• শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে গৃহহীন আড়াই শতাধিক পরিবার

  হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম

৩১ আগস্ট ২০২২, ১৮:১৫
তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে গৃহহীন আড়াই শতাধিক পরিবার
নিজেদের স্থাপনা ভেঙে ফেলছেন ক্ষতিগ্রস্তরা (ছবি : অধিকার)

‘গত রাইতে ঘুমামো এমন সময় ঘপাৎ করি ভাঙন শুরু হইছে। হামরা বাচ্চাগুলাকো ডাকপের পাই নাই। নাই ডাকাইতে হামার একটা ঘর নদীত গেল। ভাগ্যভাল ওই ঘরোত কাঁইয়ো আছিল না।’ এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তিস্তা পাড়ের বজরা কালাপানি গ্রামের মৃত শাহাদত হোসেনের স্ত্রী মুফিয়া বেগম (৭৫)।

একই কথা জানালেন সাতালষ্কার গ্রামের রহিম মিয়া (৪৫)। তিনি বলেন, ‘ফজরের সময়ের পরপর যে ভাঙ্গাটা ভাঙছে ঘর টানবের পাই নাই। কোনো জিনিষ ধরার সুযোগ পাই নাই। ঘর একবারে ডাবি গেইছে।’

গত এক মাস যাবৎ ভাঙন শুরু হয়েছিল কুড়িগ্রামের উলিপু উপজেলার বজরা ইউনিয়নের পশ্চিম কালপানি বজরা, কালপানি বজরা ও সাতালস্কর গ্রামে। উত্তরে জজমিয়ার বাড়ী থেকে দক্ষিণে রোস্তম মৌলভীর বাড়ী পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী ভাঙনের তাণ্ডব চলছিল। এর মধ্যে গত তিনদিনে হঠাৎ করে ভাঙনের তীব্রতার ফলে প্রায় আড়াই শতাধিক বাড়িঘর, ৫শ’ বিঘা ফসলী জমিন, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, মন্দির, ইদগাহ মাঠসহ মানুষের শেষ সম্বলটুকুও নদী গ্রাস করেছে।

এই গ্রামের বজরা পশ্চিম পাড়া দাখিল মাদরাসার সুপার মৌলভী রেফাকাত হোসেন জানান, ১৯৮৯ সালে এখানে মাদ্রাসাটি নিয়ে আসা হয়। ৪১২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এই মাদরাসায়। গত পরশুদিন থেকে হঠাৎ করে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়। এর ফলে আমার মাদরাসার অর্ধেক চলে গেছে। বাকিটা ভেঙে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এই ভয়াবহ ভাঙনে পশ্চিম বজরা কমিউনিটি ক্লিনিক, বজরা পুরাতন বাজার, একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ, একটি মন্দির ও একটি ইদগাহ মাঠসহ প্রায় আড়াই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। লোকজন বর্তমানে খোলা আকাশে অবস্থান নিয়েছে।

সরজমিন বুধবার সকালে গ্রাম তিনটি ঘুরে দেখা যায় ভাঙনের শোকাবহ চিহ্ন পরে আছে খোলা প্রান্তরে। লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জিনিষপত্র সংগ্রহ করছেন। নদী তীরে রক্ষা পাওয়া নলকূপ, রান্নাঘরের চুলা উঠানোর চেষ্টা করছেন। গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। ভাঙনের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে তাদের চোখে মুখে। পুরো নদীর কোল ঘেঁষে শত শত মানুষ এসেছেন দুর্দশার চিহ্ন দেখতে। আর শ্রমিকরা ভোর রাত থেকে খাটছেন ঘরবাড়ীর বেঁচে যাওয়া অংশগুলো উদ্ধারে।

এমন পরিস্থিতিতে অভিযোগ সরকারিভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি কেউই। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা শুধু দেখে গেছেন। তাদের নাকি কিছুই করার নেই। অপর দিকে ভয়াবহ এই ভাঙনের খবর পেয়েও উপজেলা প্রশাসন থেকে কোনো খোঁজখবর নেয়া হয়নি। দুর্দশাগ্রস্তরা বৃষ্টির মধ্যেই খোলা প্রান্তরে মানবেতরভাবে রয়েছে অনেকেই।

চোখের পানি মুছতে মুছতে কালপানি বজরার মৃত জহুর ব্যাপারীর ছেলে মোজাম্মেল হক (৬৫) বলেন, ‘তিনদিন থাকি এটে (খোলা মাঠে) পরি আছি। গরীব মানুষ জায়গা নাই কোটে যাই। আজকে বজরা বাজারের বাসিন্দা দুর সম্পর্কের জেঠাতো ভাই টিটু মিয়া তার খুলিত (আঙিনায়) ঘর তোলার অনুমতি দিছে। দেখি ওটে যায়া আপাতত উঠি, তারপর মাবুদ দেখপে।'

ট্রাক্টরে করে মালপত্র নিয়ে যাচ্ছিলেন সাতালস্কর গ্রামের মৃত শাহাদত হোসেনের ছেলে শাহজাহান। তিনি বলেছেন, ‘আমি আর আমার মা সুফিয়া বেগম আর প্রতিবেশী রঞ্জু মিয়া দক্ষিণ বজরার বাবুরহাটে যাচ্ছি। সেখানে এক ব্যক্তি জায়গা দিয়েছে। সেখানে গিয়ে উঠব।’

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপুল কুমার বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিকভাবে খোঁজখবর নিচ্ছি। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের ভাঙন কবলিতদের দ্রুততম সময়ে তালিকা করতে বলা হয়েছে। তালিকা পেলেই সহযোগিতা করা হবে। এছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে আমরা ভাঙনের বিষয়গুলো আপডেট করেছি। হোয়াটসআপে ছবিও দিয়েছি। তাদের বাজেট না থাকায় তারা মুভমেন্ট করতে পারছে না বলে জানিয়েছে। আর খোলা আকাশে কেউ থাকলে সেটা আমার নজরে আসেনি। আমি এখনেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত ২০-২৫ বছর পূর্বে মুল নদীর তীব্রতা ছিল এই এলাকায়। গ্রামগুলোর উজানে নদী শাসনের ব্যবস্থা নেয়ায় এখানে হঠাৎ করে ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড