• বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নদীর জমি ও শত বছরের ঘাট দখল, থানায় মামলা

  রয়েল আহমেদ, শৈলকুপা (ঝিনাইদহ)

০৮ মে ২০২২, ১২:১৮
ছবি : দৈনিক অধিকার

ঝিনাইদহের শৈলকুপার কবিরপুর কুমার নদীর শত বছরের ঘাট ও ব্রিজের নিচে নদীর জায়গা দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পৌরনায়েব শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ৬ মে শৈলকুপা থানায় জমির মালিকানা দাবি করা ২ ব্যক্তি মো. মহিউদ্দিন ও আব্দুস সাত্তার ফিরোজীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বর্তমানে তারা উভয়েই উপজেলার কবিরপুরের বাসিন্দা।

জানা যায়, সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য ছিল ২৯.৫ শতকের সবুজ চত্বর আর এই সবুজ চত্বরটুকু রড-সিমেন্টের খুঁটি আর বাঁশ-খুঁটি দিয়ে ঘিরে ফেলে দখলে নেয়া হয়েছে। স্থানীয়রা বার বার বাধা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। রাতের আঁধারে জমি চাষ দিয়ে সেখানে লাগানো হয়েছে কলাগাছ। আবার এর পাশেও ২৪ শতক জমি দখল করা হয়েছে। জমির মালিকেরা বলছেন এ জমি তারা ক্রয় করেছেন। সরকারি এই জমি কীভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন হলো এই নিয়ে নানা মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কোনো নদীর জায়গা দখল, ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না মর্মে হাইকোর্টেরও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না জমির মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ১২৪ নং কবিরপুর মৌজার সাবেক ৩৪৮,৩৮৮ ও ৪৩৫ নং দাগের জমি বহুপূর্ব থেকেই সরকারি রাস্তা যার এসএ হাল দাগ নং ১৪২০ ব্রিজের নিচে ২৯.৫০ শতক জমি। কবিরপুর মেইন রোড থেকে কুমার নদের পানি পর্যন্ত রাস্তার জমির নকশা রয়েছে। এসএ সাবেক দাগ ও নকশা অনুযায়ী রাস্তার জমির পাশের মালিকগণ এসব সরকারি নদীর জায়গা ভোগদখল আবার কখনো কখনো সরকারের কাছ থেকে একসানা বন্দোবস্ত নিয়ে বিক্রিও করে দিচ্ছে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে আবার ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডও করে নিচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার ভূমিদস্যু মহল। চরের জায়গাতে কেউ কেটেছে পুকুর আবার কেউ বা মাটি কেটে বিক্রি বা সমতল বানিয়ে চাষও করছে, দিচ্ছে লিজ-বন্দকও। সরকারি জায়গাটুকু কীভাবে রাতারাতি দখল ও বিক্রি হয়ে গেল তা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে কবিরপুরের নতুন ব্রিজ ও চর এলাকার বাসিন্দাসহ সচেতন মহলে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কবিরপুরে নতুন ব্রিজের পাশে রয়েছে শত শত বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী ঘাট। যেখানে কবিরপুর, নতুন ব্রিজ ও চর এলাকার শত শত মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করে তাদের দৈনন্দিন কাজে-কর্মে। আর এই ঘাটের সাথেই ২৯ শতক সরকারি জায়গা রয়েছে, যেটি ভিটার মতো উঁচু সবুজ চত্বর। এখানে প্রতি বছর দুই ইদ, পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজাসহ নানা উৎসবে মেলা বসে। সার্কাস-থিয়েটার, নাট্য উৎসবসহ বৈশাখী মেলাও বসে। তবে শেকড়-সংস্কৃতির নানা বিনোদনের এই জায়গাটুকুও এখন চলে গেল ভূমিদস্যুদের কবলে। শুধু বড়দের উৎসবই নয়, এখানে শিশুরা ঘুড়ি উড়িয়ে থাকে, হ্যান্ডবল, ভলিবল খেলে থাকে।

আর এবারের ইদে এখানে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেনি স্থানীয়রা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ইদের ছুটিতে বাড়িতে এসে নির্মল বিনোদনের জায়গা পায়নি নতুন ব্রিজ এলাকার তথা উপজেলা শহরের মানুষ। নদীর চরের এসব ছোট ছোট জায়গা ঘিরে শৈলকুপার নতুন ব্রিজ এখন মানুষের বিনোদনের একমাত্র স্পট, তবে সেটিও এখন বে-দখল হয়ে গেল। ইদের দু-সপ্তাহ আগ থেকে কবিরপুরের মহিউদ্দীন তার লোকজন দিয়ে জায়গাটুকু ঘেরা দিয়ে দখলের চেষ্টা করতে থাকে। তবে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইদের আগের রাতে রড-সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে ঘিরে ফেলে।

সাবেক মহিলা কাউন্সিলর কবিরপুরের বাসিন্দা রাশেদা খাতুন জানান, এই ঘাটে তারা গোসলসহ নদীর পানি ব্যবহার ও ঘর-গৃহস্থলীর নানা কাজ করতেন। তবে গত কয়েক বছর এসবের কিছুই করতে পারছেন না। বর্তমানে এই জমি দখলের ফলে নদীতে ঠিকমতো যেতে পারছেন না। তারা এই নদীর জমি দখলমুক্ত দেখতে চান।

এদিকে ক্রয়সূত্রে চরের এই জমি মোহাম্মদ মহিউদ্দীন মালিক দাবি করে সম্পত্তি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিলে সদ্যবিদায়ী এসিল্যান্ড পার্থ প্রতীম শীল সেই সাইনবোর্ড তুলে দেন এবং জমিতে কোনো ধরনের দখল বা ঘেরা দেয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দেন দু’দফা। ইউএনও অফিস থেকেও লোকবল এসে জমিতে কোনো কিছু করা যাবে না বলে জানিয়ে দেন। তবে কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে ফের রড-সিমেন্টের খুঁটি পুঁতে তা দখল করা হয়েছে।

উপজেলার কবিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মহিউদ্দীন বলছেন এটা ব্যক্তিমালিকানার জায়গা, এই জায়গাটুকু তিনি কিনেছেন বলে দাবি করছেন। ১৯৮০ সালের দিকে স্থায়ী বন্দোবস্ত দলিলে সরকারের কাছ থেকে কুমার নদের চরের এ জমি কিনেন নজরুল মণ্ডল। সেই জমির ২৯.৫০ শতক ২০১৯ সালে কিনেছেন মহিউদ্দীন, যা মালিকানা সম্পত্তি বলে তার দাবি।

শৈলকুপা ভূমি অফিসসহ স্থানীয় প্রশাসনের বাধার কথা স্বীকার করে মহিউদ্দিন বলেন, বাধা দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে পিটিশন দিয়েছেন এবং শোকজ করা হয়েছে। বৈধভাবে জমি ক্রয় করেছেন এবং মালিকানা হিসেবে ভোগদখল করতে পারবেন বলে দাবি করছেন মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

নদীর জমির মালিকানা দাবি করা আরেক ব্যক্তি আব্দুস সাত্তার ফিরোজী বলেন, আমরা বৈধ উপায়ে জমি ক্রয় করেছি। আমাদের জমিতে কোনো ত্রুটি নেই। আমরা এই জমির বৈধ মালিক।

শৈলকুপা থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনোভাবেই নদীর জায়গা দখল করা যাবে না। এ ব্যাপারে শৈলকুপা থানায় সরকারি সম্পত্তি জবরদখলের ঘটনায় মহিউদ্দিন ও আব্দুস সাত্তার ফারাজি নামের ২ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬ মে একটি মামলা হয়েছে।

শৈলকুপায় সদ্য যোগদানকারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বনি আমিন জানিয়েছে, পূর্বে এমন জমি নানাভাবে দখল, স্থাপনা নির্মাণ করতে দেখা গেলেও বর্তমানে হাইকোর্টের আদেশের পর নতুন করে এভাবে নদীর জমি দখল, ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। কুমার নদের নতুন ব্রিজ সংলগ্ন জমির বিষয় নিয়ে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা লিজা বলেন, নদীর জায়গা দখল করার কোনো সুযোগ নেই। যতবার তারা দখল নেয়ার চেষ্টা করেছে ততবারই আমরা বাধা দিয়েছি। বর্তমান দখলদারদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে, দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

বিরোধপূর্ণ এই জমি নিয়ে যে কোনো মুহূর্তে এলাকায় সংঘর্ষ ও সহিংসতার আশংকা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অনেকে জানিয়েছে। তাই অতিসত্বর শত বছরের ঘাট, নদীর জমি দখলমুক্ত চাই এলাকাবাসী।

ওডি/মাহমুদ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড