• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

'আকাশে ম্যাঘ দেখলেই খালি আল্লা আল্লা করোচি'

  কাজী কামাল হোসেন,বুরো প্রধান (রাজশাহী)

০৮ মে ২০২২, ১০:০৬
ছবি : দৈনিক অধিকার

নওগাঁয় শ্রমিক সংকটের কারণে মাঠ থেকে ঘরে ধান তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। কিছু দিন ধরে বৈরি আবহাওয়া এবং ঝড়ে শুয়ে পড়েছে অধিকাংশ মাঠের ধান। অধিকাংশ খেতে পানি জমে যাওয়ায় আকাশে মেঘ দেখলেই মাঠের শুয়ে পড়া পাকা ধান ঝড়-বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, শ্রমিকের অভাবে তারা পাকা ধান কাটতে পারছেন না। বিশেষ করে মান্দার কালিকাপুর, ঠাকুরমান্দা, বিলআন্দাসুরা, শুশুগাড়ি, নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়ার বিল, নওগাঁ সদরের গুটারবিল, বিল মনসুর, হাঁসাইগাড়ী, সরইল, দিঘলীর বিলসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে যেসব কৃষক ধান আবাদ করেছেন তারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কারণ সামন্য বৃষ্টিতেই বিলের ধান ডুবে যায়। ইদের দিন থেকে প্রায় প্রতি দিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক জমিতে পানি জমি গেছে। আরেকটু বৃষ্টি হলেই অনেক মাঠের ধান পানিতে তলিয়ে যাবে। এ অবস্থায় আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখলেই শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন তারা।

গত শুক্রবার ও শনিবার নওগাঁ সদর উপজেলার গোয়ালি, মশরপুর, হাঁপানিয়া, বর্ষাইল, দুবলহাটি, মহাদেবপুর উপজেলার বিনোদপুর, উত্তরগ্রাম, চান্দাশ, নিয়ামতপুর উপজেলার চন্দননগর, মান্দার গনেশপুর, প্রসাদপুর, ভালাইনসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানো হাজার হাজার একর জমির পাকা ধান মাঠে পড়ে আছে। শ্রমিকের অভাবে এসব ঘরে তুলতে পারছেন কৃষকেরা। অনেক কৃষক পরিবারের সদস্য নিয়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ করছেন। গত তিন-চার দিন ধরে নওগাঁর সদরের দুবলহাটি বাজার ও হাঁপানিয়া বাজার, মহাদেপুরের নওহাটা মোড় ও নিয়ামতপুরের ছাতড়া বাজারে গৃহস্থদের ভিড় আর স্থানীয় এবং অন্য জেলা থেকে আসা শ্রমিকদের নিয়ে টানাটানির চিত্র চোখে পড়ে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসেব মতে চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধান পাকলেও ধান কাটা হয়েছে ১৫ শতাংশ।

নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া গ্রামের কৃষক শিমুল বলেন, ছাতড়া বিলে এবার ১১ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলাম। সাতদিন আগে খেতের সব ধান পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক না পাওয়ার জন্য এক বিঘা জমির ধানও কাটতে পারিনি। অন্য বছর বাইরের জেলা থেকে অনেক শ্রমিক আসে। গত দুই বছর করোনার সময়েও শ্রমিকের এতো সংকট হয়নি। কিন্তু এবার বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক এসেছে খুব কম। স্থানীয় শ্রমিক থাকলেও তারা যেসব কৃষকের ধান কাটার চুক্তি নিয়েছেন সেগুলোই কেটে শেষ করতে পারছে না। এদিকে খেতের ধান ডুবে যেতে বসেছে। ধান নিয়ে এবার মহা বিপাকে পড়েছি।

ছাতড়া বিল এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর ধানকাটা শ্রমিকদের মোট ধানের ৫-৬ শতাংশ দিলেই হতো। এতে প্রতি বিঘা জমির ধান কাটা বাবদ খরচ পড়তো প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু এবার এপ্রিল মাঝামাঝি সময়ে হয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে খেতের ধানগাছ নুইয়ে পড়ায় ধান কাটতে বেশি শ্রম লাগায় ধানকাটা শ্রমিকেরা মোট ধানের ৮-১০ শতাংশ দাবি করছে। কৃষকেরা তাদের দাবি অনুযায়ী ধান কাটতে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন। এতে এ বছর এক বিঘা জমির ধান কাটতে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

নওগাঁর সদর উপজেলার শিকারপুর গ্রামের কৃষক দেওয়ান আব্দুস সালাম বলেন, ধানের বেশি থাকলেও এ বছর বোরো ধানে খুব বেশি লাভ হবে না। সেচ খরচ, সার ও পরিচচর্যা বাবাদ প্রতি বিঘা জমিতে ৮ থেকে ৯ হাজার করে টাকা খরচ হয়েছে। তারপর ঝড়ে খেতের ধান শুয়ে পড়ায় খেতের ১০-১২ শতাংশ ধান চিটা হয়ে গেছে। আবার শ্রমিক খরচ পড়ছে প্রতি বিঘায় প্রায় ৫ হাজার টাকা। বৈরি আবহাওয়ার কারণে এবার কৃষকের অনেকের ক্ষতি হয়ে গেছে। সময়মতো মাঠের ধান ঘরে তুলতে না পারলে আরও ক্ষতি হবে।

নওগাঁর দিগলীর বিলে ধান লাগিয়েছেন সরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, ‘বিলত সব ধান পড়ে আছে। আকাশের যে অবস্থা। এক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টি হলেই সব ধান ডুবে য্যাবে। দৌড়াদৌড়ি করেও প্যাট (শ্রমিক) য্যাচ্ছে না। আকাশে ম্যাঘ দেখলেই খালি আল্লা আল্লা করোচি। ধান না কাটা পর্যন্ত য্যান ঝড়-বৃষ্টি না হয়।’

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, মাঠের ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত মাঠের ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারছেন না এমন কথা শোনা যাচ্ছে। বাইরের জেলার শ্রমিক কম আসায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। ধান কাটার ভরা মৌসুমে ইদের কারণে বাইরের শ্রমিকেরা আসতে পারেননি। তবে আশা করা যাচ্ছে, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে বাইরে থেকে পর্যাপ্ত শ্রমিক চলে আসবে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি না হলে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই মাঠের ধান কাটা হয়ে যাবে।

ওডি/মাহমুদ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড