• শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কঠিন পরিশ্রম করেও মিলে না সুখ, অভাবই নিত্যসঙ্গী 

  ওবায়দুল কবির সম্রাট, কয়রা (খুলনা)

৩১ মে ২০২২, ১৭:৪৯
কঠিন পরিশ্রম করেও মিলে না সুখ, অভাবই নিত্যসঙ্গী 
উপকূলের জেলে নৌকা (ছবি : অধিকার)

ঋণ বা দাদনের জালে অনেকটাই বন্দি হয়ে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। সারামাস কষ্ট তাদের হলেও তারা সুখের মুখ দেখতে পারেন না। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার থাকবে না। এ কারণে সংসার চালাতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে জেলেরা হাত পাতছেন বিভিন্ন এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ী (কোম্পানি নামধারী) নামের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে।

ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করলেও পরবর্তী সময়ে যা আয় করছেন তা দিয়ে চালাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি। আর অসাধু কোম্পানি ব্যবসায়ী এ সুযোগে ফায়দা লুটে নেন। এতে সারাবছর তাদের আয়ের একটা পথ তৈরি করে নেন। ঋণ-দাদনের কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে বাড়তি কোনো টাকা আর সঞ্চয় রাখতে পারছেন না। ফলে ঘুরেফিরে কঠিন পরিশ্রম করেও সংসারে আসে না সুখ, অভাব লেগেই থাকে।

সরেজমিনে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সুন্দরবনবেষ্টিত নদীকেন্দ্রিক জেলা খুলনার উপকূলীয় এলাকা কয়রা ঘুরে জানা যায়, নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর জেলেরা হতদরিদ্র। তারা সুন্দরবনের মৎস্য শিকারের উপর তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। জীবিকার প্রয়োজনে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয় তাদের। তবে জেলেদের কষ্টের আয়ের প্রায় সবটাই চলে যায় দাদন ব্যবসায়ীদের (কোম্পানি) পকেটে।

এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মামলার শিকার হতে হয় ওই জেলেদের, সেটাও ওই অসাধু ব্যবসায়ীদেরকে খুশি করতে অভয়ারণ্যে বা বন্ধের সময় মাছ ধরতে গিয়ে; তবে তার দায়ভার ও মামলা চালানোর সকল খরচ জেলেদেরই বহন করতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়রা উপজেলা চারপাশে নদী ও সুন্দরবনবেষ্টিত, উপজেলা ৪নং কয়রা, ৫নং কয়রা, ৬নং কয়রা, তেঁতুলতলার চর, চৌকুনী, গিলা বাড়ি, হাতিয়ার ডাঙ্গা, ভাগবা, সুতির অফিস, কাটকাটা, গাজি পাড়া, আংটিহারা, গোলখালী, মাটিয়াভাঙ্গা, চরামুখা, জোড়শিং এসব গ্রামের ৭০ শতাংশ লোক নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। জেলেরা সারাদিন ও রাতে মাছ ধরে কয়রা বাজার মৎস্য আড়ৎ, হোগলা মৎস্য আড়ৎ, চাঁদ আলী মৎস্য আড়তে বিক্রি করেন।

কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলেরা হতদরিদ্র। মাছ ধরার জাল, নৌকা ও ট্রলার কেনার জন্য উপজেলার আড়ৎদার ও মহাজনদের কাছ থেকে প্রতিবছর ঋণ নেন তারা। স্থানীয় ব্যক্তিরা একে দাদন ব্যবসা বলেন। জেলেরা যে পরিমাণ টাকা দাদন নেন, প্রতিদিন সেই টাকার ১৫ শতাংশ দাদন ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। পাশাপাশি জেলেদের নিজ নিজ দাদন ব্যবসায়ীর আড়তে এনে মৌখিক নিলামে মাছ বিক্রি করতে হয়। আর নিলামে ওঠার আগেই জেলেদের মজুত মাছের এক-দশমাংশ আড়তদার সরিয়ে রাখেন। সরিয়ে ফেলা মাছ পরে আবার নিলামে তুলে বিক্রি করা হয়।

বিভিন্ন সময় সদরের, আমাদী, গিলাবাড়ী মৎস্য আড়তে গিয়ে দেখা যায়, জেলেরা নিজ নিজ দাদন ব্যবসায়ীর আড়তে এনে মাছ তুলে থাকেন। মাছ আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে আড়তের লোকজন নির্দিষ্ট পরিমাণ মাছ নিজেদের আয়ত্ত্বে নিচ্ছেন। এরপর বাকি মাছের নিলাম করছেন। নিলামে তোলার পর মোট টাকা থেকে ১০-২০ টাকা হারে দৈনিক সুদ কেটে নেওয়া হচ্ছে।

জোড়শিং গ্রামের জেলে আবুল বাসার বলেন, আড়তদার ও কোম্পানিদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও টাকা নিয়ে নেন, প্রথমে মাছ, এরপর নগদ টাকা কেটে নেন। এভাবে মাছ বিক্রির অর্ধেক টাকা তাদের পকেটে চলে যায়। এ কারণে দিনরাত পরিশ্রম করেও আমাদের সুখ আসে না, সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে।

কয়রা সদরের মৎস্য আড়তের আড়তদার সাইফুল্লাহ বলেন, ‘উপজেলায় কয়েক হাজার জেলে আছে। প্রায় সব জেলে আমাদের কারও না কারও কাছ থেকে অথবা কোম্পানির কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ ধরেন। আমরা কাউকে জোর করে দাদনের টাকা দেই না। জেলেরা গরিব। নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসে তারা টাকা নেন। সারাদেশের মতো একই নিয়মে আমরা জেলেদের কাছ থেকে মাছ ও টাকা আদায় করি।’

৫নং কয়রা ও ৬নং কয়রা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দুপুরের খাওয়া শেষে ঘুমাচ্ছেন। আবার অনেকে ছোট মাছ ধরার জাল বুনছেন। কেউ কেউ নদীতে মাছ ধরতে গেছেন।

৫নং কয়রা গ্রামের জেলে সোয়েব আলী বলেন, দাদন ব্যবসা ও মহাজনের কবলে পড়ে এ গ্রামের জেলেরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। আর প্রতিদিন মাছ নিয়ে আড়তে না গেলে আড়তদারদের লোকজন বাড়িতে এসে জেলেদের অনেক বড় কথা ও অনেক সময় মারধরও করেন।

৬নং গ্রামের জেলে রজব আলী বলেন, ‘সরকারই পারে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে। নতুবা আমাদের অভাব কোনো দিন শেষ হবে না।’

আরও পড়ুন : দুধ খেয়ে পৌনে ৭ লক্ষ টাকা খোয়ালেন প্রেসক্লাব সভাপতি

কয়রা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেন, ‘আমরা একাধিকবার চেষ্টা করেও জেলেদের দাদন ব্যবসা থেকে দূরে রাখতে পারিনি। জেলে কার্ডের মাধ্যমে জেলেদের যে সুবিধা দেয়া হয়, তা সামান্য। সরকারিভাবে প্রণোদনা ও জেলেদের জন্য সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা হলে হয় তো দাদন ব্যবসা বন্ধ হবে, সাথে সাথে জেলেদের জীবনমানের উন্নয়নও হবে।’

ওডি/এমকেএইচ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড