• শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজা-জানালাবিহীন মসজিদ

  মো. আকাশ, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

২৮ মার্চ ২০২৩, ১৪:৫৭
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজা-জানালাবিহীন মসজিদ
দরজা-জানালাবিহীন আদমজী জামে মসজিদ (ছবি : অধিকার)

অর্ধশত বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী জামে মসজিদ। যার অন্যতম প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে মসজিদটির কোনো দরজা বা জানালা নেই। সর্বক্ষণ মুসল্লিদের জন্যে খোলা থাকেন এটি। যার কারণে এখানকার বাসিন্দাদের মুখে এই মসজিদটি খোলা মসজিদ নামে বেশি পরিচিত। অনেকেই আবার এই মসজিদটিকে দরজা-জানালাবিহীন মসজিদও বলে থাকেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিকের) ৬নং ওয়ার্ডস্থ আদমজী সোনামিয়া বাজার সংলগ্ন বিহারি ক্যাম্পে ঐতিহ্যবাহী এই জামে মসজিদের অবস্থান।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে আদমজী জুট মিলস্ স্থাপনের সময় তৎকালীন ধনাঢ্য বাইশ পরিবারের অন্যতম গুল মোহাম্মদ আদমজীর শ্রমিক-কর্মকর্তাদের জন্য মিলের অভ্যন্তরে ১৯৫২ সালে নির্মাণ করা হয় এ মসজিদ। প্রায় ২ একর জায়গার উপর অবস্থিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৯০ ফুট ও প্রস্থ ৬৫ ফুট এবং ১২টি সুদর্শন থামের উপর স্থাপিত।

মসজিদের সামনে রয়েছে শানবাঁধানো পুকুর ঘাট। তার পাশেই রয়েছে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আবাসিক বাসা। মসজিদটির পশ্চিম দিক ছাড়া বাকি তিন দিকেই রয়েছে প্রস্থ বারান্দা। ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০ ফুট প্রস্থ তিন পাশের বারান্দার ছাদটি মোট ৭০ টি পিলারের উপর নির্মিত বলে জানা যায়।

মসজিদটির উপরিভাগে রয়েছে ছোট ছোট আটটি গম্বুজ বেষ্টিত একটি বড় গম্বুজ। পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত সুউচ্চ একটি মিনার, যেখানে পূর্বে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় খালি গলায় মুয়াজ্জিনগণ আজান দিয়ে থাকতেন। ব্যস্ত সড়কের পাশের মিনারটি যেন জানান দিচ্ছে এখানে একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদটির কাছে আসতেই চোখে পড়ে চারপাশ জুড়ে সবুজের সমারোহ। চোখ জুড়ানো মসজিদটিতে নামাজ পড়ার বাহিরেও আড্ডা দেন মুসুল্লিরা।

মসজিদের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বর্তমানে এ মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৩ হাজারের অধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

দীর্ঘদিন যাবত এই মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসা এ মসজিদের খতিব হাফেজ মো. সোলায়মান জানান, ১৯৫২ সালের দিকে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন মুসলমান ব্যক্তি মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ছাড়াও যেন আল্লাহর নিকট যে কোনো সময় সিজদাহ দিতে পারে সে ধ্যান-ধারণা থেকেই মসজিদটি এইভাবে নির্মিত হয়েছে।

এ কারণই মসজিদটি অন্যান্য মসজিদ থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টিই হলো এর প্রবেশদ্বার, যা কখনোই বন্ধ হবে না। এই মসজিদ ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। সেজন্য অনেকেই এই মসজিদটিকে খোলা মসজিদ বলে থাকে। যতই গরম পরুক না কেন এই এটিতে সব সময় শীতল পরিবেশ বিরাজমান থাকেও বলে জানান তিনি।

২০০২ সালে ৩০ জুন আদমজী জুট মিল বন্ধ হয়ে গেলে আদমজী উম্মুল ক্বোরা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হাকীম মো. জয়নুল আবেদীন কয়েকজন মুসল্লিকে নিয়ে মসজিদের হাল ধরেন এবং বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় মসজিদের উন্নয়ন কাজ চালিয়ে আসছেন। বর্তমানে তিনি মসজিদটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, আদমজী জুটমিলের নিজস্ব ৩০০ একর জায়গায় এ মসজিদটিসহ প্রায় ১৩টি মসজিদ ছিল।

মসজিদের আশপাশে বসবাসরত মানুষজন জানান, আদমজী জুট মিলের শেষ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা শৈল্পিক নিদর্শনের এ মসজিদ এখনই ঠিকভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে সংস্কারের অভাবে বিলীন হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে প্রাচীন এই ঐতিহ্য।

উক্ত এলাকার বাসিন্দা গণমাধ্যম কর্মী আহসান হাবীব সোহাগের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেছেন, মসজিদের দরজা জানালা বিহীন এমন স্থাপনা এর আগে আমার চোখে পড়েনি। মসজিদের প্রতিটি অংশই কারিগর নিপুণ হাতে সাজিয়েছেন। ভেতর থেকে যেমন বাইরে দেখা যায়, তেমনি বাইরে থেকেও ভেতরে নামাজের দৃশ্য চোখে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজী জুট মিলের কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা শৈল্পিক নিদর্শনের এ মসজিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে সংস্কারের অভাবে বিলীন হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে প্রাচীন এই ঐতিহ্য। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি মসজিদটি সংস্কারে যেন উদ্যোগ নেয়া হয়।

আদমজী উম্মুল ক্বোরা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হাকীম মো. জয়নুল আবেদীন বলেছেন, আমি ২০০২ সাল থেকে মসজিদটির খাদেম হিসেবে কর্মরত রয়েছি। দরজা ও জানালা না থাকায় অন্যান্য মসজিদ থেকে আমাদের ব্যতিক্রম এই মসজিদে ছুটির দিনগুলোতে ও ঈদ, শবেবরাত, শবেকদরে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ নামাজ পড়তে আসেন। পাশে একটি পুকুর থাকায় মসজিদটিতে সবসময় শীতল পরিবেশ বিরাজমান থাকে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মসজিদটিতে প্রায় তিন হাজারের মতো মুসল্লি একত্রে নামাজ পড়তে পারেন। আদমজী জুট মিলস ২৪ ঘণ্টায় তিন শিফটে চালু থাকত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও শ্রমিকরা যে কোনো সময় আল্লাহর ঘরে সিজদাহ করতে চাইলে যাতে মসজিদে আসতে পারেন, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আদমজী জুট মিল কর্তৃপক্ষ মসজিদটি তৈরি করে। বর্তামানে রমজান মাসে সূরা ও খতম তারাবিতে অনেক মুসুল্লির আগমন ঘটে এখানে।

মসজিদের সংস্করণ কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ সংকটের কারণে মসজিদটি সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা জেলা ও সিটি করপোরেশন বরাবর চিটি পাঠিয়েছি। আমাদের মসজিদের পুকুরটিকে আরেকটু সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে। আমরা আশাবাদী তারা সুদৃষ্টিতে তাকালে আমাদের কাজটি সম্পূর্ণ হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড