• মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৪ কার্তিক ১৪২৮  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গুপ্ত খালে জীবন ঝুঁকি

  শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৪:১৬
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গুপ্ত খালে জীবন ঝুঁকি
পুলিশ পাহারা দিলেও অন্য সৈকতে তা সম্ভব হচ্ছে না (ছবি : দৈনিক অধিকার)

পর্যটন নগরী কক্সবাজার। যার বুক চিরে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। সাগরে লোনা পানিতে গা ভাসাতে প্রতিবছর ছুটে আসে লাখ লাখ পর্যটক। তবে গেল দুই বছর করোনা সংকটে তেমন পর্যটক আসেনি কক্সবাজারে। গত কয়েকমাসে কিছু কিছু পর্যটকের আগমন ঘটছে পর্যটন নগরীতে। ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ কখনো কখনো বিষাদে রূপান্তরিত হচ্ছে। অনেকেই সাগরে গোসল করতে নেমে ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে, আবার সাগরে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। তবে সৈকতে বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত খাদগুলো পর্যটকদের কাছে জীবন ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে।

জানা গেছে, ভাটার সময় সমুদ্র সৈকতে বরাবর ছোট বড় অসংখ্য গর্ত বা গুপ্ত খাল রয়েছে। কিন্তু জোয়ারের সময় সৈকত যখন প্লাবিত হয়ে ওঠে তখন এই খাদগুলো ডুবে থাকে জোয়ারের প্লাবনে। সৈকতে এরকম নির্দিষ্ট কিছু স্থানকে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক লাল পতাকা সংবলিত সংকেত দেওয়া হয়েছে ।

এছাড়াও এসব এলাকায় সমুদ্রের পানিতে নামা থেকে বিরত থাকার জন্য নিয়মিতভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। তারপরেও মাঝে মাঝেই ঘটে চলছে বড় রকমের দুর্ঘটনা। কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দময় করতে সাগরে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানিয়েছেন কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশ।

জোয়ার-ভাটার হিসাব না করে গোসলে নেমেই বিপদে পড়ছে পর্যটকেরা। আনন্দের ভ্রমণে পড়ছে শোকের ছায়া। কক্সবাজার হোটেলের গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম শিকদার জানান, এই সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিচরণ (ব্যবহার) চলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। কলাতলি, লাবণী, সুগন্ধা, সীগাল, শৈবাল পয়েন্টের পাঁচ কিলোমিটার, হিমছড়ির দুই কিলোমিটার, ইনানী দুই কিলোমিটার, টেকনাফের তিন কিলোমিটার। এ ছাড়া বাকিটা সৈকত থাকে অরক্ষিত।

আরও জানা গেছে, অরক্ষিত সৈকতে গোসলে নেমে পর্যটকেরা বিপদে পড়লে সাহায্য করার কেউ থাকে না। তাই এ ব্যাপারে সবার সতর্ক থাকা দরকার। হোটেলে ওঠার পর পর্যটকদের এসব ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। কিন্তু কার কথা কে শোনে?

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার- টুয়াকের উপদেষ্টা এসএম কিবরিয়া খান বলেন, পর্যটন স্পটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন অন্তত সৈকতের কিটকট ব্যবসায়ী, বার্মিজ স্টোরের দোকানদার, ভাসমান হকার, ক্যামেরাম্যান, বিচবাইক ব্যবসায়ী ও কর্মীরা ভালভাবে ডাল-ভাত টুকু খেতে পারবে। তাদের জীবনে বড় ঝড় গেছে। এরপর এখন সবই তো স্বাভাবিক। এখনো অরক্ষিত সৈকতে সরকারি কোনো ডুবুরি নেই, আছে কিছু লাইফ গার্ড। নিরাপত্তার জন্য টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে। বহু ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে সাইনবোর্ড বা লাল নিশানাও নেই।

কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক প্রীতিশ তালুকদার জানান, লাবণী পয়েন্টে সামনের সৈকতে এখন উত্তর-দক্ষিণে অনেক গুপ্ত খালের সৃষ্টি হয়েছে। এই গুপ্ত খালের পাশে সৈকতে না নামার জন্য পর্যটকদের সতর্ক করতে একাধিক লাল পতাকা ওড়ানো হচ্ছে। কিন্তু পর্যটকেরা এই নিষেধাজ্ঞা অনেক সময়ই মানছে না। শুধুই কি লাবণী পয়েন্ট? সি-গাল, সুগন্ধা, কলাতলী পয়েন্ট, ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর সৈকতেও একাধিক গুপ্ত বা ডুবো খালের সৃষ্টি হয়েছে। এক-একটি খাল যেন মৃত্যুফাঁদ।

এক সমীক্ষায় জানা গেছে, গত ২০ বছরে এসব ফাঁদে আটকা পড়ে মারা গেছে ২শ জনের অধিক পর্যটক। এর মধ্যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মারা গেছে ৩২ জন। নিহতদের অধিকাংশই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী।

কক্সবাজারে বেড়াতে আসা সিলেট হবিগঞ্জের করিম আহমেদ বলেন, ‘সমুদ্রে গোসল করার জন্যই তো আমরা এখানে আসি। পর্যটকদের ঘিরে এখানে সপ্তাহে শতকোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে। অথচ সৈকতে পর্যটকদের নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থাটুকু কেউ করে দিচ্ছে না। হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল তৈরি করে কি লাভ, যদি পর্যটকদের সমুদ্রে নামার ঝুঁকি থাকে?’ তিনি সমুদ্রে সীনেটিং ব্যবস্থা করার দাবি তুলেন।

জোয়ার-ভাটার সময় জানতে টুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নিন উল্লেখ করে বলা হয়, লাইফ জ্যাকেট পরে সাগরের পানিতে নামুন। তবে ভাঁটার সময় পানিতে নামা খুবই বিপদজনক। লাল পতাকা সংবলিত সংকেত থাকলে সেসব এলাকায় পানিতে নামা থেকে বিরত থাকুন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ ইসলাম জানান, সুগন্ধা, লাবণী পয়েন্টের নির্দিষ্ট জায়গায় নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে লাবণী পয়েন্টকে ‘সুইমিং জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। লাবণী পয়েন্টের সুইমিং জোন ছাড়া সৈকতের অন্য কোথাও গোসলে নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পর্যটকদের সতর্ক করতে সৈকত জুড়ে চলছে নানা প্রচারণা। তারপরও অনেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে বিপদে পড়ছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা টুরিস্ট পুলিশের (কক্সবাজার রিজিয়ন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন জানান, গত আগস্টের পর থেকে কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে পর্যটকদের আগমন বাড়ছে। এত বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা দিতে দেড় শতাধিক টুরিস্ট পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন কলাতলি, সুগন্ধা, লাবণী পয়েন্ট, শৈবাল, দরিয়ানগর, ইনানী ও হিমছড়ি সৈকতে টুরিস্ট পুলিশ পাহারা দিলেও অন্য সৈকতে তা সম্ভব হচ্ছে না।

টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের জন্য সতর্কতাবাণী প্রচার করেছে। সৈকতে নামার আগে নিশ্চিত হোন সাগরে জোয়ার, নাকি ভাটা। জোয়ার হলে বালুচরে সবুজ পতাকা উড়তে থাকে। ভাটা হলে লাল পতাকা। ভাটার সময় সাগরে নামা বিপজ্জনক।

গুপ্ত খাল (ছবি : অধিকার)

বিপজ্জনক খাদ বা গুপ্ত খাল নির্দেশনার জন্য থাকে লাল পতাকা। সাঁতার জানা না থাকলে লাইফ জ্যাকেট বা টিউব নিয়ে কোমর সমান পানি পর্যন্ত নামা যায়। শিশুদের কোনো অবস্থাতেই সমুদ্রের পানিতে নামতে দেবেন না। নারীদের শাড়ি পড়ে সমুদ্রে নামা বিপজ্জনক। সমুদ্রে নেমে কেউ বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধারের জন্য ঝাঁপ দেবেন না। দ্রুত আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাইফ গার্ডের সাহায্য নিন। মাতাল অবস্থায় সাগরে নামা খুবই বিপজ্জনক। হৃদরোগীদের জন্য উত্তাল ঢেউ বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারদিকে প্রবাল পাথরের স্তূপ। জোয়ার বা ভাটার টানে যে-কেউ পাথরের কুণ্ডলীতে আটকা পড়তে পারে। পাথরে আটকা পড়লে উদ্ধার তৎপরতাও চালানো যায় না। কক্সবাজারের ইনানী সৈকতেও আছে পাথরের স্তূপ। এখানেও সাবধান। সমুদ্রে নামার আগে হোটেল রেজিস্টারে সঠিক নাম ঠিকানা ও যোগাযোগের মাধ্যম লিপিবদ্ধ করুন। কোথায় যাচ্ছেন, তা হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রাখুন। সঙ্গে পেশাদার গাইড রাখা ভালো। দূরে কোথাও গেলে পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।

লাবনী পয়েন্টের বাম পাশে ও সুগন্ধা পয়েন্টের ডান পাশে অর্থাৎ ঝাউবন, সীগাল ও জলতরঙ্গ বরাবর, উত্তর দিকে শৈবাল ও কবিতা চত্বর সৈকতে পানিতে নামা থেকে বিরত থাকুন। সেসব এলাকায় পানির নীচে এরকম অনেক গর্ত/খাদ রয়েছে। টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওন সর্বদা পর্যটকদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। নিরাপদ ভ্রমণে টুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়।

ওডি/এসএ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড