• রোববার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধলেশ্বরী নদীতে ট্রলারডুবি

ফিরল সোহেলের পরিবার, তবে পচা-গলা লাশ হয়ে

  তুষার আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ

১২ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:৪৯
নিহত
ট্রলারডুবির ঘটনায় নিহত তামিম ও শিশু তাসফিয়ার পাশে সোহেল। ছবি : অধিকার

সম্প্রতি মা ও বোন তাসফিয়াকে নিয়ে খালার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার বায়না ধরেছিল তাসনিম ও তামিম। সন্তানদের এমন আদুরে আবদার প্রত্যাখ্যানও করতে পারেননি বাবা সোহেল মিয়া। তাই দ্রুত ফিরে আসার তাগিদ দিয়ে সন্তানদের আবদার রক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি।

পরে সোহেলের চোখের সামনে দিয়েই হাসিমাখা মুখগুলো একে এতে ঘর থেকে বের হয়ে রওয়ানা হয়েছিল খালার বাসার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কে জানতো, হাস্যোজ্জ্বল এই যাত্রাই ছিন্ন করতে যাচ্ছে তিলে তিলে গড়া একটি গোছানো পরিবারের জীবন-বন্ধন! কে-ই বা জানতো, ধলেশ্বরীতেই তাদের অপেক্ষায় ছিল মৃত্যুদূত!

সোহেলের স্ত্রীসহ তিন সন্তান ফিরেছে ঠিকই, তবে জীবিত নয়, পচা-গলা লাশ হয়ে।

ভাগ্যের পরিহাস এতোটাই নিষ্ঠুর? উত্তর না মেলা এমন শত প্রশ্ন আর পুরনো সুখ-স্মৃতিগুলোই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সোহেলের শোক-বিদীর্ণ হৃদয়। চোখের অঝোর ধারা শুকোলেও হৃদয়ে রক্তক্ষরণে যে নহর তৈরি হয়েছে সোহেলের, তা যে শুকাবার নয়!

গত ৫ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ধলেশ্বরী নদীতে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলারডুবির ঘটনায় যে ১০ জন নিহত হয়েছে, তারমধ্যে সোহেলের পরিবারেরই ছিল ৪ জন। নির্মম ওই দুর্ঘটনা একসাথে কেড়ে নিয়েছে সোহেলের স্ত্রী এবং আদুরে তিন সন্তানকে। সোহেল এখন কেবলই একা। ক’দিন আগেও স্ত্রী-সন্তানদের প্রাণচাঞ্চল্যতায় মুখরিত ছিল যে বাড়ির আঙ্গিনা, সেই ভিটে-মাটিতে এখন চলছে শোকের মাতম। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে যেন পড়েছে শোকের আস্তরণ।

মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) বিকালে নিজ বাড়ি ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের চরমধ্যনগর গ্রামে কথা হয় সোহেলের সাথে। সেখানেই প্রিয় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। কাঁপা কণ্ঠে স্ত্রী সন্তানদের বিদায় বেলার বর্ণনা দিলেন সোহেল। বললেন, ‘খালার বাসা থেকে দ্রুতই ফিরে আসার কথা ছিল তাদের। তারা ফিরেছে ঠিক, তবে পচা গলা লাশ হয়ে। কিন্তু কেন? আমার সাজানো-গোছানো সংসারের এই পরিণতি কেন? আমার স্ত্রী-সন্তানদের এই পরিণতির জন্য দায়ী কে? আমি তাদের শাস্তি চাই। অন্যকিছু না।’

সোহেল বলেন, ‘৫ তারিখ সকালে ট্রলার ডোবার খবর পাই। খবর পেয়েই বুকটা কেঁপে উঠেছিল। ঘাটে গিয়ে শুনতে পেলাম ওই ট্রলারেই ছিল আমার স্ত্রী জিয়াসমিন, সদ্য বিবাহিতা বড় মেয়ে তাসনিম (১৬), ছেলে তামিম (৮) ও ১৩ মাসের শিশু কন্যা তাসফিয়া।

ফায়ার সার্ভিসসহ অন্য উদ্ধারকর্মীরা একে একে ৪ দিন তল্লাশি করেও কারও খোঁজ পাচ্ছিল না। স্ত্রী-সন্তানদের ছবি হাতে নিয়ে তাই নদীর এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি। বুঝতেই পেরেছিলাম তারা জীবিত নেই। তাই আল্লাহর কাছে তাদের মৃত দেহগুলো খুঁজে পাওয়ার আর্তনাদ করেছি। রাতগুলো কেটেছে নির্ঘুম। অতঃপর গত ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় প্রথমেই আমার স্ত্রী জিয়াসমিন আক্তারের লাশ পাওয়া যায়। এরপর মেয়ে তাসনিম আক্তারের মরদেহ পাই।

পরদিন পাওয়া যায় আমার মাদরাসা পড়ুয়া ৮ বছর বয়সী সন্তান তামিমকে। এরপর মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) ধলেশ্বরী নদীর ডিক্রিরচর এলাকায় পাওয়া যায় আমার ১৩ মাসের শিশুকন্যা তাসফিয়ার গলিত মরদেহ। তাদের সবাইকে বাড়ির পাশের গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ আমাকেও কেন তাদের সাথে নিল না। আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখল।’

সোহেল বলেন, ‘এক মাস ৩ দিন আগে আমার বড় মেয়ে তাসনিমের বিয়ে দিয়েছিলাম। কথা ছিল কিছুদিন পরই মেয়েটাকে তার শ্বশুরবাড়ি উঠিয়ে দেব। কিন্তু মেয়ে আমার কোথায় পাড়ি জমাল! ছেলেটাকে নিয়েও অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলে আলেম হবে, সেই আসায় তাকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছিলাম। একটি দুর্ঘটনা আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল।’

এ দিকে, সদ্য বিয়ে হওয়া তাসনিমের স্বামী নিজামের চোখে মুখেও বিষাদ বেদনার কালো ছাপ বেশ স্পষ্ট ফুটে আছে। স্ত্রীর সম্পর্কে প্রশ্নগুলোর উত্তরে ছিলেন বাকরুদ্ধ। ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু আকাশের দিকে চেয়ে থেকে যেন নীরব জবাব দিলেন নিজাম।

আরও পড়ুন : স্কুলে যাওয়ার পথে লাশ হলেন চাচা-ভাতিজা

অন্যদিকে, মঙ্গলবার শিশু তাসফিয়াকে উদ্ধারের মাধ্যমে অভিযান সমাপ্ত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য দফতরের ডুবুরি দল। মৃতদের দাফন-কাফনের জন্য মরদেহ প্রতি ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে অর্থ নয়, ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি কামনা করছেন নিহতদের স্বজনরা।

ওডি/নিলয়

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড