• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বাড়ছে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ 

  হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম

২২ জুন ২০২২, ২১:০৯
বাড়ছে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ 
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ার চরে বন্যা পরিস্থিতি (ছবি: অধিকার)

‘বারদিন ধরি বাড়িত পানি। নলকুপ-পায়খানা তলে গেইছে। বউ-বাচ্চা নিয়া খুব বিপদে আছি। কাঁইয়োতো দেকপের আসিল না। এদন কষ্ট করি কি থাকা যায়।’ বেশ ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বললেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের নুরানী পাড়া গ্রামের আব্দুল হক সাহেবের স্ত্রী রেজিয়া বেগম (৪৮)।

১৩ জনের সংসার তার। স্বামী, স্ত্রী, তিন ছেলে, তিন ছেলের বউ ও বাচ্চাসহ একান্নবর্তী পরিবার। কৃষির উপর নির্ভর করে চলছে এই পরিবার। বোরো ধান, কাউন আর পাট আবাদ করেছিলেন। পেয়েছেন শুধু ধান। কাউন নষ্ট হয়ে গেছে। পাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সেই পাট ছিঁড়ে শাক আর কচুর ডাল দিয়ে দুপুরের রান্না হয়েছে। সকালে শুকনো চিড়া আর বিস্কুট দিয়ে নাস্তা সেরেছে সবাই। দুপুরের রান্না রাতসহ কাল দুপুর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে হবে।

খাদিজা বেগম জানালেন, ‘নলকুপ ডুবি গেইছে। সেই পানি সবাই খাবার নাগছি। পায়খানা তলে গেইছে বয়ষ্ক মানুষ আর বউ-ঝিদের খুব সমস্যা হইছে।’

আব্দুল হক সাহেব জানালেন, ‘বাড়ীর পাঁচহাত কাছেই দুধকুমর নদী। নৌকা চলাচল করায় সেই ঢেউয়ে ঘরের বেড়া-ধারিয়া ভাঙ্গি যাইতেছে। থকথকা কাদোর উপর খাট রাখছি শুতলে ভয় হয় কখন খাট ভাঙ্গি পরি যাই। কোন রকমে রাইতটা পার করি।’

পাশাপাশি এরশাদুল, শুক্কুর, জব্বার আর বাচ্চুর বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি ১০ থেকে ১২দিন ধরে পানিবন্দী। শুক্কুরের স্ত্রী রোশনা (৩২) ছোট সিলভার কার্প মাছ রান্না করছিলেন। তিনি জানালেন, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ৬ জনের সংসার। স্বামী গরু কেনাবেচা করে সেই লাভের টাকায় সংসার চালান। এখন বন্যা হওয়ায় গরর আমদানি কমে গেছে।

ফলে পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলার বড়বাড়ী হাটে গিয়েছেন। সন্তানসহ তিনি রান্নায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। তার ছেলে আব্দুল রশীদ (৯) ও সৈয়দ রাসেলকে (৭) প্রশ্ন করা হলে তারা জানায়, ‘বিয়ানোত বিস্কুট খাইছি। মেলাদিন থাকি গোস্ত খাই না। খুব খাবার মোনায়।’

রোশনার প্রতিবেশী খাদিজার (৩০) বাড়ি কিছুটা উচু। উঠোন ভর্তি পানি। ঘরগুলোতে এখনো পানি ঢোকেনি। দুটো গরু ছিল নুরানী-ফারাজিপাড়া সড়কে রাখা হয়েছে।

খাদিজা বলেন, গরুর খাদ্য নিয়া খুব দুশ্চিন্তায় আছি। হামরায় খাবার পাই না। গরুর খাবার কিনি কেমনে। গরু দুটা শুকি যাবার নাগছে। ‘বেটিটা পানিত সারাদিন ডুবি থাকি জ¦র হইছে। টেবলেট কিনিও দিবার পাবার নাগছি না। চারপাকে পানি বেড়ালেই কাপড় ভিজি যায়। সেই ভিজা কাপড় পরি সারাদিন চলাফিরা করি। বাড়ি বাড়ি সর্দি-কাশি ধরছে। ডাক্তারও পাওয়া যায় না। একেবারে যাত্রাপুর হাটোত গিয়ে অষুধ কিনি আনা নাগে।’

এই এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়িতে পানি উঠেছে। অনেকে রাতে সড়কে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেই সড়কেও নেই নলকুপ ও লেট্রিনের ব্যবস্থা। ফলে বানভাসি মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর জানান, আমার ইউনিয়নে ১৫০০ বাড়িতে পানি উঠেছে। পানিবন্দী হয়েছে আরও ৪ হাজার পরিবার। সকল পরিবারকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়নি। আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাসেদুল হাসান জানান, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। জনপ্রতিনিধিগণের চাহিদা মোতাবেক আমরা সরবরাহ করছি। ইতিমধ্যে সদর উপজেলায় ভাঙন কবলিত ৯৪টি পরিবারের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১৭ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রশাসন প্রতিদিন দুর্গম এলাকায় গিয়ে বন্যা কবলিতদের খোঁজ খবর নিচ্ছে এবং জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শুকনো খাবার বিতরণ করছে।

আরও পড়ুন: ডাক্তার দেখাতে এসে ট্রলি চাপায় বৃদ্ধা নিহত

এদিকে, কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বুধবার বিকেল ৩টার সময় অনুযায়ী গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপূত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে ৫১ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে ১৪ সেন্টিমিটার এবং ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে এক সেন্টিমিটার কমে গিয়ে ৩৯ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ওডি/এমকেএইচ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড