• বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মাকে হারানোর পর বাবাও খুন, ৫ শিশুর দায় নেবে কে?

  হারুন আনসারী, ফরিদপুর

০৫ মে ২০২২, ১৪:২৬
মাকে হারানোর পর বাবাও খুন, ৫ শিশুর দায় নেবে কে?
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইদের দিনে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত আকিদুল শেখের পাঁচ শিশু সন্তান (ছবি: অধিকার)

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইদের দিনে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহতদের একজন আকিদুল শেখ। তার চার ছেলের পর একমাত্র মেয়েকে প্রসবের সময় স্ত্রী মারা যান। আকিদুলের বড় ছেলে আজিজের বয়স ১৫ বছর, মেজ ছেলে রিয়াজুলের বয়স চৌদ্দ বছর, সেজ ছেলে মমিনের বয়স ১০ বছর এবং ছোট ছেলে মোস্তাকিনের বয়স সাত বছর। আর আকিদুলের বৃদ্ধা মায়ের বয়স প্রায় ৭০ বছর। খেতে খামারে কাজ করা আকিদুলের এতিম পাঁচ শিশুর ভবিষ্যতের দায়ভার কে নেবে, তা কেউ জানে না।

এ ঘটনার প্রায় ৩০ ঘণ্টা পার হলেও বুধবার (৪ মে) রাত ৯ টা পর্যস্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে আটক করেছে।

স্থানীয়রা জানান, বিবাদমান দুই গ্রুপের মধ্যে আরিফ হোসেন ঘোষপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক এস.এম ফারুক হোসেনের সমর্থক এবং মোস্তফা জামান ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন নবাবের সমর্থক।

বুধবার নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুরের বিএসএমএমসি হাসপাতালে পাঠানোর পর ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় তাদের লাশ বোয়ালমারীর নিজ গ্রামে দাফন করা হয়েছে। এদিকে প্রতিপক্ষের হামলায় দুজন নিহত হওয়ার জের ধরে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সরজমিনে জানা গেছে, বোয়ালমারী উপজেলার উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ী ও চরদৈতরকাঠি পাশাপাশি দুটি গ্রাম। যুগের পর যুগ সেখানে চলছে গ্রাম্য দলাদলি। এক পক্ষের সাথে বনিবনা নেই অপর পক্ষের। সব বিষয় নিয়েই তাদের মতবিরোধ। মাঝেমধ্যে এ বিরোধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রুপ নেয়।

জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল স্থানীয় গোয়ালবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে অংশ নেয় উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোস্তাফা জামান সিদ্দিকী ও গোয়ালবাড়ি গ্রামের আওয়ামী লীগের সমর্থক আরিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন দুটি প্যানেল। এতে মোস্তাফা জামানের প্যানেল বিজয়ী হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে।

গত ১৮ এপ্রিল তাদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে শান্তি সমাবেশ করা হয়। ওইদিন গোয়ালবাড়ি স্কুল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে বোয়ালমারী থানার ওসি (তদন্ত) মো. সালাউদ্দিনের কাছে ঢাল-সড়কি জমা দেন মোস্তফা জামান সিদ্দিকী এবং আরিফুর রহমানের সমর্থকেরা। ওই সমাবেশে তারা উভয়েই আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হবে না বলেও অঙ্গীকার করেন। একমাস না যেতেই সে অঙ্গীকার ভেঙে যায়।

সরজমিনে জানা গেছে, ইদের দিন গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ায় ইদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মসজিদে। দুই পক্ষ বরাবরের মতোই পৃথক দুটি মসজিদে ইদের জামাতে অংশ নেন। এদিন এক পক্ষ অপর পক্ষের জামাতকে রাজাকারের ইদের জামাত বললে আবার উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

জানা গেছে, মোস্তফা জামানের বাবা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধকালীন কমান্ডার। তার অভিযোগ, আরিফের বাবা বজলুর রহমান ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী। ২০১৭ সালে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হলে বজলু খালাসি তালিকাভুক্ত হতে আবেদন করেন। কিন্তু যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি তাতে আপত্তি জানান। এতে দুই পক্ষের বিবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। ইদের দিনে আরিফ সমর্থকদের ইদের জামাতকে রাজাকারের জামাত বলে অভিহিত করে মোস্তফার সমর্থকেরা। এতে দুই দলের মাঝে ছাইচাপা আগুন যেন উস্কে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এরপর আরিফ সমর্থকেরা ৮ থেকে ১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে গোয়ালবাড়ি বাজারে মহড়া দেয়। ৩০ থেকে ৩৫ জনের আরেকটিদল পুকুর পাড়ের মাটির রাস্তা ধরে রামদা, ছ্যান, চাইনিজ কুড়াল সহকারে এসে অতর্কিতভাবে হামলায় চালায় প্রতিপক্ষের উপর। তারা বাজারের পাশে চায়ের দোকানে বসে চা পান শেষে পান চিবাচ্ছিলেন।

নিহত খায়রুল মোল্যার মেয়ে রাবেয়া বেগম বলেন, ‘ইদের দিন স্বামীর বাড়ি মধুখালি থেকে বাবার বাড়ি আসছিলাম। রওনা দিয়ে বাবাকে বলেছিলাম আমি আসছি। আমাকে নেয়ার জন্যই বাবা অপেক্ষা করছিলেন। এর সাত মিনিটের মধ্যেই ফোনে খবর পাই বাবাকে কুপিয়েছে। আমার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। আমি মৃত্যুর বদলে মৃত্যু চাই।

নিহত খায়রুলের স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, ঢাল, সড়কি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে আরিফের লোকেরা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে।

খায়রুল মোল্যার বাড়ির নিকটেই আকিদুল শেখের (৪৬) বাড়ি। প্রতিবেশীরা জানান, বাড়ি থেকে ভ্যান চালিয়ে বাজারের দিকে আসছিলেন আকিদুল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গভীর জখম করা হয়। এরা দুইজনই মোস্তফা গ্রুপের সমর্থক। একজন বোয়ালমারী হাসপাতালে এবং অপরজন ফরিদপুর নেয়ার পথে মারা যান।

বুধবার সকালে চরদৈতরকাঠি ও গোয়ালবাড়ি গ্রামে যেতে পথে মিলে কিছু নির্বাক গ্রামবাসীর মুখ। ইদের দিনে গ্রামে জোড়া খুনের ঘটনায় তারা হতভম্ব। পাশাপাশি শঙ্কিত আগামী দিনের অশান্তির কথা ভেবেও।

ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। ঘটনাস্থলে বুধবার সিআইডির ক্রাইম সিন আলামত সংগ্রহ করতে কাজ করছে।

বোয়ালমারী থানার এসআই মো. মামুন হোসেন বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে খবর পেয়ে তারা এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

আরও পড়ুন: বোনের বাড়িতে যাওয়া হলো না মামুনের

বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরুল বলেন, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত তথ্য উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। এজাহার পেলেই আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাড়িঘরে হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়েও আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

ওডি/এমকেএইট

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড