• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ভূমি অফিসের ঘুস লেনদেনের ভিডিয়ো ফাঁস

  এস এম শাহেদ হোসাইন ছোটন, বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম)

২৫ মে ২০২২, ১৩:০৮
ভূমি অফিসের ঘুস লেনদেনের ভিডিয়ো ফাঁস
ভিডিয়ো ফাঁস। ছবি : অধিকার

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস চলাকালীন সময়ে ঘুস লেনদেনের ভিডিয়ো চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়েছে বোয়ালখালী উপজেলা জুড়ে।

৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বোয়ালখালী উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো, নাজির সার্ভেয়ার, তহসিলদার, অফিস সহকারী, পিয়ন সবাই ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নামজারি, মিস কেস, মিস আপিল, সার্ভে রিপোর্ট, চান্দিনা ভিটা, এমপি কেস, খাস জমি বন্দবস্তি, ভিপি খাজনা দাখিলা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ঘুসের টাকা প্রকাশ্যে নিচ্ছেন তারা।

চলতি বছরের মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) শাকপুরা ইউনিয়নের ঘোষখীল এলাকার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন বোয়ালখালী ভূমি কর্মকর্তার কাছে ভূমি অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগের সঙ্গে তিনি ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের টাকা লেনদেনের একাধিক ভিডিও চিত্র দিয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোসলেম উদ্দিন গোপনে বোয়ালখালী উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুস লেনদেনের ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। ভূমি অফিসে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের এখনো বোয়ারখালী ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বোয়ালখালী ভূমি অফিসের জারিকারক কর্মকর্তা কাজি মোতাহের যিনি ভূমি অফিসের নামজারির নোটিশ জারি করেন।চিত্রে দেখা যায় ভূমি অফিসে আসা এক সেবাগ্রহীতার হাত থেকে গুনে টাকা নেওয়ার পর ফাইল লিখছেন। স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ মোতাহেরকে প্রতি ফাইলে ৫শত টাকা করে দিতে হয়।

এর পর ভিডিও চিত্রে দেখা যায়,বোয়ালখালী ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ক্লিনটন চাকমা ভূমি অফিসে আসা সেবাগ্রহীতার হাত থেকে ৫শত টাকার নোট গুনে নিচ্ছেন।

ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বোয়ালখালী ভূমি অফিসের অফিস পিয়ন বেবীদে সেবাগ্রহীতার হাত থেকে একাধিক ৫শত টাকার নোট নিচ্ছেন। এ সময় বেবী দে অফিস সহকারী মো. মুছার কক্ষে বসে ফাইলপত্র নিয়ে কাজ করছেন। তবে টাকা নেওয়ার সময় মুছা কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। সেবাগ্রহীতার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নামজারি ফাইল জমা দেওয়ার সময় পিয়ন বেবী দে ও ফরহাদকে প্রতি ফাইল ৫শত টাকা করে দিতে হয় । বোয়ালখালী ভূমি অফিসের অফিস সহকারী মুছাকেও সেবাগ্রহীতার হাত থেকে টাকা নিতে দেখা যায়।

চিত্রে দেখা যায়, বোয়ালখালী ভূমি অফিসের উপ সহকারী কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস ও সঞ্জিত চক্রবর্তীকেও ভূমি অফিসে আসা সেবাগ্রহীতার হাত থেকে টাকা নিচ্ছেন।

সেবাগ্রহীতার একাধিক সূত্রে জানা যায়, ভূমি অফিসের দালাল ও টাকা ছাড়া কোন কাজ করেন না ইদ্রিস। তার কাছে কোন ফাইল গেলে নির্ধারিত দালালের মাধ্যমে ফাইল জমা দেওয়ার জন্য বলেন তিনি।

চিত্রে আরও দেখা যায়, বোয়ালখালী ভূমি অফিসের সহকারী সমীর কান্তি চক্রবর্তী এখন ভূমি অফিসের নাজিরের দায়িত্বে রয়েছেন। সেবাগ্রহীতার হাত থেকে তাকেও টাকা নিতে দেখা যায় । সেবাগ্রহীতার একাধিক সূত্রে জানা যায়, নাজির সমীর কান্তি ও পিয়ন বেবী দে দু’জনের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের হাতে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বোয়ালখালী ভূমি অফিসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে (১৫-২০ ) জনের শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট।দালালদের অনেকেই ভূমি অফিসের ভিতরে চেয়ারে বসে কাজ করে। ভূমি অফিসের সব ধরনের কাজ নিজ হাতে করতে তাদের কোনো বাধা নেই। এ কারণে সাধারণ মানুষ ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অফিসার ও দালালদের আলাদা করতে না পেরে প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন। ভিডিয়ো চিত্রে দুই দালালকে কর্মচারীদের পাশে চেয়ার পেতে বসে থাকতে দেখা যায়। তাদের একজনের নাম আবুল বশর।

ফাঁস হওয়া ভিডিও চিত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাহমিনা আকতার বলেন, ভূমি অফিসের সকল কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আর কোনো অভিযোগ ওঠলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পাওয়ার পর থেকে আনসার নিয়োগ করে অবাঞ্ছিত লোক ও অপরিচিত লোকের ভূমি অফিসে আনাগোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফাঁস হওয়া ভিডিয়ো চিত্র দেখে, বোয়ালখালী ভূমি অফিসের কর্মচারীদের ঘুস লেনদেন ও ভূমি অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে সোমবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ছদ্মবেশে ভূমি অফিসে আসেন। ছদ্মবেশ ধারণ করে ভূমি অফিসে আসা সেবা প্রত্যাশীদের সাথে বাইরে বসে তথ্য সংগ্রহ করেন।ছদ্মবেশে জেলা প্রশাসক ভূমি অফিসের সকল কর্মচারীদের কক্ষের সামনেও হাঁটাহাঁটি করেন।

জেলা প্রশাসক দীর্ঘক্ষণ ভূমি অফিসে অবস্হান করার পরেও ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা তাকে চিনতে পারেনি। এক পর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে জেলা প্রশাসক মুমিনুর রহমান বোয়ালখালী সহকারী কমিশনার( ভূমি) তাহমিনা আকতার ও ভূমি অফিসের অন্যান্য কর্মচারীদের সাথে কথা বলেন এবং ভূমি অফিসের সকল কর্মচারীদের সার্ভিস বই নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান জেলাতে ফিরে আসেন।

ওডি/ওএইচ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড