• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

তেঁতুলিয়ায় দেখা মিলছে কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় দৃশ্য

  এম মোবারক হোসাইন,পঞ্চগড়

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৩
তেঁতুলিয়া
তেঁতুলিয়া থেকে ভারতের মনোমুগ্ধকর কাঞ্চনজঙ্ঘা (ছবি : আব্দুল্লাহ আল-আমিন আবির)

শরতের পরিস্কার নীল আকাশ। নীল আকাশে ভাসমান খণ্ডখণ্ড মেঘ। মেঘ কেটে রোদের ঝল্কানি দেখা যায় সাদা কাশবনের ওপর। হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খায় কাশবন। এও যেন আরেক মনোমুগ্ধকর আবেগঘন দৃশ্য। মন কেড়ে নেয় যেকোনো প্রকৃতি প্রেমিকের। হেমন্তের মিষ্টি রোদে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মেতে উঠে দেশের উত্তরের হিমালয় পাদদেশে অবস্থিত প্রকৃতির মায়াকন্যা তেঁতুলিয়া। নিবিড় শান্ত প্রকৃতির উত্তরের এ জনপদ প্রতিবছর শরৎ-হেমন্ত-শীত ঋতুতে সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে হাজির হয় দর্শনার্থীদের সামনে। তিন দিকে প্রতিবেশী ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সীমান্তবেষ্টিত দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় হেমন্ত জুড়ে খুব কাছে দেখা যায় নেপালের আকাশচুম্বী হিমালয় পর্বত।। এই নান্দনিক গিরি-সৌন্দর্যের সঙ্গে আছে তেঁতুলিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যিক স্থাপত্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নার, রওশনপুর জেমকন গ্রুপের শিশুপার্ক ও আনন্দধারা পার্ক, সীমান্তবেষ্টিত ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সার্চলাইট, নদী মহানন্দা, সবজি গ্রাম, পাথর ও চা-শিল্প।

হেমন্তের এই সময় নির্মল আকাশে দেখা মিলছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়। আকাশচুম্বি হিমালয় দেখে চোখ জুড়াতে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন তেঁতুলিয়ায়। এখান থেকে খুব কাছে স্পষ্ট দেখা যায় হিমালয় পর্বত। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের গিলগিটে সিন্ধু নদী থেকে শুরু করে ভারত, তিব্বত, নেপাল, পূর্ব ভারত ও ভুটান হয়ে দণিপূর্ব তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের দণিাঞ্চলীয় বাঁক পর্যন্ত বিপুল স্থলভাগ জুড়ে অবস্থান হিমালয় পর্বতের। সমভূমি থেকে সারিবদ্ধ অনুচ্চ পাহাড়ের ভিত ধরে উচ্চ থেকে আরও উচ্চে উঠে গেছে হিমালয়ের শ্রেণি আর তার অভ্রবেদী চূড়াশৃঙ্গ, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুবিখ্যাত মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার), মাউন্ট কে-টু (৮,৬১০ মিটার) ও কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৫ মিটার)।

হিমালয় পর্বতের পাদদেশে বলে দেশের এই উত্তর জনপদে শীত হয়ে ওঠে মাত্রাতিরিক্ত। তীব্র শীত পড়ে এখানে। কুয়াশায় ঢেকে যায় পুরো অঞ্চল। ভোরের সোনালি রোদে শিশির হয়ে ওঠে মুক্তোদানা। বিশাল এই উপমহাদেশে তুষার-হিমবাহের একটিই আস্তানা- হিমালয়। এর গগণস্পর্শী সুউচ্চ চূড়াগুলো স্থায়ীভাবে জমাট বরফের বিস্তীর্ণ আস্তরণে ঢাকা। সেখান থেকে নেমে আসছে অসংখ্য ছোট-বড় হিমেল রসনা যা হিমবাহ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে চিত্তাকর্ষক কয়েকটি হিমবাহ হচ্ছে ২৬ কিমি দীর্ঘ জেমু (সিকিম) ও কাঞ্চনজঙ্ঘা (দৈর্ঘ্য ১৬ কিমি)। তা ছাড়া উত্তর-পূর্বে আসামের পর্বতমালা, উত্তরে মেঘালয় মালভূমি ও অধিকতর উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা থাকার এখানে শীতের তীব্রতার অন্যতম কারণ।

স্বপ্নপূরী দার্জিলিং: হিমালয়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে অনাবিল সুন্দর স্বপ্নপুরী দার্জিলিং। দার্জিলিং হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার একটি বাণিজ্যিক শহর এবং পর্যটন নগরী। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি রয়েছে এই দার্জিলিংয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা মেলে অপূর্ব সুন্দর সূর্যোদয়। শহরটি নিম্ন হিমালয়ের মহাভারত শৈলশ্রেণিতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুট (২,১৬৪.১ মিটার) উচ্চতায় হওয়ায় হিমালয়ের সঙ্গে জড়াজড়িভাবেই তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যায় মেঘের দেশ ও পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব চিরহরিৎ ভূমি দার্জিলিং।

মেঘকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা: হিমালয় পর্বতমালার পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ও কে-টুর পরের অবস্থানে রয়েছে অনুপম সৌন্দর্যের গিরিবধূ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এটি পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার রয়েছে চমকপ্রদ এক ইতিহাস! কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের চিত্তাকর্ষক সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় করেন। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব সৌন্দর্য তেঁতুলিয়ায় বসে দেখা যায় অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। মেঘমুক্ত আকাশে স্পষ্ট দেখা যায় বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। রাতে দেখা যায় শিলিগুড়ির উজ্জ্বল আলো। পাহাড়েরই অপর ঢালে স্বপ্নপুরী দার্জিলিং। বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর দিনের প্রথম সূর্যোদয়ের সূর্যকিরণের ঝিকিমিকি দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধতার মোহ ছড়ায়।

উত্তরের পর্যটনকন্যা তেঁতুলিয়া: হেমন্তের রোদে একদিকে দৃশ্যমান নেপালের আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বত, ভারতের স্বপ্নপুরী দার্জিলিং আর অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্যদিকে রয়েছে তেঁতুলিয়ার অপরূপ সৌন্দর্য। বিশেষ করে সীমান্তের তীর ঘেঁষা ভারত-বাংলাদেশের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীর তীর থেকে চোখ জুড়িয়ে দর্শন করা যায় আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বত, পর্বতশৃঙ্গকে জড়িয়ে থাকা নান্দনিক সৌন্দর্যকন্যা দার্জিলিং ও কাঞ্চনজঙ্গা। উত্তরের বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট এবং দেশের অন্যতম স্থলবন্দর। এ বন্দর থেকেও চোখ মেলে দেখা যায় দৃশ্যমান আকাশছোঁয়া হিমালয়, দার্জিলিং ও কাঞ্চনজঙ্ঘা।

এদিকে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই পর্যটকরা মনোমুগ্ধকর এই দৃশ্য দেখতে জড়ো হচ্ছেন তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোতে। কেউ এসেছেন বন্ধুদের সাথে। আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন। মহানন্দার তীর থেকে কেউ তৃপ্ত দৃষ্টিতে দেখছেন হিমালয়ের দৃশ্য আবার কেউ মুঠো ফোনের সাহায্যে তা ক্যামেরা বন্দি করছেন। কেউ বা তুলছেন সেলফি। মহানন্দার পাড় থেকে এভাবেই চোখের সামনে প্রকৃতির অপরূপ চিত্রছবি অবলোকন করে পর্যটকরা।

সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সময় হিমালয়ের রূপও পরিবর্তিত হয়। যা প্রকৃতিপ্রেমিদের আরও মুগ্ধ করে। উত্তর আকাশে দেখতে পাওয়া নয়নাভীরাম হিমালয় মূলত বরফে আচ্ছাদিত শুভ্র মেঘের মতো লাগে। তার সাথেই রয়েছে পিরামিডের মতো এভারেস্টের চূড়া। নিচের অংশে কালো ও সবুজ আকৃতির পাহাড়টি মূলত কাঞ্চনজঙ্ঘা।

পঞ্চগড় সদর থেকে আগত ফটোগ্রাফার আব্দুল্লাহ আল-আমিন আবির দৈনিক অধিকারকে জানান,তেঁতুলিয়া থেকে প্রতিবছরই হিমালয়ের দৃশ্য ধারণ করি। এবার এসেছি দৃশ্য ধারণ করতে। তবে এবার আকাশ মেঘমুক্ত আকাশ হওয়ায় বেশ স্পষ্ট দেখা মিলছে।

তেঁতুলিয়া স্থানীয় সংবাদকর্মী ও ড্রাগ ফ্রি বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠা ও চেয়ারম্যান আতিকুজ্জামান শাকিল দৈনিক অধিকারকে বলেন,গত কয়েকদিনের বৃষ্টির পর আজকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূর্লভ দৃশ্যের দেখা মিলছে। আশা করছি এবছর আরও কিছুদিন এ দৃশ্যের দেখা যাবে এবং বেশি পর্যটকের মিলন মেলায় পরিণত হবে।

তেঁতুলিয়া ট্রাভেল এন্ড ট্যরিজমের পরিচালক এস কে দোয়েল বলেন,গত কয়েকদিন থেকে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার খুব ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে। যদিও বিগত মাস থেকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা কাঞ্চনজঙ্ঘার অবলোকন করতে আসছেন।

তেঁতুলিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু জানান, প্রতি বছর শীতকালে তেঁতুলিয়ায় হাজার হাজার পর্যটক খালি চোখে হিমালয় দেখতে আসে। এখানে এছাড়াও কয়েকটি পিকনিক স্পট ও চা বাগানসহ কিছু দর্শনীয় জায়গা রয়েছে। যা সহজেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে তেঁতুলিয়া দেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।

ওডি/এফই

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড