• সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ফেলানীর পর আরও ২৮

  হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম

০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:২৯
সীমান্ত
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। ফাইল ছবি

বহুল আলোচিত ফেলানী খাতুন হত্যার ১১ বছর পরও শান্ত হয়নি কুড়িগ্রামের সীমান্ত এলাকা। আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ওপর চাপের কারণে সীমান্ত ট্রিগার ফ্রি হওয়ার আশা করা হলেও আদৌ থামেনি সীমান্ত হত্যা।

শুক্রবার (৭ জানুয়ারি) ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর পূর্ণ হলেও এই সময়ের মাঝে কুড়িগ্রামের সীমান্তে বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকসহ অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। জেলার সীমান্তে এখনো বিএসএফের হামলার স্বীকার হয়ে অনেকেই নিহত হচ্ছেন। কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং গণমাধ্যমের তথ্য মতে, ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১১ বছরে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্তে ২৮ জন বাংলাদেশি ও ভারতীয় নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও আহত হয়েছেন অনেকেই। এরমধ্যে ফুলবাড়িতে ২০১১ সালে ফেলানী, ২০১২ সালে আলমগীর হোসেন, ২০১৫ সালে শ্যামল চন্দ্র বাদ্রকার, একই বছর উলিপুরে বায়েজিদ হোসেন, ২০১৯ সালে ভারতীয় নাগরিক সবুর মিয়া, নাগেশ্বরীতে ২০১৯ সালে আবুল হাসেম, ২০২০ সালে ছবিল উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, একই বছর রৌমারীতে হাসিনুর রহমান, ২০১৬ সালে ফুলু মিয়া, তাহারুল ইসলাম, নুরল আমিন, নুর ইসলাম, বাহারুল ইসলাম, মনসের আলী, ২০২০ সালে খয়বর আলী, শাহিনুর রহমান ফকির চাঁদ, আখিরুল ইসলাম, ২০২১ সালে হাসিবুর রহমান, সহিবর রহমান, রাশেদুল ইসলাম এবং ভারতীয় নাগরিক মোহাম্মদ আলী নিহত হন। এ ছাড়াও ২০১৬ সালে ভূরুঙ্গামারীতে আব্দুল বারেক, ২০১৭ সালে জাহাঙ্গীর আলম এবং ২০১৯ সালে ভারতীয় নাগরিক আখেরুল ইসলাম সীমান্তে নিহত হয়েছেন।

এ দিকে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ফেলানী খাতুন নিহতের ১১ বছরেও ন্যায়বিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার।

জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের নূরুল ইসলাম নুরু কাজের প্রয়োজনে পরিবার নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভারতের আসাম রাজ্যের বোয়াইলপাড়া জেলার বঙ্গাইগাও এলাকায়। তবে কিশোরী ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশ্যে বাবার সাথে ভারত থেকে দেশে আসছিল বাবার সাথে। ২০১১ সালে ৭ জানুয়ারি (শুক্রবার) ভোর ৬টার দিকে ফুলবাড়ি উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কাঁটাতারের উপরে মই দিয়ে পার হচ্ছিল তারা। এ সময় ভারতীয় বিএসএফের টহলদল তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তবে ফেলানীর বাবা বাংলাদেশ অভ্যন্তরে নেমে পড়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে মইয়ের উপরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারে উল্টোভাবে ঝুলে পড়েন ফেলানী।

এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ফেলানী। পরে সকাল পৌনে ৭টা থেকে ফেলানীর নিথর দেহ কাঁটাতারের উপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা। করুণ এই দৃশ্য গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এরপর বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। পরে বিএসএফের বিশেষ কোর্টে দুই দফায় বিচারিক রায়ে খালাস পায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন মাসুম- এর সহযোগিতায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম। কিন্তু এখনো সুষ্ঠু বিচার না পেয়ে হতাশ ফেলানীর পরিবার।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচ বিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। বিএসএফের কোর্টে সাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা এবং মামা হানিফ। পরের মাসে ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ কোর্ট।

এরপর রায় প্রত্যাখ্যান করে পুন:বিচারের দাবি জানান ফেলানীর বাবা। পরের বছর ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুন:বিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। তবে ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আসামি অমিয় ঘোষকে আবারও বেকসুর খালাস দেয়।

এই রায়েও সন্তুষ্ট হতে না পেরে ওই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি এখনো।

এ দিকে, মেয়ের হত্যাকারীর বিচার না পেয়ে হতাশায় ফেলানীর পরিবার। ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, ‘আমার চোখের সামনেই মেয়েকে হত্যা করেছে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ। কিন্তু আমি আজও ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচার পাইনি। খুনি অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই।’

আরও পড়ুন : সরকারি সার পাচারের সময় গ্রেফতার ৬

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ওর (ফেলানী) খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে বাবাসহ ভারত থেকে আসছিল ফেলানী। কিন্তু বিএসএফের গুলিতে আমার মেয়ে কনের সাজে না সেজে সাদা কাপড়ে সেজে দুনিয়া থেকে চলে গেল। আমার মেয়ের মুখটিও শেষ দেখা দেখতে পারিনি। মা হিসেবে যে কি কষ্ট বুঝাতে পারব না। গুলি লেগে কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। পানি পানি করে চিৎকার করলেও আমার ফেলানীর মুখে পানি পড়েনি। আমি খুনি অমিয় ঘোষের ফাঁসি চাই, তাইলে আমার এবং ফেলানীর আত্মা শান্তি পাবে।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন অধিকারকে বলেন, ফেলানীর রক্ত বৃথা যায়নি। ফেলানী হত্যার আগে সীমান্তে ট্রিগার ফ্রি ছিল। এখন বিএসএফ গুলি করলে জবাবদিহিতার মুখে পড়ে। আগে যেমন নিত্য খুন-খারাবি ছিল, সেটা কমে এসেছে। এটা একটা আমাদের প্রাপ্তির জায়গা বলে মনে করি। কিন্তু ফেলানী হত্যা ঘিরে ন্যায়বিচার পাইনি, আমরা সেটার অপেক্ষায়।

ওডি/নিলয়

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড