• সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্র বদলে দিয়েছে স্বেচ্ছা পাহারা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ জুলাই ২০২২, ২২:১৪
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্র বদলে দিয়েছে স্বেচ্ছা পাহারা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বেচ্ছা পাহারা প্রদানকারী দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে (ছবি : অধিকার)

মিয়ানমার থেকে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফ থানাধীন ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এপিবিএন পুলিশ দায়িত্বরত। এফডিএমএন সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবা।

তিনি বলেছেন, বিভিন্ন দল-সাব ব্লকে বিভক্ত হয়ে রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারীরা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটাতে সবসময় তৎপর। তবে তাদের এই অপতৎপরতাকে রুখে দিতে চালু করা হয় শান্তিকামী এফডিএমএন সদস্য দ্বারা স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা।

গত ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর ক্যাম্প-১৮ এর ‘জামেয়া দারুল উলুম নাদুয়াতুল ওলামা আল ইসলামীয়া মাদরাসায় রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারীরা ছয়জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড ও নারকীয় ৬ খুনের পর এফডিএমএন সদস্যরা নিরাপত্তা প্রশ্নে দিশেহারা হয়ে পড়েন।

৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেছেন, ভিন্নভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীকে প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে দুষ্কৃতিকারী, চাঁদাবাজ, অপহরণকারী, মুক্তিপণ দাবিকারী, নারী নির্যাতনকারীদের নির্যাতন ও নিষ্পেশন থেকে শান্তির বলয়ে নিয়ে আসা যায় তা আমার চেতনাকে বারবার নাড়া দিয়ে গেল। আমার মাথায় এলো “এফডিএমএন সদস্যদের দ্বারা স্বেচ্ছা পাহারার চিন্তা”।

তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর আমার দায়িত্বাধীন শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্প-১৬ ও জামতলি ক্যাম্প-১৫ এর সকল অফিসার ও মাঝিদের সাথে স্বেচ্ছা পাহারা নিয়ে সভা করি। অতঃপর দুইটি ক্যাম্পে স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালু করি।

উল্লেখিত, দুইটি পুলিশ ক্যাম্পের ১৪৭টি উপদলে পাঁচজন করে মোট ৭৩৫ জন স্বেচ্ছা পাহারা দিতে থাকে। ১৫ দিন পর এই স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থার ফলাফল মূল্যায়ন করে দেখা গেল দুষ্কৃতিকারীদের অপরাধ সংঘটন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তার দাবি, আমাদের সহজ বক্তব্য ছিল- তোমরা ০৫ জন আজকে পাহারা দিচ্ছ, এতে ক্যাম্পের প্রায় ৫০০ জন মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে। আগামীকাল অন্য ০৫ জন পাহারা দেবে, তোমরা শান্তিতে ঘুমাবে। এভাবে ১৫-২০ দিন পর তোমাদের পাহারা পড়বে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্র বদলে দিয়েছে স্বেচ্ছা পাহারা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বেচ্ছা পাহারা প্রদানকারী দলের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে (ছবি : অধিকার)

তার মতে, তারা এটিকে অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন এবং তা বাস্তবায়নে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। শান্তিকামী এফডিএমএন সদস্যরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে পাহারা দিতে থাকল। এর সুফল সম্পর্কে অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) মহোদয়কে অবহিত করি। তিনি সেই বছরের ৮ নভেম্বর থেকে আমার চালু করা স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা অন্য আটটি এফডিএমএন ক্যাম্পে চালু করার জন্য ক্যাম্প কমান্ডারদের নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্যে, ৮ এপিবিএন এর আওতাধীন ১১টি এফডিএমএন ক্যাম্পে ৬৪টি ব্লকে ৭৭৩টি সাব-ব্লক রয়েছে। এক সাব-ব্লক থেকে অন্য সাব-ব্লকের গড় দূরত্ব ৫০-৬০ মিটার। মোট লোকসংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ জন। প্রতিটি সাব-ব্লকে গড়ে বাস করে ৪৬৮.৫৮ জন। প্রতিটি সাব-ব্লকে গড়ে স্বেচ্ছা পাহারা সক্ষম পুরুষের সংখ্যা ৮০-১০০ জন। প্রতিরাতে একটি সাব-ব্লকে ৫/১০ জন করে পাহারা দিচ্ছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পের এক্সিট এন্ট্রি পয়েন্টে পুলিশের সাথে ১৫/২০ জন এফডিএমএন সদস্য স্বেচ্ছা পাহারা দেয়। এই হিসেবে প্রতিরাতে স্বেচ্ছা পাহারা দিচ্ছে ৩,৮৬৫ জন। ১৫-২০ দিন পর একজন পাহারাদারের পাহারা পড়ে। অর্থাৎ এক রাত পাহারা দিলে ১৫-২০ দিন শান্তিতে ঘুমানো যায়। প্রতিদিন ক্যাম্পের চীফ মাঝির (এফডিএমএন ক্যাম্পের প্রধান নেতা) মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে পাহারাদারদের তালিকা পুলিশ ক্যাম্পে প্রেরিত হয়।

এ ব্যবস্থায় পুলিশ ৩ স্তরে ক্যাম্পের পাহারা দায়িত্ব মনিটরিং করে। প্রথম স্তর-ক্যাম্পের নির্দিষ্ট ডিউটি পার্টি, দ্বিতীয় স্তর-ক্যাম্পের নিজস্ব তদারকি পার্টি যা পুলিশ পরিদর্শক/এসআই এর নেতৃত্বে তদারকি হয়। তৃতীয় স্তর-এএসপি/এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে সকল ক্যাম্পে পাহারা দায়িত্ব তদারকি করা হয়। সার্বিক তদারকি অধিনায়ক মহোদয় করে থাকেন।

৮ এপিবিএন ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি এফডিএমএন ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় সেই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি। অপারেশনাল কার্যক্রম চালুর পর থেকে স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ৮.২৫ মাসে বিভিন্ন মামলায় ২০৮ জন দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতার হয়। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে ২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৯ রাউন্ড গুলি, ৯৪টি দেশীয় অস্ত্র, ৪,১৯,৮৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৮ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়।

স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৮.২৪ মাসে বিভিন্ন মামলায় ৭৫৪ জন দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতার হয়। ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৩৩ রাউন্ড গুলি, ১৪১টি দেশীয় অস্ত্র, ১৫,৩৭,০১৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ৪৯ ভরি ১৫ আনা ৪ রতি স্বর্ণ উদ্ধার হয় এবং ক্যাম্প ইতিহাসে প্রথম ক্লুলেস মার্ডার ডিটেকশন হয়।

এছাড়া স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর পূর্বের এবং পরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বেচ্ছা পাহারা চালুর পর একই সময়ে দুষ্কৃতিকারী গ্রেফতার বেড়েছে ৩.৬৩ গুণ, মাদক উদ্ধার বেড়েছে ৩.৬৬ গুণ, আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার বেড়েছে ৬.৫ গুণ, গুলি উদ্ধার ৫৯.২২ গুন ও স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে সাড়ে ২.৭৪ গুণ। এফডিএমএন সদস্যদের অভিমত যে, স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর পরে ক্যাম্প গুলোতে ৯৫% অপরাধ কমে গেছে।

স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থার মাধ্যমে এফডিএমএন সদস্যরা নিজস্ব নিরাপত্তা ও শান্তির প্রশ্নে দায়িত্বশীল হয়েছে এবং তাদের মনমানসিকতায় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অপরদিকে জালের মতো বিস্তৃত স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থায় দুষ্কৃতিকারীরা পুলিশি অভিযানে একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় জঙ্গীবাদ, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি, বিভিন্ন সংস্থার কর্মকাণ্ড মনিটরিং সহজ হচ্ছে। ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্র বদলে দিয়েছে স্বেচ্ছা পাহারা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের স্বেচ্ছা পাহারা প্রদানকারী দলের সদস্যদের জন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা (ছবি : অধিকার)

পুলিশ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্যাম্পে শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে আস্থার সর্ম্পক তৈরি হয়েছে। বহুমাত্রিক সংগঠনের কর্মযজ্ঞের মধ্যে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এপিবিএন পুলিশ আরও কৌশলী, উদ্যমী ও দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়েছে। পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটির জন্য একটি নিশ্চিত নিরাপত্তা বলয় ও শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের পরিবেশ বিনির্মিত হয়েছে।

এ ধারা অব্যহত থাকলে ক্যাম্প এলাকায় কোন রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারীর মাথাচাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উল্লেখ্যে এ বিশাল স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা বলে দাবি এই কর্মকর্তার।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড