• রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯  |   ১৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নারায়ণগঞ্জে বিআরটিএ’র টেবিলে টেবিলে রমরমা ‘ঘুষ বাণিজ্য’!

কার্যালয়ের কোথাও নেই সিসি ক্যামেরা

  তুষার আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

১৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৩
নারায়ণগঞ্জে বিআরটিএ’র টেবিলে টেবিলে রমরমা ‘ঘুষ বাণিজ্য’!

ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স করবেন চাষাঢ়ার মিজানুর রহমান। নন প্রফেশনাল লাইসেন্সের সরকারি ফি চার হাজার ১৫২ টাকা। তবে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে এসে ১২ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে তাকে।

অপর দিকে গত পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়ন করতে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া থেকে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ এসেছেন রাসেল। পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের জন্য সরকারি ফি সর্বমোট দুই হাজার ৪২৭ টাকা হলেও রাসেলকে গুনতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা! গত রবিবার সকাল ১০টার দিকে বিআরটিএ কার্যালয়ে আসলেও বিকাল ৪টা পর্যন্ত ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার সৌভাগ্য হয়নি তার। ২ বছর আগে লাইসেন্স নবায়ন করতে দেয়া বাবুলের সাথেও ঘটেছে একই ঘটনা। লাইসেন্স নবায়ন করতে ছয় হাজার দিয়েও এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিআরটিএ কার্যালয়ে।

নারায়ণগঞ্জের বিআরটিএ’র কার্যালয়ে গ্রাহক সেজে সপ্তাহ ব্যাপী অনুসন্ধান চালিয়ে এমন মিজান, রাসেল ও বাবুলদের মতো ভুক্তভোগীর সংখ্যা পাওয়া গেছে শতাধিক। যাদের প্রত্যেকেই লাইসেন্স নামক ‘সোনার হরিণ’ এর জন্য প্রদান করেছেন নির্ধারিত অংকের কয়েকগুণ বেশি অর্থ। এরপরও এই টেবিল ওই টেবিল দৌড়ে দিন পাড়ি দিলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না মেলার অভিযোগ শোনা যায় সকলের মুখেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো কার্যালয়ের কোথাও কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। ঘুষ আদায়ে নেই কোন বাধা বিপত্তি-ও। তাই কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই প্রকাশ্যে ঘুষ আদায় করছেন কার্যালয়ের স্থায়ী-অস্থায়ী সদস্যরা।

গত কয়েক দিনের অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন দালাল ও স্থায়ী-অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করা গেছে। যারা গ্রাহকদের কাজ দ্রুত হাসিল করে দেয়ার কথা বলে অবৈধ টাকায় নিজেদের পকেট ভরছেন। এর মধ্যে কার্যালয়ের অন্যতম আলোচিত বা পরিচিত নাম মিজান, রাজু ও সুমন। তারা বিআরটিএর স্থায়ী সদস্য নন। বিএমটিএ ও সিএনএস নামক দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের নিয়োগ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ’তে। প্রত্যেকেই পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ’তে রয়েছেন।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইসেন্স কিংবা গাড়ির কাগজপত্র সংক্রান্ত যত গ্রাহক আসছেন, তাদের সিংহভাগ মানুষের মুখেই শোনা যায় মিজান, রাজু ও সুমনের নাম। কেননা, তাদের সাথে বেশি টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন গ্রাহকরা। আর বহিরাগত দালালদের মধ্যে রয়েছে করিম, পলাশ, শফিকুলসহ আরও বেশ কয়েকজন। বহিরাগত বলা হলেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই দালালদের দেখা মিলে কার্যালয়ের ভিতরের অফিস কক্ষগুলোতে।

অনুসন্ধানকালে দালাল করিম, পলাশ ও শফিকুলের কাছে পরিচয় গোপন রেখে মোটর সাইকেলের লাইসেন্স করার বিষয়ে পৃথক ভাবে আলাপ কালে তারা লাইসেন্স করে দেয়ার জন্য ১২ হাজার টাকা দাবি করেন। এক পর্যায়ে বলেন, ব্যাংক জমা কম হলেও বিআরটিএ’র স্যারদের টেবিলে টেবিলে টাকা দিতে হয়। পরীক্ষাসহ অনেক ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপেই স্যারদের টাকা দিতে হয়।

তথ্য মতে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও ১ হাজার ৬শ’টি পুরনো লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে বিআরটিএ নারায়ণগঞ্জ সার্কেল অফিসে। এর একটিও সরকারের নির্ধারিত ফি-এর মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে কিনা- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ দিকে দালালে টইটুম্বুর নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয় দুর্নীতির আখড়ায় রূপ নিলেও প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী শামসুল কবীর বলছেন, দালালরা গ্রাহক সেজে কার্যালয়ে অবস্থান নেয়ায় তিনি তাদের ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন না।

শামসুল কবীর যখন একথা বলছেন, তখন তার কার্যালয়ে বেশকিছু ফাইল নিয়ে প্রবেশ করেন কথিত পিয়ন রাজু দালাল। তবে কার্যালয়ের বড় কর্তার কক্ষে সাংবাদিক রয়েছে- এমনটা বুঝতে পেরেই তড়িঘড়ি করে ফাইল সাথে নিয়েই কক্ষ ত্যাগ করেন রাজু।

রাজু ও মিজানসহ অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়াদের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে সহকারী পরিচালক শামসুল কবীর বলেন, এটা সত্যি যে, তারা বিভিন্ন গ্রাহকদের কাছ থেকে অধিক অর্থের বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করে থাকে। এটা আপনিও জানেন, আমিও জানি। তবে আমার কক্ষে বসে বা আমার সামনে তো এগুলো করে না। তাদের বিরুদ্ধে আমার কাছে কোন লিখিত অভিযোগও আসেনি। তাই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ দিতে পারি না।

শামসুল কবীর বলেন, আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। তাই ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে দুজন হেল্পিং হ্যান্ডস্ রাখা হয়েছে। তাদের কাজ চা আনা টেবিল পরিষ্কার করা। তবে লোকবল সংকটের কারণে তারা বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে থাকে।

এক প্রশ্নের জবাবে শামসুল কবীর অকপটে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে বলেন, যেহেতু আমি এখানকার কর্মকর্তা, সেহেতু এখানকার সকল অনিয়মের দ্বায় আমার ঘারেই বর্তায়। আপনি আমার বিরুদ্ধে লিখেন, যে আমি ব্যর্থ!

গতকাল কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় অভিযুক্ত মিজান, কথিত পিয়ন রাজু ও মোটরযান পরিদর্শক সাইফুল ইসলামের কক্ষে বসা কম্পিউটার অপারেটর সুমনের সাথে। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের একাধিক তথ্য প্রমাণ থাকলেও তারা তা অস্বীকার করেন।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড