• রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯  |   ১৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হুমকির মুখে শত শত একর জমিতে আবাদ করা শস্য

বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা

  জে রাসেল, ফরিদপুর

২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:২৯
হুমকির মুখে শত শত একর জমিতে আবাদ করা শস্য

মাটি খেকোদের হিংস্র থাবায় প্রায় শত একর জমিতে ধান রোপণ ও শস্য আবাদে হুমকির মুখে পড়েছে। এতে ক্ষোভে ফুসে উঠেছে ফরিদপুর সদরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের নরসিংহদিয়া গ্রামের কৃষকেরা। ঐ গ্রামের ফসলি মাঠে মৃত জয়নাল খানের স্ত্রী ফাতেমা বেগমের ধানের জমি থেকে ভেকু বসিয়ে মাটি কেটে পুকুর খননের চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফসলি জমি রক্ষার দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে কৃষকেরা।

একই সাথে সদ্য আবাদকৃত ফসলের ক্ষেত নষ্ট করে ড্রাম ট্রাকে নেয়া হচ্ছে মাটি। এতে মাটির নিচে থাকা বিএডিসি সেচ প্রকল্পের ডিপ টিউবওয়েলের পাইপ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। এছাড়া এই মাটি খেকোদের হিংস্র থাবায় বিগত কয়েকবছর আগে একটি পুকুর খনন করায় বিএডিসি সেচ প্রকল্পের পাইপ মাটির নিচ থেকে বের হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মাটি খেকোদের এমন আচরণে যে কোনো সময় সেচ প্রকল্পের পাইপ নষ্ট হয়ে বা ভেঙে যাওয়ার ফলে ধানসহ শস্য ক্ষেতে পানি সেচে বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে বলে স্থানীয় কৃষকদের ধারনা। তারা অতিদ্রুত এই ফসলি মাঠ থেকে মাটি খেকোদের হাত থেকে মাটি খনন বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ফাতেমা বেগমের ধানের জমি থেকে ভেকু বসিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাত্র ৩৪০ টাকা ট্রাক প্রতি মাটি কিনে নিয়েছেন মাধবপুর গ্রামের মফিজুদ্দীন মালের পুত্র বাশার মাল। তার মাধ্যমে কামাল হোসেন সত্ত্বাধিকারী কানাইপুর অটো ব্রিকসে যাচ্ছে মাটি। এসব মাটি নেয়া হচ্ছে অন্যের ফসলি জমির উপর দিয়ে। স্থানীয় কৃষকেরা বাঁধা দিলে তাদের চাঁদাবাজির মামলা, হুমকি-ধমকি ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছে এই মাটি খেকো চক্রের সদস্যরা। তারা প্রভাবশালী বলে ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয় একাধিক কৃষক জানিয়েছেন।

এ সময় কয়েক কৃষক এ প্রতিবেদককে বলেন, ফাতেমা বেগমের জমি থেকে মাটি আনতে গেলে অনেক জমির ফসল নষ্ট হবে। উক্ত জমি থেকে ট্রাকে মাটি আনতে গেলে বিএডিসি’র নির্মিত গভীর নলকূপ লাইনের পাইপ অকোজে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যার ফলে, অত্র এলাকার কৃষকেরা পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারবে না।

ইলিয়াজ কবিরাজ নামে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, আশেপাশের ৪/৫ গ্রামের মানুষ মাঠটিতে ধান রোপণসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করে থাকে। যেমন- সরিষা, পেয়াজ, বোরো ধান, আমন ধান সহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। এখানে পুকুর খনন হলে সমস্ত ফসলি জমির সেচের পানি পুকুরে এসে জমা হবে। যার ফলে, বোরো ধান রোপণে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এসব বাঁধা দিতে গেলে আমার নামে দুই লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি মামলা দেয়া হয়।

আজাদ ব্যাপারী নামে অপর কৃষক বলেন, এখানে পুকুর খনন হলে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবো, যেটা কল্পনা করা যাবে না। ডিপ টিউবওয়েলও বন্ধ হয়ে যাবে। এই মাটি কাটা নিয়ে আমরা আজ তিনটি বছর যাবৎ হয়রানির শিকার হচ্ছি। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ জানাই, এই মাটি যেন ওরা না কাটতে পারে।

মিলন খান নামে এক কৃষক বলেন, আমার জমির উপর দিয়ে জোড়পূর্বকভাবে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ট্রাকে করে মাটি নেয়া হচ্ছে। এতে আমার সরিষার ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। আমি বাঁধা দিলে আমাকে মারতে আসে।

অপর এক কৃষক বলেন, এই ডিপ টিউবওয়েলের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ কৃষক না খেয়ে মারা যাবে। আমাদের দাবি, সরকার আমাদের ডিপ মেশিনটি অনুদান দিয়েছে, এটা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং আমরা যেন খেয়ে বাঁচতে পারি।

রুপালী মালো নামে এক কৃষাণী বলেন, ফাতেমা বেগমের পাশে জমিটি আমার। তারা পুকুর কাটলে আমার অনেক ক্ষতি হবে। আমার এতটুকুই জমি, ভেঙে গেলে আর কিছুই থাকবে না। ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।

নরসিংহদিয়া গ্রামের এই ফসলি মাঠের বিএডিসির সেচ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা আব্দুর রশিদ বলেন, এই ডিপ টিউবওয়েলের পাইপ আন্ডার গ্রাউন্ডে রয়েছে। এই মাঠের উপরই আমাদের হাজার হাজার কৃষকের রুটি-রুজির ব্যবস্থা। আমরা তাদের বলেছি, এখানে সরকারি স্কিম রয়েছে। আপনারা মাটি কেটে পাইপ নষ্ট করবেন না। এই একই মালিক পাশের আরেকটি জমি থেকে মাটি কেটে পুকুর করায় পাইপগুলো বের হয়ে গেছে। কয়েকবার পাইপ ফেটে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আমরা ডিসি অফিস, ভূমি অফিস ও ইউএনও অফিসে দরখাস্ত দিয়েছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাতে চাই এবং তার হস্তক্ষেপ চাই, এই ফসলের মাঠ থেকে যেন কোনো মাটি কাটা না হয়।

এ বিষয়ে জমির মালিক ফাতেমা বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি বৃদ্ধ মানুষ, ধানের চাষ না করতে পেরে মাছ চাষের জন্য পুকুর খনন করতে চেয়েছিলাম। যাতে মাছ চাষ করে বাড়ি বসে খেতে পারি।

বাশার মাল বলেন, আমরা পাশের জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ হাজার টাকা করে অগ্রিম দিয়েছি এবং তারা ট্রাক চলাচলে অনুমতিও দিয়েছে। কারো ক্ষতি করি নেই।

এছাড়া কানাইপুর অটো ব্রিকসের সত্ত্বাধিকারী কামাল হোসেন বলেন, এখান থেকে মাটি কাটার বিষয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমতি রয়েছে। এসিল্যান্ডও তদন্ত করে গিয়েছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা অনুমতি এনেছি। বিএডিসির সেচের পাইপের কোনো ক্ষতি হলে আমরা ঠিক করে দেবো।

এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জিয়াউর রহমান বলেন, ভাটায় মাটি কাটে যারা, তারা অনেক কৌশল অবলম্বন করে থাকে। আমার জানা মতে- তাদের কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি, এমনকি তদন্তেও যাওয়া হয়নি। তারপর বিষয়টি নিয়ে আমি আগামীকাল খোঁজখবর নেব।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিটন ঢালী বলেন, ঐ জমি থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেয়া হলেও সেটা যদি জনস্বার্থ বিরোধী হয় বা জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষে অনুমতি বাতিল করা হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড