• মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

চোরাই কিংবা ছিনতাইকৃত স্বর্ণ, বারবার নাম জড়ালেও দোকান মালিক বহাল তবিয়তে

  এস. এম. মিজানুর রহমান মজনু, ভালুকা, ময়মনসিংহ

২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:১৭
দি আপন জুয়েলার্স

লক্ষ্মীপুর জেলা সদরে ছিনতাইকৃত স্বর্ণ ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রভাবশালীর মাধ্যমে দেন-দরবার শেষে দি আপন জুয়েলার্স নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হলেও দোকান মালিক বহাল তবিয়তে। তবে এ ঘটনায় রহস্যজনক কারণে কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি।

চোরাই স্বর্ণ উদ্ধার হওয়ার পর বেশ কয়েক মাস আগে মডার্ন জুয়েলার্সের মালিক রতন কৃষ্ণ কর্মকার পুলিশের হাতে ধরা পরে প্রায় এক মাস হাজতবাস করে জামিনে বেরিয়ে আসে। একাধিকবার অপরাধী হিসেবে ধরা পরেও রহস্যজনকভাবে বারবার পাড় পেয়ে যাচ্ছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রতন কৃষ্ণ ও শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকারেরা।

সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৫-২৬ বছর আগে টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার মগড়া গ্রামের মৃত যশোদা কর্মকারের ছেলে অরুণ কৃষ্ণ কর্মকার, রতন কৃষ্ণ কর্মকার ও শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকার ভালুকা উপজেলায় আসে প্রায় শূন্য হাতে।

এরপর ওই ২৫-২৬ বছরে শহীদ নাজিম উদ্দিন সড়কের দক্ষিণ পাশে সরকার টাওয়ারে লিপি জুয়েলার্স, মাডর্ণ জুয়েলার্স ও দি আপন জুয়েলার্স এই নামে তিনটি বিশাল আকারের স্বর্ণের দোকান গড়ে তুলেছেন তারা। তাদের তিন ভাইয়ের দোকানে বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে।

এছাড়াও সম্প্রতি তারা ভালুকা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে টিনসেট বাড়িসহ ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। এমনকি ২ নম্বর ওয়ার্ডে তিন শতাংশ জমির ওপর ৩ তলা বাড়ি। আর ৩ তলা বাড়ির পেছনে ৫ শতাংশ জমির ওপর ৬ তলা বাড়ি নিমার্ণ করেন ওই জুয়েলার্স ব্যবসায়ীরা। দু’টি বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্য জমিসহ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

পুলিশ জানায়, গত ১৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর জেলা সদরে জনৈক চম্প কর্মকার মোটরসাইকেল যোগে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলসহ সাড়ে ৯ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই হয়। এ ঘটনায় লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় মামলা হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত ছিনতাই মামলার আসামি পারভেজ ও সিফাতের শিকারোক্তিতে পুলিশ জানতে পারে স্বর্ণগুলো ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১২টার দিকে ভালুকা মডেল থানার (এসআই) আব্দুর রহিম, কনস্টেবল হানিফের সহযোগীতায় ও লক্ষ্মীপুর মডেল থানার (এসআই) মোহাম্মদ কাউসার উজ্জামনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ভালুকা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌর সদরে শহীদ নাজিম উদ্দিন সড়কের দক্ষিণ পাশে সরকার টাওয়ার ১৪৪ নম্বর দি আপন জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকারের কাছ থেকে ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু আড়াই ঘণ্টাব্যাপী স্থানীয় প্রভাবশালীর মাধ্যমে দেন-দরবারের পর রহসজন্যক কারণে তাকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি।

এদিকে, একটি সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুর জেলা সদরে স্বর্ণাঙ্কার ছিনতাই হওয়ার পর গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার এমসির বাজার খান-বাড়ি মোড়ের বাড়িওয়ালা আব্দুল খালেকের কাছে স্বর্ণাঙ্কার বিক্রি করা হয়। পরে আব্দুল খালেক স্বর্ণালাঙ্কারগুলো স্থানীয় রূপসী জুয়েলার্সের মালিক মিজানুর রহমানের কাছে বিক্রি করতে গেলে তিনি স্বর্ণালঙ্কারগুলো গলিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ভালুকা বাসস্ট্যান্ড পৌর সদরে শিমুলতলী এলাকার হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পালের কাছে বিক্রি করেন।

রূপসী জুয়েলার্সের মালিক মিজানুর রহমানুর রহমান জানান, বাড়িওয়ালা আব্দুল খালেক তার কাছে প্রায় সাড়ে ৯ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আসেন। কিন্তু তার টাকা না থাকায় তাকে সঙ্গে নিয়ে ভালুকা হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পালের কাছে বিক্রি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার সর্তে স্থানীয় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, এতদিন ব্যবসা করে আমরা চলতে পারি না। আর তারা রাতারাতি একাধিক বাড়ি, কয়েক কোটি টাকার জমি ও তিন ভাই তিনটি বিশাল জুয়েলার্সের দোকান কি করে গড়ে তুলতে পারে। বেশ কয়েক মাস আগে চোরাই স্বর্ণ উদ্ধারের অভিযোগে অভিযুক্ত শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকতারের বড় ভাই মডার্ন জুয়েলার্সের মালিক রতন কৃষ্ণ কর্মকার পুলিশের হাতে ধরা পরে প্রায় এক মাস জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে আসে।

তিনি আরও জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ভালুকা মডেল থানার এসআই আব্দুর রহিম, লক্ষ্মীপুর মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ কাউসার উজ্জামান এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নিয়ে দেন-দরবার করে।

স্থানীয়রা জানান, ওই তিন ভাইয়ের সঙ্গে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট, চোরচক্র ও ছিনতাইকারীদের যোগসূত্র থাকতে পারে। আর তা না হলে বার বার এ অপরাধমূলক কাজে তারা কেনো সনাক্ত হয়। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে সচেতন মহলদের মধ্যে। তাদের প্রশ্ন হলো ছিনতাইকৃত স্বর্ণ বন্ধক রাখা যায় কি? ছিনতাই করা যদি ত্রুাইম হয়। তাহলে ছিনতাইকৃত স্বর্ণ যারা ক্রয় করল তারা অপরাধের মধ্যে পরে কি? যদি অপরাধের মধ্যে পরে কিসের বিনিময়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল অপরাধীরা।

দি আপন জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকার জানান, সরকার টাওয়ারে পাশের কাইয়ূম মার্কেটের হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পাল ১৩-১৪ দিন আগে তার কাছে ৫ ভরি স্বণার বন্ধক রেখে দুই লাখ টাকা নেয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তার টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণ নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে হৃদয় জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জন পাল দোকন বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে শ্যামল কৃষ্ণ কর্মকারের বড় ভাই লিপি জুয়েলার্সের মালিক অরুণ কৃষ্ণ কর্মকার জানান, তারা ভালুকায় অবস্থানকালীন সময়ে কোনো ধরণের অবৈধ ব্যবসা করেননি। তার দুই ভাই রতন ও শ্যামলের এক টাকাও পুঁজি নেই। কতজনে কত কথা বলবে, তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই বলে জানান ওই জুয়েলার্সের মালিক।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির ভালুকা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও গঙ্গা জুয়েলার্সের মালিক প্রশান্ত কুমার সাহা জানান, ঘটনাটি খুবই দু:খ্যজনক, বার বার তাদের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগ কেনো, এটা আমরাও চিন্তা করি। তারা বড় ব্যবসায়ী, তাদের ব্যাপারে আমি কি আর বলবো।

তিনি আরও বলেন, এক ভরি স্বর্ণ ক্রয় বিক্রয় করা হলে ৫শ থেকে ৬শ টাকা লাভ হয়। তারা কিভাবে এত বড় ব্যবসায়ী হয়েছে, তার আমার জানা নেই।

মামলার তদন্তকারী লক্ষ্মীপুর মডেল থানার (এসআই) মোহাম্মদ কাউসার উজ্জামান জানান, গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারীর শিকারোক্তিতে ভালুকা দি আপন জুয়েলার্স থেকে ছিনতাইকৃত ৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু স্বর্ণগুলো দি আপন জুয়েলার্সের মালিকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল, তাই দি আপন জুয়েলার্সের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভালুকা মডেল থানার (এসআই) আব্দুর রহিম জানান, ঘটনাটি আমাদের না লক্ষ্মীপুরের, আমি ও কনস্টেবল হানিফ শুধু সহযোগিতা করেছি।

ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, ঘটনাটি লক্ষ্মীপুরের মডেল থানার পুলিশ সহযোগিতা চাওয়ায় আমরা পুলিশ দিয়ে সহযোগিতা করেছি।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড