• বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

sonargao

বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে নদী খনন প্রকল্পের বালু

অনাবাদী হচ্ছে ফসলি জমি, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ

  সোহেল রানা, সিরাজগঞ্জ

০৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬:২৮
বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে নদী খনন প্রকল্পের বালু

গাইবান্ধা থেকে বগুড়া হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ মৃত প্রায় বাঙ্গালী, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগর এ ৪টি নদ-নদী দীর্ঘদিন খননের অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিল প্রায়। এসব নদী পানি শূন্য হয়ে পড়ায় এক দিকে যেমন ব্যাহত হতো নৌ-চলাচল, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজের মিলতো না কাঙ্ক্ষিত পানি। সংকট ছিল মাছেরও। তাই মৃতপ্রায় এসব নদ-নদীগুলো নাব্যতা ফেরাতে বর্তমান সরকার গাইবান্ধা, বগুড়া হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ২১৭ কিলোমিটার নদীখনন প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

এ প্রকল্পের আওতায় নদীতীর সংরক্ষণ ও সবুজায়নও করার কথা রয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় ৩ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আরও দুই বছর সময় বর্ধিত করা হয়েছে। এই প্রকল্পের উত্তোলিত বালু নদীর তীরবর্তী আবাদি জমিগুলোতে স্তূপ রাখা হয়েছে।

এ বালু নদীতীর সংরক্ষণ কাজের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও তা দেদারছে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলাকার প্রভাবশালীরা। আর বালি পরিবহনে ভারী যানবাহন ব্যবহার করায় গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট ক্ষতির পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

এছাড়াও নদীতীরের কৃষি জমিতে বালু মজুত করে রাখায় অনাবাদী হয়ে পড়ছে এসব আবাদি জমি। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও সুরাহা মেলেনি বলে জানান ভুক্তভোগীরা। আর প্রশাসন বলছে উত্তোলিত বালু দ্রুত নিলামে বিক্রি করে সরকারের কোষাগারে অর্থ জমা দেয়া হবে। সম্প্রতি সরজমিন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

রায়গঞ্জের সাহেবগঞ্জ এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী নুর নবীউল আহসান রুমি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাদল এন্টার প্রাইজ আমার ৪ বিঘা জায়গায় মাটি স্তূপ করে রেখে গত ৩ বছর বিক্রি করেছে। জায়গার ভাড়া বাবদ আমি কিছু বালু তাদের কাছ রেখে দিয়েছি।

প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাদল এন্টার প্রাইজের কাউকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড সাসেক প্রকল্পের আওতায় মহাসড়ক নির্মাণ করছে। এ প্রকল্পের সিনিয়র সুপারভাইজার আল আমিন বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএনবি ড্রেজিং প্রজেক্ট রায়গঞ্জের ঘুড়কা এলাকায় নদী খননের বালু স্তূপ করে রেখেছে। আমরা সেখান থেকে বালু কিনে মহাসড়ক নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছি।

রায়গঞ্জ উপজেলার সীমানা থেকে জয়েনপুর পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকায় নদী খনন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএনবি ড্রেজিং প্রজেক্ট। এ প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. রাশেদ বলেন, নদী খননের বালু মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছি। এটা বিক্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে তার অফিসে দেখা করার কথা বলে মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

রায়গঞ্জের নলকা ইউপির ৯ ওয়ার্ডের সদস্য ইউসুফ আলী বলেন, গত দুই থেকে আড়াই বছর যাবত গ্রামীণ রাস্তায় অবৈধভাবে ১০ চাকার ড্রাম ট্রাক দিয়ে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। এ কারণে ফুলজোড় কলেজ থেকে বকুলতলা পর্যন্ত আঞ্চলিক পাকা রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা। আর বালু পরিবহনের কারণে ধুলাবালিতে এলাকার পরিবেশও দুষিত হচ্ছে।

কায়েমপুর গ্রামের কৃষক আবু হানিফ বলেন, নদী খননের বালু আবাদি জমিতে স্তূপ করে রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কারণে জমিগুলো বর্তমানে অনাবাদী হয়ে পড়েছে, গুনগতমান ক্ষতি হওয়ায় ভবিষ্যতেও এসব জমিতে আর ফসল হবে না।

রায়গঞ্জ উপজেলার চরতেলিজানা গ্রামের কৃষক মহসিন কবির লিটন মোল্লা জানান, আমার জমি জোরপূর্বক লিজ নিয়ে ঠিকাদার মাটি স্তূপ করে রেখেছে। বালু পরিবহনের কারণে অভ্যন্তরীণ রাস্তা নষ্ট হওয়ায় বাড়িতে যাওয়া আশা কষ্ট হয়। নদীতীর কাটার কারণে অন্য আবাদি জমিগুলোও ভাঙ্গনের হুমকিতে রয়েছে। এসব বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনে অভিযোগ করা হলেও কোন লাভ হয়নি।

চান্দাইকোনা ইউপির শিলন্দা গ্রামের আমির হোসেন বলেন, নদী থেকে উত্তোলিত বালু মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বিনামূল্যে ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল, অথচ দেদারছে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। বালু পরিবহনের কারণে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নদীখনন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার, দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীরা এ কাজে জড়িত। অথচ প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার ভান করছে।

একই এলাকার আলফার উদ্দিন টরিক বলেন, আমরা নদীখননের বিরোধী নয়, তবে এসব বালু পরিবহনের কারণে এলাকার রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব নষ্ট রাস্তা মেরামত করা। অন্যথায় জনগণকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে।

কামারখন্দের আলোকদিয়া গ্রামের জহুরুল ইসলাম বলেন, খনন কাজে নিয়োজিত বাদল এন্টার প্রাইজের ঠিকাদারকে টাকা দিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে নলকা এলাকায় নিজের জমিতে রেখে বিক্রি করছি।

একই এলাকার লুৎফর রহমান বলেন, বাদল এন্টার প্রাইজের ঠিকাদার নদী থেকে উত্তোলিত বালু নলকা এলাকায় আবাদি জমিতে স্তূপ করে রেখেছে। আমি সেখান থেকে বালু কিনে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছি।

সিরাজগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোবারক হোসেন বলেন, প্রশাসনের অজান্তে নদী থেকে উত্তোলিত বালু বিক্রি করা হচ্ছে। এসব বন্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হচ্ছে। তবুও বালু বিক্রি বন্ধ না হওয়ায় উত্তোলিত বালু প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করে সরকারের কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে সদ্য যোগদানকৃত সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী মাহবুবুর রহমান বলেন, রায়গঞ্জ, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর উপজেলার ২৮টি স্থানে স্তূপ করে রাখা বালু চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বালু নিলামে বিক্রির জন্য টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। দরপত্র বিক্রি চলছে, আগামী ১৭ জানুয়ারি দরপত্র দাখিল হবে।

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকল্পের সিরাজগঞ্জ অংশের ৮৫ কিলোমিটার এলাকায় ৬৫ ভাগ নদী খনন হয়েছে। ১২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীতে পানি প্রবাহের পাশাপাশি মৎস্য চাষ ও কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড