• বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

যুদ্ধ দ্রব্যমূল্যে প্রভাব ফেলেছে: বাণিজ্য সচিব

  হারুন আনসারী, ফরিদপুর

২১ মে ২০২২, ২১:৪১
যুদ্ধ দ্রব্যমূল্যে প্রভাব ফেলেছে: বাণিজ্য সচিব
ফরিদপুরের এক মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ (ছবি: অধিকার)

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেছেন, শুধু মানুষ না এখন গাড়িও সয়াবিন তেল খাচ্ছে। বিশ্বে বায়ো ফুয়েলের চাহিদা তৈরি হওয়ায় ব্রাজিল এখন গাড়ির জ্বালানি হিসেবেও সয়াবিন তেল ব্যবহার করছে। এ জন্য তারা সয়াবিন রফতানি কমিয়ে দিয়েছে। আবার করোনার পর সব পোর্ট যখন খুলে যায় তখন তারা রেন্টও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের সব-কটি বড় কন্টেইনার কোম্পানি তাদের কন্টেইনারের ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই যে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বন্ধ, যুদ্ধ এই সবই প্রভাব ফেলছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে।

শনিবার (২১ মে) দুপুরে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়ার প্রসঙ্গে সিনিয়র এই বাণিজ্য সচিব বলেন, দ্রব্যমূল্য আসলেই বেড়ে গেছে অনেকগুলো পণ্যের। আমাদের অনেকেরই কষ্ট হচ্ছে। এজন্য সরকার টিসিবির মাধ্যমে এককোটি পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে তেল, চিনি ও ডাল দিয়েছে রোজার সময়। আগামী জুনের মধ্যে পাঁচ কোটি মানুষকে টিসিবি পণ্যের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

তপন কান্তি ঘোষ বলেন, এতোদিন বাজার থেকে কিনে ভর্তুকি মূল্যে সরকার জনগণের মাঝে টিসিবির পণ্য বিক্রি করতো। এখন সরকার সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে ওই পণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আমাদের ভর্তুকির পরিমাণ কমে যাবে। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।

তিনি আরও বলেন, তিনি বলেন, দেশে পণ্য মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। দাম একটু দাম বাড়লে তাই এক্ষেত্রে আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। আমাদের যেটি ইমপোর্ট করে খেতে হবে সেটি একটু বেশি দামেই খেতে হবে। সরকার সার্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্য ভান্ডার উল্লেখ করে বাণিজ্য সচিব বলেন, মার্চে তেলের মূল্য নির্ধারণ করার পর ব্যবসায়ীরা আপত্তি তুলেছিলেন। আমরা রোজার জন্য বলেছিলাম ঈদের পরে বিষয়টি ঠিক করে দেবো। তারা সেই সুযোগ নিতে ঈদের আগে পরে তেল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছিলো। সোমবার থেকে পামঅয়েলের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে পামতেলের বাজারে এর প্রভাব পড়বে। তবে সয়াবিনের বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না।

দেশে সম্প্রতি তেল মজুদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু ব্যবসায়ী খারাপ কিন্তু সব ব্যবসায়ী খারাপ না। এবার যেভাবে বোতল কেটে তেল বিক্রি করা দেখলাম এটিতো মিল মালিক বা বড় ব্যবসায়ীরা করেনি।

আশির দশকে দেশের মানুষ রান্নাবান্নায় সরিষার তেল ব্যবহার করতো উল্লেখ করে সিনিয়র বাণিজ্য সচিব বলেন, এখন সবাই সয়াবিন তেল ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সরকার বিকল্প ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরতে চিন্তাভাবনা করছে। এজন্য সরিষা, বাদাম, তেল, তিশি, রাইস ব্রান্ডের তেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তিনি রাইস ব্রান্ড তেলের সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে দেশে বর্তমানে মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টন রাইস ব্রান্ডের তেল উৎপাদন করা হয়। এই পরিমাণ বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন করা যাবে বলে গবেষকরা মনে করেন। আবার উৎপাদনের ক্ষেত্রে দক্ষতা একটি ব্যাপার। অনেক পণ্য আছে আমরা উৎপাদন করি কিন্তু বাইরের দেশ তারচেয়ে কম দামে দিতে চায়। এমন একটি পন্য গরুর মাংস আমদানি। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা সহ কিছু দেশ আমাদেরকে কম দামে এই গরুর মাংস দিতে চায়। সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি গরুর মাংস সাড়ে ৩শ’ থেকে চারশো টাকায় পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ভোক্তারা উপকৃত হবেন। কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশের ক্ষুদ্র চাষিরা এই গরু পালন করে স্বাবলম্বী হন তাই তাদের কথা বিবেচনা করে সরকার গরুর মাংস আমদানি করে না।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) দীপক কুমার রায়ের সভাপতিত্বে সভায় সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) জামাল পাশা বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। কিছুদিনর পরপরই দেখা যায় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফসলের মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকের লাভ হলে ভাল কথা কিন্তু এখানে দেখা যায় অসৎ ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, বর্তমানে পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে। মোটা চালের দাম একটু বেশি হলেও ঠিক আছে। বাজার মূল্যের সাথে সঙ্গতি না থাকায় ধান চাল সংগ্রহ অভিযানে কিছু সমস্যা হয় বলে তিনি জানান।

জেলা বাজার বিপণন কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন সভায় জানান, সয়াবিন তেলের নির্ধারিত মূল্য ১৮২ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৯২ টাকা দরে। পাম অয়েলের নির্ধারিত মূল্য ১৭২ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা দরে। বাজারে বোতলজাত তেলের চেয়ে খোলা তেলের দাম বেশি।

ফরিদপুর চেম্বারের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। ব্যবসা অত্যন্ত সম্মানর জিনিষ। এটি প্রতারণার বিষয় না। দুই একটি কোম্পানি বাজারের ভোজ্য তেল নিয়ন্ত্রণ করে বলেই তারা কারসাজি করেছে।

তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানের বিষয়ে বলেন, আপনাদের যে জরিমানা করে ছেড়ে দেয় এটি আপনাদের ভাগ্য। সামনে মাজায় দড়ি পড়াবে কিনা বলতে পারছি না।

চকবাজার বণিক সমিতির সভাপতি মাসুদুল হক বলেন, ঈদের আগে ও পরে ব্যবসায়ীদের কাছে তেল ছিল। কিন্তু দেশের কিছু বড় তেল কোম্পানি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। কোম্পানিগুলো সরকারের সাথে অগ্রীম দর কষাকষি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর উপরে ভর্তুকি প্রদান ও মজুদ গড়ে তোলার অনুরোধ জানান।

জেলা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্বাচিপের সভাপতি ডা. আব্দুল জলিল সভার শুরুতেই ফ্লোর নিয়ে বলেন, আমরা যারা আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত তারা পাবলিকের কাছে এবং বাড়ির লোকের কাছেও ভীষন অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেছি। এভাবে হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাবে ভাবিনি। হাজার হাজার লিটার তেল জব্দ হচ্ছে অথচ এর কোন প্রভাব পড়ছে না বাজারে। আমাদের ক্লিনিকের সরঞ্জাম আমদানি করতে হয় চীন থেকে। এগুলোর দামও বেড়ে গেছে। এখন মেডিকেল টেস্টের খরচও বেড়ে যায় তাহলে পরিস্থিতি কি হবে? আমাদের তো পাবলিকের কাছে জবাব দিতে হয়।

ফরিদপুর ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর কাশেম আলী গোখাদ্যের মূল্য বৃদ্ধির বিষয় তুলে ধরে বলেন, একমাস আগে ১২শ’ টাকায় যেই ফিডের বস্তা কিনেছি তার দাম এখন ১৯শ’ টাকা। প্রাণ এবং আড়ং তাদের নিকট থেকে ৪২ টাকায় দুধ কিনে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করছে উল্লেখ করে বলেন, তারা যেনো আমাদের দুধের দাম বাড়িয়ে দেয়।

পাওয়ার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সোহেল শেখ। তিনি বাজারের পূর্বেকার ও বর্তমান দর তুলে ধরে জানান, জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩১টি অভিযান চালিয়ে ২৬০টি প্রতিষ্ঠানে ১৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এ সময়ে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ৮৮টি অভিযানে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে।

আরও পড়ুন: মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধের মৃত্যু

মতবিনিময় সভায় সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক অসীম কুমার সাহা, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, সরকারী ইয়াছিন কলেজের অধ্যক্ষ শীলা রানি, ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী, অধ্যাপক রেজভি জামান, সাংবাদিক পান্না বালা, আসমা আক্তার মুক্তা প্রমুখ অংশ নেন। তারা ভোক্তা পর্যায়ে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কার্যকর ভুমিকা রাখার জোর দাবি জানান।

ওডি/এমকেএইচ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড