• বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নারায়ণগঞ্জে নিজস্ব কার্যালয়হীন ১১ দফতর

  তুষার আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

২৫ মে ২০২২, ২০:৩৩
নিজস্ব কার্যালয় নেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয়ের
নিজস্ব কার্যালয় নেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয়ের (ছবি : অধিকার)

নারায়ণগঞ্জে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক ১১টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কার্যালয় নেই। এমনকি ভাড়ায় বা ভাসমান অবস্থায় রয়েছে আইন প্রয়োগকারী কয়েকটি দফতরের কার্যালয়ও। আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে পরিচালিত ওই সকল কার্যালয়গুলোতে অবকাঠামোগত সুবিধা পর্যাপ্ত নেই। ভবন ও কক্ষগুলো আবাসিক নকশায় তৈরি হওয়ায় অবকাঠামোগত জটিলতা বা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দেখা দিয়েছে মোটা দাগে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দাফতরিক কার্যপরিচালনায় বেগ পেতে হচ্ছে। এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা।

এদিকে, নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় ব্যক্তিমালিকানা ভবনগুলোতে অবস্থিত দফতরগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত পরিবেশ অধিদফতর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, জেলা ক্রীড়া অফিসারের কার্যালয়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, সমাজ সেবা অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ও জেলা আয়কর অফিস কার্যালয় ব্যক্তি মালিকানা ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে ভাড়ায় পরিচালিত হওয়া এসব দফতরের নিজস্ব জমি নেই। তাই জায়গা সংকটের কারণে নিজস্ব কার্যালয় গড়ে তোলা যাচ্ছে না। অথচ নিজস্ব জায়গা থাকা সত্বেও কার্যালয় হয়নি- এমন উদাহরণও রয়েছে নারায়ণগঞ্জে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি ওই দফতরগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানা ভবনে ভাড়ায় পরিচালিত হওয়ায় মাসে প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকার উপরে ভাড়া গুণতে হচ্ছে। বছরে এর অংক দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় এভাবেই বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে কার্যালয় ভাড়ার খাত হিসেবে। নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত কার্যালয় ভাড়া ব্যয়ের এই আর্থিক হিসেব ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সরকারের ওই দফতরগুলোর নিজস্ব কার্যালয় না থাকাটা দৃষ্টিকটু বলে মনে করছেন সচেতনমহল। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় ১১টি সরকারি দফতরের নিজস্ব কার্যালয় না থাকাটা দৃষ্টিকটু। সরকারের প্রচেষ্টায় যেখানে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হচ্ছে দেশ সেখানে সরকারেরই গুরুত্বপূর্ণ ১১টি প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জে অবকাঠামোগত দিক থেকে পিছিয়ে! এতে দফতর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও প্রকাশ করেছেন সচেতনমহল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাড়ায় পরিচালিত হওয়া এসব প্রতিষ্ঠান জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ফতুল্লার ‘মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ার’ ও ইসদাইর এলাকার ফরিদা ভবন অন্যতম। ‘মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ার’ ভবনটি ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকায় অবস্থিত। লিংক রোডের পূর্বপার্শ্বে ৯ তলা বিশিষ্ট ওই ব্যক্তিমালিকানা ভবনটি অনেকের কাছেই সরকারি ভবন হিসেবেও পরিচিত! কারণ, ব্যক্তিমালিকানা এই ভবনে রয়েছে একে একে ৭টি সরকারি অধিদফতর!

এগুলো হলো- পরিবেশ অধিদফতর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিস, ক্রীড়া অফিসারের কার্যালয় ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো অফিস।

তাছাড়া, ইসদাইর এলাকার ফরিদা ভবনে রয়েছে- জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর ও নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর। ওই ভবন দুটি উল্লেখিত দফতরগুলোর সাইনবোর্ডে ছেয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে সরকারি কমপ্লেক্স বলে মনে হলেও আদতে তা ব্যক্তিমালিকানা ভবন।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ‘মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ার’ ভবনের ৪র্থ তলায় পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয় অবস্থিত। ২০১৪ সাল থেকে ওই স্থানে দফতরটি ভাড়ায় পরিচালিত হলেও এর আগে ২০১১ সাল থেকে তা ছিলো ইসদাইর এলাকার ফরিদা বিল্ডিংয়ে। মাসে ৬০ হাজার ৬শ ৫ টাকা ফ্লোর ভাড়া গুণছে পরিবেশ অধিদফতর। একই ভবনের ৫ম তলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এর কার্যালয়।

জানা গেছে, ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জে জেলা ভিত্তিক দফতর প্রতিষ্ঠালাভ করে। দীর্ঘ ৩১ বছর যাবৎ এই দফতরটি ব্যক্তি মালিকানা ফ্লোর ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তন্মধ্যে ২০১৬ সাল থেকে মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ারে চলছে এই দফতরটির কার্যক্রম। যার মাসিক ভাড়া ২৮ হাজার ৫শ টাকা। এর আগে ফরিদা ভবনে ফ্লোর ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ ওই দফতরের জেলা কার্যালয়।

অন্যদিকে, ১৯৯৮ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জে ব্যক্তিমালিকানা ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়। বিগত সময়ে বিভিন্ন ভবনে ভাড়ায় থাকলেও সবশেষ ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চলছে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম। প্রতিমাসে ওই ফ্ল্যাট ভাড়ার ৫৯ হাজার টাকা প্রদান করতে হচ্ছে।

একই ভবনের ৬ষ্ঠ ও ৭ম তলায় দুটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসের কার্যক্রম। একই ফ্লোরে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা এবং জেলা অফিসের কার্যালয়। ২০১৬ সাল থেকে ওই ভবনে অবস্থিত পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসের মাসিক ভাড়া বর্তমানে ২৬ হাজার টাকা।

জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় একই ভবনের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলার ২টি ফ্ল্যাটে অবস্থিত। ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে মা আমেনা স্বপ্ন টাওয়ারের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের কার্য পরিচালিত হচ্ছে। দু’জন কর্মকর্তাসহ মোট ৩২ জন সদস্য নিয়ে পরিচালিত হওয়া দফতরটির ২টি ফ্ল্যাট ভাড়া ৩৬ হাজার ৩শ টাকা। তথ্য বলছে, এর আগে শহরের চাষাঢ়ায় অবস্থিত সমবায় মার্কেটে ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

ভবনটির ৮ম তলায় অবস্থিত জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো অফিস ও জেলা ক্রীড়া অফিসারের কার্যালয়। এর মধ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো অফিসের মাসিক ভাড়া ১৫ এবং জেলা ক্রীড়া অফিসারের কার্যালয়ের ভাড়া ১৪ হাজার টাকা। ইসদাইরস্থ ফরিদা ভবনে অবস্থিত জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর ও নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের ফ্লোর ভাড়াও নেহাত কম নয়।

নিজস্ব কার্যালয় না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন দৈনিক অধিকারকে বলেন, ‘নিজস্ব ভবন না থাকায় এখানে অনেক কিছুরই অভাব রয়েছে। যেমন গবেষণাগার নেই, আইন বিভাগ নেই। যেগুলো অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। একটি প্রজেক্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। ওই প্রজেক্টের আওতায় প্রতিটি জেলায় নিজস্ব অফিস কার্যালয় গড়ে তোলা হবে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

এদিকে, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মামুন এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘মাদক মামলার আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে তাদের কোন সেল বা লকাপ নেই। বর্তমান ভাড়াকৃত ভবন আবাসিক নকশায় তৈরি। এ জন্য দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরির কক্ষ নেই। নিজস্ব কার্যালয় থাকলে প্রয়োজনীয় নকশা অনুসারে কক্ষগুলো স্থাপন হতো।’

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের প্রোগ্রামার অফিসার আঞ্জুমান আরা দৈনিক অধিকারকে বলেন, ‘আমাদের বড় হলরুম নেই। যা কার্যপরিচালনার জন্য খুবই জরুরি। নিজস্ব কার্যালয় থাকলে পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে হলরুম করা যেতো। আর বর্তমান ভাড়া নেয়া কার্যালয়টি ভালো জায়গায় পড়েনি। এক্ষেত্রে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, নিজস্ব কার্যালয় না থাকা দফতরগুলোর জন্য সম্মিলিত সরকারি ভবন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন দৈনিক অধিকারকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ জেলা ও উপজেলাগুলোতে সরকারি দফতরগুলোর জন্য সমন্বিত অফিস ভবন করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে জায়গা নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। প্রকল্প পাশ হলেই কাজ শুরু করা যাবে।’

আরও পড়ুন : উপকারী জলকপাট এখন মরণফাঁদ!

এদিকে অবকাঠামোগত জটিলতা নিয়েও পরিচালিত হওয়া সরকারের ওই ১১ দফতরের কর্মকর্তারা এখনো স্বপ্ন দেখছে নিজস্ব কার্যালয়ের। সেই স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

ওডি/এএম

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড