• মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১১ মাঘ ১৪২৮  |   ১৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শ্রীপুরে অপরিশোধিত বিষাক্ত তরলবর্জ্যে কৃষকের ফসলি জমি নষ্ট

  আব্দুর রউফ রুবেল, গাজীপুর

১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:০৪
গাজীপুর
ফ্যাক্টরীর অপরিশোধিত বিষাক্ত তরলবর্জ্যে (ছবি : অধিকার)

গাজীপুরের শ্রীপুরে মিলস ফ্যাক্টরীর অপরিশোধিত বিষাক্ত তরলবর্জ্যে কৃষকের কয়েকশ একর ফসলি জমি তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। গত ৩ বছর যাবত স্থানীয় কৃষকরা এ জমিতে ধান ও সবজি চাষ করতে পারছে না। এ অঞ্চলে যারা শুধুমাত্র কৃষিনির্ভর তাদের অবস্থা একেবারেই নাজুক। ধান ফলিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে কৃষকরা এখন ঋণগ্রস্ত।

ভালুকা উপজেলার ক্ষীরু নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে শ্রীপুর উপজেলার উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে লবনদহ নামের একটি নদ। উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের পূর্ব এবং পৌরসভার পশ্চিমপ্রান্ত ঘেষে কেওয়া পশ্চিম খন্ড, পাথারপাড়া, বহেরার চালা, বেলতলি, বেড়াইদেরচালা, শিরিরচালা, ইন্দ্রবপুর, বানিয়ারচালা, ভবানিপুর, পিরুজালী ও মনিপুর দিয়ে এঁকেবেঁকে তুরাগ নদীতে গিয়ে এ লবনদহ নদ সংযুক্ত হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় অর্ধশত কিলোমিটার হবে। এ নদের উভয় পাশে যাদের জমি রয়েছে তারাই পড়েছে বিপাকে।

শ্রীপুর পৌরসভা ও গাজীপুর সদরের অসংখ্য মিলস-ফ্যাক্টরীর অপরিশোধিত দূষিত তরলবর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় সরাসরি ছাড়া হচ্ছে এ নদে। দখল দূষণে মৃত প্রায় এ নদে পতিত এসব বিষাক্ত তরলবর্জ্য উপচে গিয়ে পড়ছে কৃষকের জমিতে। আর এতেই নষ্ট হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রায় কয়েকশ একর ধানের জমি।

শ্রীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বহেরার চালা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কৃষক মো. মফিজ উদ্দিনের সাথে। তার ১০ বিঘা জমি বিষাক্ত বর্জ্যে তলিয়ে আছে। কেমন আছেন প্রশ্ন করতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন এখন শুধু মরার বাকি। জমিতে ধান ফলানো ছাড়া জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো উপায় নেই তার। পরপর তিনবার ধান চাষ করেও খরচই তুলতে পারছেন না তিনি। সংসারের সবাইকে নিয়ে পথে বসার অবস্থা এখন তার। প্রতিকার পেতে অনেকবার পৌর মেয়রের কাছে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ৪০-৫০ জন কৃষক একসাথেও গিয়েছেন মেয়রের কাছে। মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।

তিনি জানান, আশেপাশের ফ্যাক্টরীর সকল বর্জ্য, হাসপাতালের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি স্যালাইন প্যাকেট, ইনজেকশন ও বোতল সব এনে রাতের আধারে আমাদের জমিতে ফেলে রাখে। এমনকি পৌরসভার বাসাবাড়ির ময়লা আবর্জনাও এখন আমাদের ফসলি জমিতে এনে ফেলছে। দেখার কেউ নেই।

কথা হয় ভুক্তভোগী কৃষক শফি কামাল, জালাল মিয়া, মুক্তার, সিরাজ উদ্দিন মাস্টার, মুখলেস মোল্লা, আক্রাম হোসেন, সাইফুল ইসলামসহ আরও অনেকের সাথে। শফি কামাল জানান, এ গ্রামে মিতালি, এক্স সিরামিক্স, ক্রাউন, হরাইজনসহ অসংখ্য মিল ফ্যাক্টরী রয়েছে যার বর্জ্য আমাদের জমির পানিতে এসে পড়ে। এখানে শুধু ধান কেনো, কোনো ফসলই হবে না। জমির আইলে মৃতপ্রায় তালগাছ দেখিয়ে বললেন, দেখুন এখানে ধান কেনো, কোনো কিছুই হবে না। মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে। ক্ষেতে নেমে আর কাজ করা যায় না। শরীরে ঘা হয়।

তরুণ লেখক ও পরিবেশকর্মী মিশকাত রাসেল জানান, লবনদহ নদের শাখা গড়গড়িয়া খালের দুই পার দখল করে কংক্রিটের ঢালাই করে ফ্যাক্টরীর দুই অংশের সংযোগ ঘটিয়েছে। এতে করে উজানে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। বিপাকে পড়েছে দু’পারের সাধারণ মানুষ। বিস্তার ঘটছে নানা ধরণের জটিল রোগ বালাই। এতে গৃহপালিত পশুপাখিও আক্রান্ত হতে বাদ পরছে না।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের শ্রীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. খোরশেদ আলম বলেন, গতবছর নদটি পুনঃখননের কাজ শুরু হয়। ১৮ কিলোমিটার খননের কথা থাকলেও অদৃশ্য কারণে মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার খনন করার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আর খনন হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ১১ কিলোমিটার খনন করার কথা, তবে ৬ কিলো ৬শ মিটার হয়েছে। পরে বষার্য় পানি উঠে যাওয়ায় ঠিকাদার মেশিন উঠিয়ে নেয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিচ্ছি কাজটি পুনরায় করার জন্য। শ্রীপুর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি খুব বেদনাদায়ক। কৃষিজমিতে ধান না ফলাতে পারলে আমরা খাবো কি? কৃষক বাঁচলেই আমরা বাঁচবো। মিলস-ফ্যাক্টরীর বিষাক্ত বর্জ্যের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিবে পরিবেশ অধিদফতর। উপজেলা প্রশাসন পাশে থেকে বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।

আরও পড়ুন : ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই পারাপারে একমাত্র ভরসা

গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নয়ন মিয়া জানান, শ্রীপুর প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হওয়ার পরও কোনো ডাম্পিং স্টেশন নেই। যে কারণে যে যার ইচ্ছেমত ময়ালা আবর্জনা ফেলছে। ইটিপি প্লান ব্যবহারে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইচ্ছেই দেখি না। তবে আমরা শিঘ্রই অনলাইন নজরদারীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আশা করছি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ অধিদফতরের নিয়ম মেনেই পরিচালিত হবে।

ওডি/এফই

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড