• মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অনিয়ম, দুর্নীতিতে জর্জরিত কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র 

  শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:২৬
কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। ২০ শয্যার এই কল্যাণ কেন্দ্রে সরকারি স্টাফ রয়েছে ৯ জন (পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা) এবং আরটিএম এনজিও ১৩ জন স্টাফসহ মোট ২৩ জন ।

২৩ জন স্টাফ নিয়ে চলা ২০ শর্য্যার সরকারী হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারনে সেবার মান কমেছে৷ এসব কিছু দেখার যেন কেউ নেই।সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন অভিযোগ, সেবা পেতে গিয়ে নানা হয়রানি ও কাঙ্খিত সেবা না পাওয়ার।

সেবাগ্রহীতাদের সাথে দুর্ব্যবহার, নির্দিষ্ট ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে বাধ্য করা, ডাক্তার ও প্রভাবশালী মহলের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া, টাকা ছাড়া সিজার না করা, রাজস্ব খাতে জমা না করে উর্পাজিত অর্থ আত্মসাৎ, প্রতিবছর আসা সংস্কার বাজেটের কাজ না করে অর্থ ও গর্ভবতীদের জন্য আসা ওষুধ লোপাট করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র-ম্যাটানিতে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।

অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডাক্তার পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য্য।

অভিযোগ রয়েছে, ম্যাটার্নিতে চিকিৎসা নিতে গেলেই সকল গর্ভবতীদের নিদিষ্ট করে সেবা ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে পাঠানো হয়। অন্য কোথাও কেউ আলট্রাসোনোগ্রাম করে আসলে তাকে আবারো তাদের কমিশনকৃত ক্লিনিকে তা করতে বলা হয়। এমনকি অন্য কোথাও করে আসা রোগীর রিপোর্ট ছুড়ে ফেলেছেন চিকিৎসক, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও স্টাফরা। এছাড়াও গেটে থাকা দারোয়ানকে রোগীদের সেই নির্দিষ্ট ক্লিনিকে আলট্রাসোনোগ্রাম করতে যেতে বলতে বলেন তাদের নিদিষ্ট ল্যাবে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের মাঝের পাড়া গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক গর্ভবতী নারী বলেন, এখানে সেবা নিতে এসে উল্টো হয়রানি হতে হয়। ঠিকমতো রোগী দেখেন না। এমনকি দারোয়ানরাও খুব বাজে ব্যবহার করে। ডাক্তারের দেখা পায় না, ভিজিটররাই চিকিৎসা করেন।

কক্সবাজার পৌর এলাকার মোহাজের পাড়ার মোসা. আমেনা খাতুন বলেন, ওষুধ নিতে গেলে নাই বলে তাড়িয়ে দেয়। বাহির থেকে আলট্রাসোনোগ্রাম করায় পরিদর্শকরা বলেন, ওখান থেকে আসলে আমাদের এখানে (ম্যাটানি) আসবে না। এমনকি সিজারের সময়ও অকথ্য ভাষায় কথা বলে পরিদর্শকরা।

গর্ভবতী থাকাকালীন সময়ে পৌরসভা থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার কথা ছিল আনোয়ারা বেগমের। তবে এর আগে প্রয়োজন ছিল মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসারের সাক্ষরের। আনোয়ারা বেগম জানান, স্বাক্ষর নিতে গেলে ডাক্তার তাকে অপমান করে বলে আমি কি এসব করার জন্যই আছি। দিতে পারবো না, যাও। আর এই সাক্ষর না পাওয়াতে ১০ হাজার টাকা থেকে বঞ্চিত হন রাজমিস্ত্রী স্বামীর স্ত্রী আনোয়ারা।

এসব অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে কক্সবাজার জেলা স্বয়ংসম্পূর্ন সরকারি হাসপাতাল কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সিট আছে কিন্তু রোগী নেই। অথচ সরকারি বরাদ্ধ ও খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দায়িত্বশীল নার্স এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের মারাত্মক খারাপ আচরণ এবং টাকা দাবির প্রবণতার কারণে রোগী আসে না।

একটি বেসরকারী এনজিও উক্ত মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ডেলিভারী রোগিদের অপারেশনসহ চিকিৎসা করার জন্য অনুমতি চাইলেও মিলছে না অনুমতি ফলে বিপুল টাকা খরচ করে প্রাইভেটে হাসপাতালে সিজার করাতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষদের।

কক্সবাজার মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে কান্নারত অবস্থায় বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সেখানে নতুন নয়। প্রসব বেদনা নিয়ে সেখানে গেলেই কর্তব্যরত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (নার্স) বা ভিজিটর দেখেন। পরে বলেন বাচ্চা প্রসব হতে সময় লাগবে। ডেলিভারী করাতে চাইলে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। টাকা দিলেই প্রসূতিকে চিকিৎসা শুরু করেন। আর টাকা না দিলে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। এভাবে প্রতিদিন অনেক প্রসবতি মা প্রসব বেদনা নিয়ে এই হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুঁটতে হচ্ছে। সরকারী মা ও শিশু হাসপাতালটি এসব অনৈতিকতার কারণে অনেকটা ফাঁকা থাকে, রোগীবিহীন।

সকালে মা ও শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, নীচ তলায় কয়েকজন ভিজিটর এবং অন্যান্য কর্মচারী বসে আছেন। কোন রোগী আসলে তারা সেবা পাচ্ছে না। এখানে দায়িত্বশীলরা যে যার মত চাকরি করছেন।

পাহাড়তলি থেকে আসা এক গৃহবধূ জানালেন ,আমি এক মাস আগে এখানে ডেলিভারি করেছি। পেটে একটু ব্যথাসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হওয়ায় আবার এসেছি। কিন্তু এই মা ও শিশু হাসপাতালে থাকা অবস্থায় দুর্বিষহ স্মৃতিগুলো মনে হলে, এসব নার্স ও ডাক্তারদের প্রতি ঘৃণাই আসে।

তিনি জানান, যেই দিন আমি মা ও শিশু হাসপাতালে প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি ছিলাম সেই কালো রাতে কথা বর্ণনা করতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, রাত গভীর। বেদনার্ত আমি। কিন্তু পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকারা দরজাও খোলে না। খারাপ ব্যবহার করে। এক কথায় জন্ম নিয়ে গালমন্দ করে। রাগান্বিত হয়ে, এও বলেছে-'এত বাচ্চা জন্ম দিচ্ছিস কেন? আমরা কোনো চিকিৎসা করব না। অবশ্য এর আগেও তারা দাবি করে টাকা নিয়েছে। আর সেই সময় সমস্ত ঔষধ বাহিরে ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা ভাল কিন্তু কোন সিট খালি থাকে না। মেঝেতে পড়ে থাকতে হয় বলে কষ্ট হয়। সে জন্য এখানে অনেক গরীব অসহায় প্রসূতি আসেন কিন্তু এখানে কর্মরতদের ভাষা আর সেবা অনেক খারাপ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ভিজিটর হিসাবে কর্মরত রয়েছেন-স্বাধীন প্রভা দাশ, রৌশন ফারহানা ইয়াসমিন, ফাতেমা আনকিস। এছাড়া মিতা চাকমা আছেন, যিনি ফার্মেসী বিভাগ দেখাশুনা করেন। লাকী আকতার হিসাবসহ অন্যান্য বিষয়ে দেখেন। ডলি, তমা, রাখিসহ অনেকে মিওয়েফাই হিসাবে কাজ করেন। ভোক্তভোগীদের দাবী, তারা প্রত্যেকে সাধারণ রোগিদের সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করেন এবং কোন সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করায় সরকারী সেবা প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসে দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরটিএম এনজিওর এক কর্মকর্তা জানান, জেলা সদর হাসপাতালে যদি রোগীদের কারণে জায়গা সংকট থাকে। আর মা ও শিশু হাসপাতালে কেন রোগী নেই সেটা চিন্তা করা সবার উচিত।

তিনি বলেন, সরকার প্রতিমাসে স্টাফদের জন্য লাখ লাখ টাকার বেতন, ওষুধ সহ অন্যান্য জিনিসপত্র দিচ্ছেন। এগুলো সব জনগনের ট্যাক্সের টাকা। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখানে এসে বিনামূল্যে সেবা পান না।

তিনি আরও বলেন, আরটিএম এনজিওর পক্ষ থেকে সিজার ব্যবস্থা চালু করতে চাইলেও ঠিকমত অনুমতি মিলছে না। অথচ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা আছে; সে অনুপাতে কক্সবাজারের মানুষ সেবা পাচ্ছে না।

একজন কর্মচারী জানালেন আগে ডাক্তার সোমা চৌধুরী যখন নিয়মিত এখানে বসতেন তখন রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। গত মার্চে তিনি বদলী হয়ে চট্টগ্রাম চলে গেছেন। তিনি যাওয়ায় সেবার মান হয়েছে নিম্নমুখী। এতে তেমন কোন রোগী এখন আসে না। অথচ সরকারি সব বরাদ্দ নিয়মিতই খরচ হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে ভিজিটররা অনেক বড় নেতা। তাই তাদের সামনে কোন ডাক্তার ঠিকমত কথা বলতে পারেন না।আসলে কক্সবাজারের মানুষকে সরকারী সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর অনিয়ম দূর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা আত্মসাৎ করছে সংশ্লিষ্টরা।

২০ শয্যার এই মা ও শিশু হাসপাতালে কখনও পরিপূর্ন রোগী ছিল কেউ বলতে পারবে না। অথচ পাশেই জেলা সদর হাসপাতালে এক বেড়ে ২ জন রোগী সেবা নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডাক্তার পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য্য বলেন, আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি কয়েকমাস হচ্ছে। আমি শুধু কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধের দায়িত্ব নিয়েছে। হাসপাতাল তদারকি করার দায়িত্বশীল পদটি শুন্য রয়েছে। হাসপাতালে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব আমার উপর না পড়লেও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকারা প্রসূতিদের কাছ থেকে টাকা আদায়, খারাপ ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগগুলো আমি পেয়েছি। এসব বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি ওষুধ রোগীদের না দেওয়ার বিষয় তিনি অস্বীকার করে বলেন, যেগুলো এখানে নেই, সেগুলো হয়তো রোগীরা বাহির থেকে কিনেন।

সিজারে টাকা আদায় আগে করা হতো, এখন বন্ধ রয়েছে জানিয়ে বলেন, এখন হাসপাতালের উন্নয়ন কাজ করছে আরটিএম নামের একটি এনজিও। সামনে রোগীরা আরও ভালো সেবা পাবে। তবে হাসপাতালের নেগেটিভ নয়, পজেটিভ নিউজ করার অনুরোধ জানান তিনি।

এদিকে, দ্রুত কক্সবাজার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান কক্সবাজারের সচেতন মহল।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড