• বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হুমকিতে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ৬০ কোটির বিনিয়োগ

  মো. নুরুল করিম আরমান, লামা

০৮ মে ২০২২, ১৮:৫২
লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের বিরোধকৃত জমি
লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের বিরোধকৃত জমির একাংশ। (ছবি : অধিকার)

বান্দরবানের লামায় রাবার প্লটের পাহাড়ি জমি দখলে নিতে বাগানে আগুন ও নানারকম হয়রানির অভিযোগ উঠেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তুলেছেন লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ও বাংলাদেশ রাবার গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘বান্দরবান জেলা প্রশাসন থেকে আমরা রাবার প্লট লিজ পাওয়ার পর কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বাগান সৃজন করে আসছি। ১৬শ একর জমির মধ্যে ইতিমধ্যে ১৪শ একর জমিতে রাবার বাগান সৃজন করেছি। এ বাগান থেকে উৎপাদনও হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বাকি ৪০০ একর জমিতে রাবার বাগান সৃজন করতে গেলে ২০১৬ সালে হঠাৎ ভাসমান কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই জমি তাদের বলে দাবি তোলেন। প্লটের শেষ মাথায় ৯-১০টি বাঁশের ঘর নির্মাণ করেন তারা।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, চেয়ারম্যান- এমনকি বান্দরবান জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করি। লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের জমি দখলের চেষ্টা, গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া, মিথ্যা অভিযোগ তুলে হয়রানি ও হুমকির ঘটনায় সাংবাদিকরা সরেজমিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশ করেন।’

কামাল উদ্দিন বলেন, ‘সবশেষ গত এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে আমরা শ্রমিক লাগিয়ে বাগান সৃজন করার জন্য জঙ্গল পরিষ্কার করি। লাংকম স্ম্রোং ও মৌজা হেডম্যান যোহন ত্রিপুরার নেতৃত্বে গুটিকয়েক নৃ-গোষ্ঠী গত ২৬ এপ্রিল কাটা জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। মামলায় আমাকে ১নং ও অন্য এক পরিচালকসহ ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার সূত্র ধরে ইদের আগে কোম্পানির ম্যানেজারসহ দুইজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাবার প্লটের জমি জবর দখলের চেষ্টায় একের পর এক অযথা হয়রানির কারণে আমরা বিনিয়োগকারীরা হুমকির মুখে আছি। মোট কথা ভাসমান মুরুং ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে। তাই রাবার কোম্পানির ম্যানেজারসহ শ্রমিক ও বাগানের নিরাপত্তা প্রদান এবং দখল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাগান সৃজনে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’

এদিকে জমি দখল ও বেদখলকে কেন্দ্র করে কোম্পানি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো মুহূর্তে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয় সচেতন মহলের।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি নীতিমালা অনুসারে লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ৩০১ নং সরই ও ৩০৩ নং ডলুছড়ি মৌজায় ২৫ একর করে ৬৪ ব্যক্তি মালিকানায় ১৬শ একর পাহাড়ি জমি লিজ নিয়ে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন সমন্বিত রাবার চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প। লিজকৃত ওই জমিতে রাবার বাগানের পাশাপাশি ফলদ আম, জলপাই, লিচু, জাম্বুরা ও বনজ গাছও সৃজন করা হয়।

দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে রাবার ও ফলদ বাগানে উৎপাদনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর এ রাবার বাগান থেকে প্রায় ১০০-১২০ টন সাদা সোনা নামে খ্যাত কাঁচা রাবার উৎপাদন করে দেশে রাবারের চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে এ প্রতিষ্ঠানটি। একই সাথে উৎপাদিত রাবার হতে আর্থিক যোগানে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকায় বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটিতে স্থানীয় শতাধিক বেকারের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখিত রাবার বাগানগুলোর খাজনাও পরিশোধ রয়েছে।

অভিযুক্ত মৌজা হেডম্যান যোহন ত্রিপুরা, লাংকম ত্রিপুরা ও জন ত্রিপুরা বলেন, ‘লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের লোকজন যে জমিগুলো পরিষ্কার করছেন কিংবা আগুন দিয়েছেন মূলত সে জমিগুলো লাংকম কারবারি পাড়া, জয়চন্দ্র ত্রিপুরা কারবারি পাড়া ও রেংয়েন স্ম্রোং কারবারি পাড়াবাসীর। যুগ যুগ ধরে ওই জমিগুলোতে জুম চাষ ও বাগান সৃজনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কোম্পানি কর্তৃক জমি দখল চেষ্টার ঘটনায় প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘সবশেষ গত ২৬ এপ্রিল কোম্পানির লোকজন এ জমি দখলে নিতে আমাদের একমাত্র জীবিকার উৎসে আগুন লাগিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করেছে। এতে পাড়ার লোকজন খাদ্য সংকটে ভুগছেন। আমাদের দাবি তিন পাড়ার ৩৯ পরিবারকে ৪০০ একর জমি ছেড়ে দিতে হবে।’ স্থানীয় ইউপি সদস্য আশ্রাফ আলী ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ত্রিপুরা ও মুরুং সম্প্রদায় কখনও একসাথে বসবাস করে না। এখানে তারা যৌথভাবে রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষয়ক্ষতি ও জমি জবর দখল করার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে হঠাৎ করে বিভিন্ন স্থান থেকে এসে পাড়া স্থাপন শুরু করে। বর্তমানে জমি নিয়ে কোম্পানি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে সরই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘১৯৯৩ সাল থেকে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বাগান সৃজন করে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে দেখে আসছি। ত্রিপুরা ও মুরুং সম্প্রদায়ের লোকজন কখনো সেখানে ছিল না। এভাবে যদি হয় তাহলে কোম্পানি এ এলাকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।’

এদিকে লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জামাল বলেন, ‘উপজাতি ও লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের মধ্যে জায়গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসায় একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপজাতিদের দাবির প্রেক্ষিতে কোম্পানি ১৫০ একর জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি হয়। উভয়পক্ষ এ সিদ্ধান্ত মেনেও নেয়। কিন্তু বৈঠক থেকে বের হয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা উল্টো পথে হাঁটেন।’

ওডি/জেআই

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড