• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সিংগাইরে গাজর চাষে ১০ হাজার কৃষকের মুখে হাসি

  মিলন মাহমুদ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)

২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:৫৫
সিংগাইরে গাজর চাষে ১০ হাজার কৃষকের মুখে হাসি
গাজর পরিস্কার করা হচ্ছে। ছবি : অধিকার

শীতকালীন ফসলের মধ্যে অন্যতম একটি অর্থকরী সবজি। এবার ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিতে সরিষাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও মানিকগঞ্জের সিংগাইরে গাজরের বাম্পার ও আশানুরূপ ফলন হয়েছে।

ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভাল দামও পাচ্ছেন কৃষকরা। তাই এবার উপজেলার প্রায় ১০ হাজার গাজর চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। নষ্ট ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন কৃষক। গাজরের ভাল দাম পাওয়ায় গাজর চাষে আগ্রহ বাড়ছে অন্য চাষিদের।

দুই দশক আগে শুধু জয়মন্টপ গাজর চাষ শুরু হলেও বর্তমানে উপজেলার কিটিংচর, দেউলী, দশানী, ভাকুম, নয়াপাড়া, মেদুলিয়া, গাজিন্দা, লক্ষীপুর, নীলটেক, কানাইনগর, মোসলেমাবাদ, বিন্নাডাঙ্গী, আজিমপুর, নয়াডাঙ্গী ও চর দূর্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি কৃষক গাজর চাষের সঙ্গে জড়িত। গাজর চাষ লাভজনক হওয়ায় নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে ব্যাপক হারে গাজর চাষের দিকে ঝুঁকছে এই অঞ্চলের কৃষকরা। গাজর চাষ করে অনেক পরিবারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা।

কৃষি অফিস ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিংগাইর উপজেলায় গাজর চাষ শুরু হয় প্রায় দুই দশক আগে। প্রথম দিকে শুধু মাত্র জয়মন্টপ ইউনিয়নের দেউলি-দশানী এলাকায় স্বল্প পরিসরে এর চাষাবাদ শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় গাজর চাষ এখন সমগ্র সিংগাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন গাজর এ এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। সারাদেশেই এই গাজরের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সীমিত আকারে রফতানিও হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এবার ফলনও বেড়েছে। তবে সিংগাইরে গত বৃষ্টিতে ৫০ হেক্টরের মত জমির গাজর নষ্ট হয়েছে। গতবছর প্রতি হেক্টরে গাজর উৎপাদন হয়েছিল ৩৫-৩৬ মে. টন। এবার উৎপাদন হয়েছে ৩৭-৩৮ মেট্রিক টন। গাজর চাষি মো. সরিফুল ইসলাম ও মো. মেরেজ খান জানান, বীজের দাম অনেক বেশি। বাজারে কোথাও বীজ পাওয়া যায় না। গতবছর এক কেজি বীজের দাম নিয়েছিল ১২-১৩ হাজার টাকা। এবার নিয়েছে ১৫-১৮ হাজার টাকা। বীজের দাম কম হলে আমরা আরও বেশি লাভবান হতে পারতাম। গাজরের বীজের দাম কমানোর দাবি করেন এ চাষিরা। গাজরের ভরা মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদাও বেড়েছে। শ্রমিকরাও ভাল মজুরী পাচ্ছেন।

উপজেলার ভূমদক্ষিণের গাজর চাষি ও বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, সিংগাইর ও ঈশ্বরদীতে সব চেয়ে বেশি গাজর চাষ হলেও সিংগাইরের গাজরের চাহিদা বেশী। ভাল দাম পেয়ে এবার গাজর চাষিরা লাভবান হচ্ছে।

গাজর চাষ অধ্যুষিত জয়মন্টপ ইউনিয়নের দেউলি গ্রামের কৃষক ইদ্রিস বেপারী ও কুদ্দুস বেপারী বলেন, ২৫/৩০ বছর ধরে গাজর চাষ করি। এবারও ১০ বিঘা জমিতে বুনেছি। বিঘা প্রতি ৫শ গ্রাম বীজ যার মুল্য ৮-৯ হাজার টাকা, সেই সঙ্গে জমি চাষ, সার, পরিচর্যা ব্যয় ও কীটনাশক মিলে প্রায় ২৫/৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। গড়ে বিক্রি ওঠে প্রায় আশি-এক লাখ টাকার। মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসে দ্বিগুণের বেশি লাভ।

সায়েস্তা ইউনিয়নের কানাইনহর গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, এক ব্যক্তির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যে (কেজি ১৮ হাজার টাকা) বীজ কিনতে বাধ্য করা, অপরদিকে মৌসুমের শুরুতে সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া এগুলো দেখার কেউ নেই। ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কখনো মাঠে আসেন না। সার ও কীটনাশক বিক্রেতাদের দোকানে বসেই তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন বলেও তিনি জানান।

রাজিব মোল্লা (২৮) নামের আরেক তরুণ চাষি বলেন, চলতি বছর ১২ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করেছি। ফলন হয়েছে ভালো। আগাম বাজারজাত করার জন্য বেপারীরা সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাম বলেছে। এ টাকায় বিক্রি করলেও খরচ বাদে আমার দ্বিগুনেরও বেশি লাভ হবে।

মো.ফজলুল হক, সোহরাব, আব্দুর রহিম, রকমত আলীসহ গাজর উত্তোলন ও পক্রিয়াজাতকরণ শ্রমিকরা জানান, প্রতিবছর এ সময় আমরা বেশি মজুরী পেয়ে থাকি। গাজর বপন, পরিচর্যা, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করণের সঙ্গে জড়িত অনেক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হচ্ছে। খেতে থাকা অবস্থাতেই ব্যবসায়ীরা চাষিদের গাজর কিনে নেন। তাই গাজর তুলতে কোনো ঝক্কি ঝামেলা নেই কৃষকদের। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও গাজর তুলতে কোনো শ্রমিক লাগে না। কারণ গো-খাদ্যের জন্য গাজরের পাতার (উপরের অংশ) বেশ চাহিদা রয়েছে স্থানীয়দের কাছে।

তাই গরুর খামারীরাই খেত থেকে গাজর তুলে দিয়ে পাতা নিয়ে যান। এখানকার গাজর ঢাকা, চট্টগ্রাম,নোয়াখালী,ফেনী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ টিপু সুলতান স্বপন বলেন, চলতি বছর ১১শ হেক্টর জমিতে গাছর চাষ হয়েছে। বিঘা প্রতি গড় উৎপাদন ২শ মণের উপরে।

এ উপজেলা থেকে বার্ষিক প্রায় ৫ কোটি টাকার গাজর বিক্রি হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাজরের বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। দামও অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বেশি। বিগত সময়ে গাজর চাষে এ অঞ্চলের ১০ হাজারেরও বেশি কৃষকের আর্থিক উন্নয়নসহ ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি জানান। গাজর চাষে কৃষকদের সকল রকম সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।

ওডি/এসএ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড