• শনিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২২, ৮ মাঘ ১৪২৮  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে হতাশায় দেড় হাজার বনপ্রহরী

  এম কামাল উদ্দিন, রাঙামাটি

১৫ নভেম্বর ২০২১, ১৯:৩২
ফরেস্ট গার্ড
জঙ্গলে পাহারারত ফরেস্ট গার্ড (ছবি : অধিকার)

বন বিভাগের পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ দিন দিন দানা বাঁধছে। ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে সারাদেশে প্রায় ১৫০০ বন প্রহরীর তালিকায় দীর্ঘ বছর চাকরি করেও পদোন্নতি না পাওয়া এবং জৈষ্ঠ্যতার অজুহাতে জুনিয়ররা পদোন্নতি পাওয়ায় এই অসন্তোষ আরও ঘনিভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুনদের দেওয়া পদোন্নতির তালিকা বাদ করে চাকরিতে যোগদানের তারিখ হতে জৈষ্ঠ্যতা নির্ধারণ পূর্বক পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের জন্য ঊদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতি রাঙামাটির নেতৃবৃন্দ।

জৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির তালিকা না হওয়ায় একই পদে কাজ করে ১৯৮৫ সালে যোগদানকারী বন প্রহরীরা ২০১৭ সালে যোগদান কারীদের পদোন্নতির তালিকায় পিছিয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় বন প্রহরীদের মাঝে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধছে। অনেক বনপ্রহরী তাদের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারপরেও তাদের পদোন্নতি হয়নি।

কর্মরত বন প্রহরীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, বহু বছর চাকরি করার পরও অনেক কর্মকর্তা তাদের চাকরির শেষপর্যায়ে এসে ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে পদোন্নতির তালিকায় নিজেদের নাম দেখছেন না, যা বন প্রহরীদের কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্মচারীদের পদোন্নতির বিষয়ে ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরপর দুটি পত্র আসলেও বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় এই অসন্তোষের মূল কারণ বলে মনে করেন বন প্রহরীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘকাল চাকরি জীবনে বন বিভাগে ফরেস্ট গার্ড হয়েও নানান দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। বড় কর্তাদের নির্দেশেই কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন করতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কখনো বিট কর্মকর্তা, কখনো রেঞ্জ সহকারী, কখনো বা কম্পিউটার অপারেটর। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো তাদের হতে হয় নৌকার মাঝিও। এছাড়া বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি বিরানভূমিতে বাগান সৃজনের কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদেরকে। এসবের পাশাপাশি বনখেকো ও গাছচোর ঠেকাতে প্রতিনিয়ত নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর বন জঙ্গলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সঙ্গে নিয়ে বন পাহারা দিতে হয়। সংঘবদ্ধ গাছ চোরদের হামলায় অনেক বনপ্রহরীর প্রাণ গেছে বলে জানান তারা। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জঙ্গলে আঞ্চলিকতার কারণে আরও বেশি কষ্ট পোহাতে হয় বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে এবং ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক মো. রকিবুল হাসান মুকুল বনপ্রহরী থেকে ‘ফরেস্টার’ পদে পদোন্নতির জন্য চাকরি বহি ও হালনাগাদ তথ্যাদি প্রেরণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিঠি দেন। চিঠিতে ‘কোনো কর্মচারীর চাকুরি স্থায়ী বা নিয়মিত করা না হয়ে থাকলে চাকুরি স্থায়ী বা নিয়মিত করে চাকুরি বহিতে এন্ট্রি প্রদানপূর্বক হালনাগাদ চাকুরি বহি প্রেরণ করতে ওই বছরের ২০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন তিনি।’

বনপ্রহরীরা দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে নতুন প্রকাশকৃত জৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে তালিকাতে যারা ২০১৭ সালে যোগদানকারী তারা তালিকায় প্রথমে রয়েছেন। অথচ ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে যোগদানকারীরা তাদের পেছনে পড়ে গেছেন। বন অধিদফতরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) মো. রাকিবুল হাসান মুকুল ২৭ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে স্বাক্ষরিপত্রে বলা হয়, ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজস্ব খাতে যোগদানকৃত বন প্রহরীদের চাকরি নিয়মিত ও স্থায়ী করণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়, ‘রাজস্ব খাতে এডহক ভিত্তিক নিযুক্ত কর্মচারীদেরকেও একইভাবে নিয়মিতকরণ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মচারী এবং এডহক ভিত্তিক নিযুক্ত কর্মচারীদের জৈষ্ঠ্যতা নিয়মিত করণের তারিখ হতে গণনা করার বিধান থাকায় নিয়মিত করণের তারিখ ভিন্নতার কারণে জৈষ্ঠ্যতা নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। জৈষ্ঠ্যতা নির্ধারণের জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনায় বলা হয় (ক) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ৩০ মে ২০১৬ তারিখের মধ্যে বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সভা আহবান করে সুপারিশ প্রস্তুত করে রাখবেন। (খ) নিয়মিত করণের আদেশ জারি করতে হবে আগামী ১২ জুন ২০১৬ তারিখ, কোনোভাবেই ১২ জুন ২০১৬ তারিখের আগে বা পরে আদেশে জারি করা যাবে না। (গ) সারাদেশ থেকে একই তারিখে একযোগে আদেশ জারি করা হলে জৈষ্ঠ্যতা নির্ধারণে কোন জটিলতা থাকবে না।’ কিন্তু কেন্দ্রের দেওয়া এই পত্রের কোনো নিয়ম-কানুন মানা হয়নি বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক মো. আহমদ আলী স্বাক্ষরিত চাকরির যোগদানের তারিখ হতে জৈষ্ঠ্যতা নির্ধারণপূর্বক পদোন্নতির আবেদন করা হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন সিসিএফ-এর কাছে মার্ক করে আবেদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা প্রদান করেন। বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বনমন্ত্রীর নির্দেশনাও অমান্য করেন বলে কর্মচারীরা উল্লেখ করেন।

দীর্ঘদিন বন বিভাগের নিয়মিতকরণ করা না হলেও হঠাৎ করে জৈষ্ঠ্যতার তালিকা প্রণয়ন করে সিনিয়রদেরকে জুনিয়র আর জুনিয়রদেরকে সিনিয়রের তালিকায় উল্লেখ করে নিজেরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করার এই দায় কে নেবে- এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি বিধি-বিধান অনুযায়ী এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যখন চিঠি এলো তখন যে কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন তিনিই ভালো বলতে পারবেন, কেন তিনি নিয়মিতকরণ করলেন না। তিনি যদি নিয়মিত করতেন তাহলে আজ এই সমস্যার সৃষ্টি ও অসন্তোষ হতো না। এখন আমি তো তখনকার দায়িত্ব নিতে পারবো না। সেই বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না।’

আরও পড়ুন : মণ্ডপে যে কুরআন রেখেছে সে মাদকসেবী : ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

বন বিভাগ অধিদফতরের সিসিএফ অ্যাডমিন হুসাইন মোহাম্মদ নিশাদের কাছে বন অধিদফতরের ফরেষ্ট গার্ডদের খসড়া জৈষ্ঠ্যতার তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিধি-বিধান অনুযায়ী তালিকা প্রণয়ন করেছি। এই তালিকা দেখে যদি কেউ সংক্ষুব্ধ হয় তাহলে তারা আপিল করতে পারবে। আপিলের মাধ্যমে যদি সঠিক কাগজপত্র দেখাতে পারে তাহলে এর সুরাহা করতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে নিয়মিতকরণ বিষয়টি হচ্ছে অফিসিয়াল বিষয়। আগে হয়নি, এখন হয়েছে। তাই হয়তো খসড়া তালিকাটি দেওয়া হয়েছে।এই তালিকার বিপরীতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। আমাদের বন বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতি আমাদের সবসময় ভালোবাসা রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ করা হবে না।

ওডি/এএম

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড