• বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বহিষ্কৃত মাদরাসা শিক্ষকের ইশারায় চলছে প্রতিষ্ঠান

  মিজানুর রহমান, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)

১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:২৫
বহিষ্কৃত মাদরাসা শিক্ষকের ইশারায় চলছে প্রতিষ্ঠান
বহিষ্কৃত মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা মো. সাখাওয়াত হোসেন (ফাইল ছবি)

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভুয়া কাগজপত্র সৃষ্টির মূলহোতা, ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির কারণে আরবি প্রভাষক মাওলানা মো. সাখাওয়াত হোসেন চাকুরিচ্যুত হন। যদিও তা সত্ত্বেও মাদরাসায় তার দাপটে বিপাকে পরেছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম ও ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারী।

এমনকি পুলিশ হত্যা মামলাসহ দুই ডজনেরও বেশি নাশকতার মামলার আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে অফিস আদালত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সাখাওয়াত। সাখাওয়াত হোসেন উপজেলার ভুরারঘাট এম. ইউ বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার আরবি প্রভাষক ও অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ছিলেন।

জানা যায়, মো. সাখাওয়াত হোসেন বিপিএডের জাল সনদ সৃষ্টি করে ২০০০ সালে উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের আজেপাড়া দাখিল মাদরাসায় শরীর র্চচা শিক্ষক হিসেবে এমপিও ভুক্ত হন। এরপর ২০০৩ সালে পুনরায় জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে ওই মাদরাসায় সুপার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে নিয়োগ বাণিজ্যসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার নির্যাতন করিয়া তাদের নিকট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন।

বিষয়টি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের তদন্তে প্রমাণিত হলে ধূর্ত মো. সাখাওয়াত হোসেন কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে তা ধামাচাপা দেন। সামনে বিপদ বুঝতে পেরে আবারও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র সৃজন করে ভূরারঘাট এম. ইউ বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায় রাতের অন্ধকারে গভর্নিং বডির সভাপতি, কালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সকল সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে একদল কুচক্রীর যোগসাজশে ২০০৪ সালে আরবি প্রভাষক পদে এমপিও ভুক্ত হয়।

পরবর্তীকালে বিষয়টি জানা জানি হলে গভর্নিং বডির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উক্ত সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত, গাইবান্ধায় মামলা দায়ের করার জন্য অধ্যক্ষ সাহেব বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। অপর দিকে ধুরন্ধর সাখাওয়াতও উক্ত আদালতে মামলা দায়ের করেন এবং নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে মামলা তুলে নেন। এমনকি নিয়োগ থাকা অবস্থায় আজেপাড়া দাখিল মাদরাসায় বিল বেতন উত্তোলন করতে থাকেন। পরে সাখাওয়াত হোসেন গোপনে তার শ্বশুর ও স্ত্রীর বড় ভাইসহ বাড়ীর কাজের লোকদের দ্বারা কমিটি গঠন করে ভুরারঘাট এম. ইউ বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায় অধ্যক্ষ মো. আজিজুর রহমানকে অবৈধ পন্থায় অপসারণ করেন।

সেই সঙ্গে জুনিয়র শিক্ষক মো. মকবুল হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে এনে কৌশলে আবারও কাগজপত্র সৃজন করে ২০০৯ সালে উক্ত মাদরাসায় নতুন একটি ইনডেক্স ব্যবহার করে আরবি প্রভাষক হয়ে নিজে মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শিক্ষক কর্মচারীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, উক্ত মাদরাসার চারজন জীবন্ত শিক্ষককে মৃত্যু ও তাদের নামে ইস্তফা পত্র দেখিয়ে এমপিও থেকে নাম কর্তন করে তাদের স্থানে জালিয়াত সাখাওয়াত নিজের স্ত্রী, শ্যালকের স্ত্রী, বোনের মেয়ে ও নিকট আত্মীয়কে নিয়োগ দেখিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এমপিও ভুক্ত করে সরকারি কোষাগারের টাকা আত্মসাৎ করেন।

উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের কারণে অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক গাইবান্ধা, স্থানীয় সরকারের উপ সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের উপ সচিব এবং মাউশির উপ পরিচালক সরেজমিন তদন্তে জাল-জালিয়াতি ও অনিয়ম দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলেও অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতাবলে সাখাওয়াত হোসেন বহাল তবিয়তে চাকুরিসহ অন্যায় কাজ কর্ম করেই যান।

তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, সাখাওয়াত হোসেনসহ অবৈধভাবে এমপিওভূক্ত পাঁচজন শিক্ষকের এমপিও স্থগিত হলে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের সহকারী পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে এমপিও ছাড় করণের চেষ্টাকালে হাতেনাতে ধরা পরার পর কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের উপ সচিব কবির আল আসাদের সরেজমিন তদন্তে জাল স্বাক্ষর বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় সাখাওয়াত হোসেনসহ পাঁচজন শিক্ষকের এমপিও পুনরায় স্থগিত হয়। এরপর জালিয়াত সাখাওয়াত হোসেন স্থগিতকৃত এমপিও ছাড় করণের জন্য মহামান্য হাইর্কোটে রিট পিটিশন নং-৮৮০২/১৮ আনায়ন করেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখের আদেশে তিনি হেরে গেলে লিভ টু আপিল নং ১১১/২১ দায়ের করলে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টে তা খারিজ হয়ে যায়। মামলার নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্রাদেশের আলোকে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর কারণ দর্শানোর যথাযথ জবাব না পাওয়ায় বর্ণিত পাঁচজন শিক্ষকের নাম এমপিও থেকে স্থায়ীভাবে কর্তন করেন।

সাখাওয়াত হোসেন চাকুরিচ্যুত হওয়ার পরেও অফিস আদালতে কখনো নিজেকে প্রভাষক, কখনো উপাধ্যক্ষ ও কখনো ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে মাদরাসা সীল প্যাড ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভুয়া আবেদন করে। কখনো নিজে বাদী হয়ে কখনো স্ত্রী বা ভাগ্নিকে দিয়ে অথবা কাজের লোক দিয়ে মামলা মোকদ্দমা করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি করেই চলছেন। এ ধরণের কর্মকাণ্ডের জন্য অত্র মাদরাসায় গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হলেও কমিটি গঠন করতে না পারায় গত ইদ উৎসব ভাতা ও এপ্রিল/২২ মাস থেকে অদ্যাবধি বেতন ভাতা পাচ্ছেন না শিক্ষক কর্মচারীরা। যার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে মাদরাসার শিক্ষাদান কর্মসূচিসহ সার্বিক কার্যক্রম।

বর্তমানে সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে সি.আই.ডি ঢাকা ও দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। এছাড়াও সুন্দরগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জে ৪ পুলিশ হত্যাসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ২০/২৫টি মামলার আসামি সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমানে মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন।

আরও জানা যায়, কুচক্রী সাখাওয়াত হোসেন একাধিক প্রতিষ্ঠানে অবৈধ পন্থায় সভাপতি হয়ে জীবন্ত শিক্ষককে মৃত দেখিয়ে তদস্থলে অন্য ব্যক্তিকে এমপিও ভুক্ত করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাখাওয়াত হোসেন সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার একজন নিকাহ রেজিস্টার। সেখানেও নির্বিঘ্নে বাল্য বিবাহসহ সকল ধরনের অনিয়ম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন তদন্তে সকল অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিবাহ রেজিস্টারের সনদ বাতিল হলেও অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতাবলে বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কাজী সাখাওয়াত।

এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান। এরপরেও থেমে নেই সাখাওয়াত হোসেন। চাকুরি ফেরত পাওয়ার নাটক করে তথ্য গোপন পূর্বক জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র সৃষ্টি করে বার বার মহামান্য হাইর্কোটে ও বিজ্ঞ আদালত গাইবান্ধায় মামলা করে মাদ্রাসাটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছেন। সচেতন মহলের প্রশ্ন, এর স্থায়ী সমাধান কোথায়?

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড