• সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ফরিদপুর সদরে ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা

  জিল্লুর রহমান রাসেল, ফরিদপুর

১৫ মার্চ ২০২৩, ১৬:০৫
ফরিদপুর সদরে ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা

ফরিদপুর সদর উপজেলার ১১ ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ইউনিয়নের নির্বাচনি পরিস্থিতি। প্রতিদিনই নির্বাচনি এলাকাগুলোতে সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) ফরিদপুর সদরের ১১টি ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীর ভাই, ভাতিজাকে পিটিয়ে কুপিয়ে আহত করা, প্রার্থীর নির্বাচনি বহরে হামলা চালিয়ে মাইক্রোবাস ও মোটর সাইকেল ভাঙচুর, নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর এবং প্রার্থীর এজেন্টদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি ধমকি দেওয়া হয়।

গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত ফরিদপুর সদরের কানাইপুর, কৈজুরি, ডিক্রিরচর, অম্বিকাপুর, নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে এসব ঘটনা ঘটে।

কানাইপুরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম কামাল বলেন, আমিসহ আমার কয়েকজন সমর্থক গত সোমবার দিবাগত রাতে ফরিদপুর থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। রাত আনুমানিক ২টার দিকে ভাটিকানাইপুর এলাকার মাদরাসার পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজনকে নৌকা মার্কার পোস্টার ছিড়তে দেখলে প্রথমে আমার ভাতিজা তুষার খান তাদের জিজ্ঞাসা করে ‘তোমরা আমাদের পোস্টার ছিড়ছো কেন? আমরা তো তোমাদের পোস্টার ছিড়িনা'।

এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে বেলায়েত ফকির, তার ভাই এনায়েত ফকির, ভাই সুজায়েত ফকির সহ প্রায় ২০/২৫ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর হামলা করে। প্রথমেই বেলায়েত ফকির আমার ভাতিজা তুষার খানকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। এরপর তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আমার ভাই মাজহারুল ইসলাম চঞ্চল ও মো. সুমন মিয়াকে জখম করে।

এরপর আহত সবাইকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা সবাই এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আমি নির্বাচন কমিশন বরাবরও অভিযোগ দিব বলে দাবি করেন মো. সাইফুল ইসলাম কামাল।

কানাইপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ফকির বেলায়েত হোসেন বলেন, নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জেনে সাইফুল ইসলাম কামাল তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

অপর দিকে কৈজুরী ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন আহমেদ হামলার শিকার হয়েছেন। গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে কৈজুরী ইউনিয়নের ব্যাঙডোবা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নাজিমউদ্দিন আহমেদ জানান, তাম্বূলখানা এলাকায় প্রচারণা কাজ শেষ করে ঘোড়াদহ এলাকায় যাওয়ার পথে ব্যাঙডোবা ও বেতবাড়িয়া মোড় এলাকায় তিনি মাইক্রোবাস ও মোটর সাইকেলের শোভাযাত্রা নিয়ে পৌঁছালে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ সময় আকস্মিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। কোতোয়ালী থানা শ্রমিক লীগের আহবায়ক মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামানের নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা তার দুটি মাইক্রোবাস ও কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এ সময় তার ১০জন কর্মী আহত হন এবং তিনি নিজেও আঘাত পান। পরে তারা ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

তবে ফরিদপুর কোতোয়ালী থানা শ্রমিক লীগের আহবায়ক মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামান বলেন, নাজিমউদ্দিন আহমেদ যে অভিযোগ করেছে তার সাথে তিনি জড়িত নন।

এ দিকে সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডিক্রিরচর ইউনিয়নে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী (মোটর সাইকেল) মেহেদী হাসান মিন্টুর নির্বাচনী অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আবু ফকির ও তার সমর্থকরা এসব ঘটনা ঘটেছে। মেহেদী হাসান মিন্টু অভিযোগ করেন, মুন্সীডাঙ্গী, ধলারমোড় ও কালু ফকিরেরডাঙ্গী এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আবু ফকির ও তার সমর্থকরা তার নির্বাচনি ক্যাম্পগুলো ভাঙচুর করেছে। তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার সমর্থক ও কর্মীদের ধাওয়া করেছে।

অম্বিকাপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. নূরুল আলম গতকাল মঙ্গলবার (১৪ মার্চ) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাকে ও তার কর্মী সমর্থকদের প্রচারণাকালে বাধা দেয়া হচ্ছে। চারটি কেন্দ্রে আমার কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেয়ে হুমকি দেয়া হচ্ছে। প্রচারণায় বের হলেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভাড়াটে লোকেরা মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে আমাকে ঘিরে থাকছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে নির্বাচনের পরিবেশ ব্যাহত করতে চাইছে।

চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মির্জা সাইফুল ইসলাম আজম বলেন, সোমবার রাতে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে ফেরার পথে ছাত্রলীগের ছেলেরা তার কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্য করে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। একজন এস আই এবং পুলিশের সামনেই এ ঘটনা ঘটে। তারা পায়ে পাড়া দিয়ে গোল্ডগোল বাধাতে চেয়েছিলো। আমরা ধৈর্য ধারণ করে সেখান থেকে চলে আসি।

ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুজ্জামান চৌধুরী পঙ্কজ জানান, তিনি ভোট চাইতে ভোটারদের বাড়িতে যেতে পারছেন না। কারো বাড়ি গেলেই তাকে ঘিরে ফেলা হচ্ছে। তিনি জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকেও জানিয়েছেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মোটর সাইকেল বহর নিয়ে আমার বাড়ি ঘিরে রেখে মহড়া দেয়ার প্রমাণও পেয়েছে।

নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মোস্তারুজ্জামান মোস্তাক বলেন, আমার ইউনিয়নে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পেশীশক্তির প্রদর্শন করা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনর জন্য এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন।

মাচ্চর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহিদ মুন্সী অভিযোগ করেন, বেশকিছু মোটরসাইকেল নিয়ে হেলমেট লাগিয়ে মাচ্চর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শোডাউন করে নৌকার সমর্থকরা। সোমবার রাত ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চলে এ মহড়া। তারা ভোটারদের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হুমকি দেয় ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

ফরিদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, সদরের ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফরিদপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বেশকিছু অভিযোগ স্ব স্ব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে। এগুলো তদন্ত করে দেখার জন্য ফরিদপুর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সুমন রঞ্জন সরকার বলেন, প্রতিটি অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশের নতুন চারটি টহল দল গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছে।

তিনি বলেছেন, নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে যেসব অভিযোগ এসেছে দ্রুততার সাথে সেগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১৬ মার্চ সোমবার ইভিএমে ফরিদপুর সদরের ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইভিএম পদ্ধতিতে এ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে। ২ লাখ ৩৩ হাজার ভোটার রয়েছেন এসব ইউনিয়নে। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৬৯ জন, সাধারণ সদস্য পদে ৩৫৮ জন ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ১১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড