দেশের উপকূলীয় অঞ্চল মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ।

প্রলয়ঙ্করী এই ধ্বংসযজ্ঞের ৩২ বছর পার হতে চলেছে। এখনো স্বজন হারাদের আর্তনাদ থামেনি। ঘরবাড়ি হারা অনেক মানুষ এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিতে পারেনি। এই ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এখনো বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার লোকজন বেড়ীবাঁধের কাজ পূর্ণাঙ্গ বুঝে পায়নি।

তবে সম্প্রতি শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে উপকূলবাসীর স্বপ্নের বেড়ীবাঁধ, তবে স্বপ্ন স্বপ্নের মতোই অধরাই থেকে গেল। কাজের ধীরগতি, অনুন্নত পাথর ঢালাই, সমুদ্রের তট থেকে কাঁচা বালি নিয়ে নড়বড়ে যৎ সামান্য কাজ হয়েছে বেড়ীবাঁধের। স্থানীয়া জানান, এই বেড়ীবাঁধ যেভাবে হয়েছে তা যেন তাসেরঘর।

অতিবৃষ্টি কিংবা বর্ষার ঢলে, সমুদ্রের জোয়ারের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। এখনো বাঁশখালী উপকুলের প্রেমাশিয়া, খানখানাবাদ, সরল, বাহারছড়া, ইলশা, কদমরসূল, গন্ডামারা-বড়ঘোনা, শেখেরখীলের বেড়ীবাঁধ, চাম্বলের বাংলাবাজার, ছনুয়াসহ সমুদ্র উপকুলের নিম্নাঞ্চলের মানুষ দুর্যোগকালীন সময়ে আতংকে থাকে। এ উপজেলার মানুষ এখনো প্রতি বর্ষায় নির্ঘুম রাত কাটান।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড