• মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কক্সবাজারে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি

উদ্ধার তৎপরতা নেই

  শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

৩১ আগস্ট ২০২২, ১৮:০৬
কক্সবাজারে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি
অবৈধ অস্ত্র কাঁধে যুবক (ছবি : অধিকার)

কক্সবাজারের ইদগাঁও উপজেলার ইদগাঁও ইউনিয়নের ভুতিয়া পাড়া এলাকার তোফায়েল আহমেদ টুলু অবৈধ অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ঘুরাঘুরি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত তোফায়েল আহম্মেদ টুলু অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র কাঁধে নিয়ে গভীর জঙ্গল থেকে বের হচ্ছে।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার জেলার যেসব জায়গায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, প্রায় সব জায়গাতেই অস্ত্রের দেখা মিলেছে। ফলে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের একটা প্রবণতা ধীরে ধীরে যেন প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোনো অভিযানের খবর বেশ কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায়নি, এতে করে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

কাঁধে নেয়া অস্ত্রটি কার, কেন টুলু অস্ত্র কাঁধে নিয়ে পাহাড়ে ঘুরাঘুরি করছে তার কোন উত্তর মেলাতে পারছে না স্থানীয়রা। টুলু অস্ত্র কাঁধে নিয়ে তোলা ভাইরাল হওয়া ছবিটি ইতোপূর্বেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড হয়েছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে ঘুরাঘুরির দৃশ্য দেখে স্থানীয় কাঠুরিয়া, সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী, পথচারী, এলাকাবাসীর মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয়রা জানান, আগ্নেয়াস্ত্র কাঁদে নিয়ে ছবিতে থাকা ইদগাঁও ইউনিয়নের ভুতিয়া পাড়ার মৃত ছৈয়দ আকবরের ছেলে তোফায়েল আহমেদ টুলুর বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানা, রামু থানাসহ বিভিন্ন থানা -আদালতে বন, পরিবেশ, অস্ত্র, ডাকাতি, অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ডজনাধীক মামলা রয়েছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, তোফায়েল আহমেদ টুলু এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত। তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও এই তোফায়েল আহমেদ টুলু অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকেই।

অভিযোগ রয়েছে, এক সময়ের ইদগড়-ইদগাঁও সড়কের শীর্ষ ডাকাত তোফায়েল আহমেদ টুলু রাতারাতি বন বিভাগের হেডম্যান পরিচয় দিয়ে অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। টুলু নিজেকে বন বিভাগের হেডম্যান (বন জায়গীরদার প্রধান) পরিচয় দিয়ে মেহেরঘোনা রেঞ্জের আওতাধীন বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখল করেছে। বনধ্বংস করে বনবিভাগের জমি বিভিন্ন লোকজনকে প্লট আকারে বিক্রিও করেছে। পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে জড়িত রয়েছে এই টুলু। মেহের ঘোনা রেঞ্জের বশিরের খামারের পাশে নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে।

স্থানীয় ভুতিয়াপাড়া এলাকায় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বনভূমি বিক্রি করার পর ক্রেতাদেরকেই বন মামলার আসামি করে হয়রানিসহ নানারকম নির্যাতন করে যাচ্ছে। স্থানীয়রা এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না, কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে গিয়ে বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছে। টুলুর নির্যাতনে এলাকাবাসী দিশেহারা অবস্থায় আছে।

স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় টুলু এসব অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। অবৈধ অস্ত্রের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে আসলেও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। অস্ত্রধারী সেই টুলুকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এ দিকে সম্প্রতি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র কাঁধে একটি ছবি ভাইরাল হওয়ার পর মুখ খুলতে শুরু করেছে স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা আরও বলেন, তোফায়েল আহমেদ টুলু পাহাড়ের স্বঘোষিত রাজা। বনের গাছ চুরি, বনভূমি দখল, সড়কে যানবাহন ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসা এখন তার নিত্যদিনের পেশা। ইদগড়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী বন্দুক কালু ও মোস্তাক আহমদ বাবুলের অস্ত্র তৈরির কারখানা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র এনে উচ্চ মূল্যে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিক্রি করে আসছিল৷ তার অপরাধের তালিকা দিনদিন দীর্ঘ হলেও প্রশাসনে নীরবতায় উৎকণ্ঠিত ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয়রা টুলুর অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার উদ্ধার করে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবী জানান।

অবৈধ অস্ত্র কাঁধে নিয়ে তোলা ছবির বিষয়ে তোফায়েল আহমেদ টুলু বলেন, অস্ত্রটি মেহেরঘোনা রেঞ্জের। বন পাহারা দিতে বন বিভাগের পক্ষে দিয়েছিল অস্ত্রটি।

যদিও কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের মেহের ঘোনা রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম বলেন, টুলুকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হয়নি। পাবলিকের হাতে অস্ত্র দেয়ার কোন আইন নেই, তাকে অস্ত্র দেয়ার প্রশ্নই আসে না।

রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম আরও বলেন, টুলু বন বিভাগের হেডম্যান নয়। তিনি বনায়নের উপকারভোগী। অন্য উপকার ভোগীদের মতো তাকেও সামাজিক বনায়ন পাহারা দিতে হয় বলে জানান রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াজ।

প্রদর্শিত অস্ত্র কোথায় ব্যবহার হয় জানতে চাইলে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ অস্ত্র মূলত দুটি জায়গায় ব্যবহৃত হয়। প্রথমত, সন্ত্রাসীরা হত্যা, চাঁদাবাজি, লুটতরাজের কাজে ব্যবহার করে। আর দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অঙ্গনে। সেখানেও সংঘাতের সময় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্রের এই প্রদর্শন আমাদের তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, এই অবৈধ অস্ত্র যারা সংগ্রহ করেন বা রাখেন, তাদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো-না-কোনো সদস্যের একটা সখ্য আছে। সেই সখ্যের ভিত্তিতেই তারা এই সাহসটা পায়। গণমাধ্যমে অস্ত্রসহ ছবি ছাপা হওয়ার পরও তাদের মধ্যে কোনো ধরনের অপরাধ-বোধ বা ভীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়ার লক্ষণ আমরা দেখতে পাই না। দ্বিতীয়ত, অস্ত্র প্রদর্শন করে কেউ যখন নিজের বীরত্ব প্রকাশ করতে চায়, তখন বুঝতে হবে সমাজে এদের প্রভাব বেড়ে গেছে।

তারাই সমাজের চালিকা শক্তি। সেখানে সাধারণ মানুষের গুরুত্ব কম। আর তৃতীয়ত, আগে আমরা দেখতাম এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠতে। এখন সেটা দেখা যায় না। কেউ প্রতিবাদ করেন না। কারণ, এদের সবাই ভয় পায়। ফলে সাধারণ মানুষ একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্যে দিন পার করছেন।

কক্সবাজারের ইদগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল হালিম বলেন, আমাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে প্রতিটি জায়গায় প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে অস্ত্রবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হয়।

তিনি আরও বলেন, অস্ত্রের প্রদর্শনের বিষয়টি আগে কেউ জানায়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ছবি দেখা গেছে। লোকমুখে অস্ত্রটি বন বিভাগের বলে শুনেছি, তারপরও যাচাই বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড