• বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ব্যর্থ অপারেশনে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রোগী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হুমকি

  জে রাসেল, ফরিদপুর

১৬ নভেম্বর ২০২২, ১১:২৫
ব্যর্থ অপারেশনে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রোগী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হুমকি
সততা প্রাইভেট হাসপাতাল (ছবি : অধিকার)

ফরিদপুরে সততা প্রাইভেট হাসপাতালের অসততা আর প্রতারণায় ব্যর্থ অপারেশনে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে রোগী। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে এক চিকিৎসকের কথা বলে অন্য চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করার এবং অপারেশনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের অভিযোগ করায় রোগী ও তার স্বজনদের দেখে নেয়ারও হুমকি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি সংবাদ প্রকাশ হলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি টাকার মানহানি মামলারও হুমকি দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এলাকায় অবস্থিত সততা প্রাইভেট হাসপাতাল এন্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগে হাসপাতালটিতে অভিযানও পরিচালনা করেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

রোগী ও রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রবিবার (১৩ নভেম্বর) হাসপাতালটিতে ভেঙে যাওয়া হাতে লাগানো ৬টি নাট খুলতে চিকিৎসার জন্য আসেন জেলার সালথা উপজেলার কাগদী গ্রামের লাভুল মোল্লা (৫৫)। এ সময় তিনি হাসপাতালটির অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. মো. মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক জানায় অপারেশন করতে হবে। এরপর হাসপাতালটির স্টাফ রোমানের সাথে ১৭ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয় এবং জানায় রাত ১০ টায় ডা. মিজানুর রহমানের মাধ্যমে অপারেশন করা হবে। কিন্তু ঐদিন রাত ৯টায় তাকে ওটিতে নেয়া হয়।

এরপর তার হাতের অপারেশন কার্যক্রম শুরু করেন অন্য একজন চিকিৎসক। এক পর্যায়ে এই চিকিৎসক হাতের ছয়টি নাটের মধ্যে দুটি খুলতে সক্ষম হয় এবং বাকি চারটি নাট খুলতে ব্যর্থ হয়ে সেলাই করে বেডে পাঠিয়ে দেন।

জানা যায়, লাভলু মোল্লার হাতের অপারেশন করান রানা পারভেজ নামে একজন চিকিৎসক। এই চিকিৎসককে ফরিদপুর মেডিকেল হাসপাতালের চিকিৎসক বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা স্টাফরা পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু তিনি সনদধারী চিকিৎসক হলেও ফরিদপুরে বা কোথাও নির্দিষ্ট কর্মস্থল নেই।

সোমবার (১৪ নভেম্বর) সকালে ঐ হাসপাতালে ভর্তিরত ভুক্তভোগী রোগী লাভলু মোল্লা এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রায় ৭ বছর আগে আমার বাম হাত ভেঙে যায়। হাড় জোড়া লাগাতে পাত ও নাট ব্যবহার করা হয়। এর দেড় বছর পর অপারেশন করে নাট খুলে ফেলার নিয়ম থাকলেও আমি অর্থের অভাবে তা পারিনি। অনেক কষ্টে টাকা পয়সা গুছিয়ে এই হাসপাতালে আসি এবং ৭ বছর আগে ভেঙে যাওয়ার কথাও বলি। তারা নাটগুলো খুলে দিতে পারবে বলে আশ্বাস দেয়। এরপর এক ডাক্তারকে দেখিয়ে রাতে অন্য ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করায়। কিন্তু তারা পারেনি। তারা পারবেনা আগেই বলতো, আমার ক্ষতি করলো কেন?

এ বিষয়ে কথা হয় অপারেশনে ব্যর্থ হওয়া ডাঃ রানা পারভেজের সাথে। তিনি কর্তৃপক্ষের সামনেই এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাকে মেসেজের মাধ্যমে স্টাফ রোমান জানায় একটি অপারেশন আছে, ডাক্তার দেখেছে এবং এক্সরে রিপোর্ট মেসেঞ্জারে পাঠায়। এরপর আমি রাতে এসে অপারেশন করি এবং নাটগুলো দীর্ঘদিন হাতের ভেতর থাকায় খুলতে ব্যর্থ হই।

তিনি আরও বলেন, হয়তো ডা. মিজানুর রহমানের যে চার্জ সেটা তারা দেয়নি। এ জন্য কম টাকায় আমাকে দিয়ে অপারেশন করানো হয়। (গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত)।

সাংবাদিকেরা হাসপাতালে এসেছে এমন খবরে ছুটে আসেন হাসপাতালের মালিক বা কর্তৃপক্ষ আফসার হোসেন। এসেই তিনি রেগে, ক্ষোভে ফুসে উঠেন। এরপর তিনি জানতে চান সাংবাদিকেরা ফরিদপুর শহরের স্থানীয় বাসিন্দা কি-না এবং রোগীর বাড়ি কোথায় জানতে চায়। এরপরই তিনি পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর ছিলেন পরিচয় দিয়ে সাংবাদিক এবং রোগীকে উদ্দেশ্যে করে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, রোগীকে যখন বাঘে ধরবে তখন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এদেশে বাঘে অনেককেই ধরতে পারে। বাঘ থাকে জঙ্গলে, বাঘ যেকোনো সুযোগ-সুবিধা মতো থাবা মারে। একটি হাসপাতাল দিতে অনেক টাকা পয়সা লাগে, এমনেই হয় না। মশা মারতে কামান দাগানো হয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের উপর দিয়ে। এগুলো আমি মেনে নেবো না। হাসপাতালের কি ত্রুটি আছে সেটা আপনারা দেখেন। হাসপাতালের ত্রুটি না পেলে আমিও ছাড়বো না। এতো টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠান দিয়েছি মশা মারতে কামান দাগানোর জন্য না।

হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, কাউকেই আমি ছাড়বো না, ওরেও (রোগী) আমি ছাড়বো না। ওর (রোগী) বাড়ি বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে হোক না কেন। আমার হাসপাতালে হ্যান হচ্ছে, ত্যান হচ্ছে। এটা কি কাজ, এটা বাংলাদেশ। আমি এখানে মার্ডার করলেও মিট করে দেয়া সম্ভব। সব জায়গায় আইন দেখানো যায় না। তাইলে দেশ এরকম হতো না, সমাবেশের নামে গাড়ি বন্ধ হতো না। এদেশে অনেক কিছুই হয়, নিরপরাধ মানুষের ফাঁসি হয়ে যাচ্ছে। আবার একজন অপরাধ করেও বেঁচে যাচ্ছে। আমার মান সম্মানের হানি হলে আমি এখনই পাঁচ কোটি টাকার মানহানি মামলা করতে পারি।

ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি আরও বলেন, ওর (রোগীর) একটা টাকা এখনো নেয়া হয়নি, ও (রোগী) এখনও আমার হাসপাতালে ভর্তি। এরপরও সাংবাদিক নিয়ে আসবে, এদেশটা কি মঘের মুল্লুক নাকি। ও ৭ বছর পর আমার এখানে এসে আমার উপর নির্যাতন করবে, ও (রোগী) কিরা এদেশের? (গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত)।

এসব বিষয়ে ফরিদপুর সিভিল সার্জন ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম, ভুক্তভোগীরা কেউ অভিযোগ দেয়নি। এ বিষয়ে রোগী বা রোগীর স্বজনেরা লিখিত অভিযোগ দিলে আমি ব্যবস্থা নেব।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড