• রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জাতীয় শুদ্ধাচার পুরষ্কারে ভূষিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ জুলাই ২০২১, ১৬:২৮
জাতীয় শুদ্ধাচার পুরষ্কারে ভূষিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম (ছবি : সংগৃহীত)

ফিকল-টেটার রাজ্য হিসেবে পরিচিত জেলা হবিগঞ্জ। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি, হানাহানি এবং রক্তারক্তির মতো জঘন্য খেলায় মেতে উঠে সাধারণ জনগণ। বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে তাদের এই বিরোধ। মামলা মোকাদ্দমায় জর্জরিত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয় অনেক পরিবারকে।

কালের বিবর্তনে দাঙ্গার কালো ছায়া যখন হবিগঞ্জবাসীকে গ্রাস করেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের দায়িত্বে পদায়িত হন মো. রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবা।

পুলিশ সুপার মো. মোহাম্মদ উল্লাহ বিপিএম-পিপিএমের নির্দেশনায় মো. রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবা হবিগঞ্জ সদর সার্কেল যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল, লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ থানায় সংঘটিত অপরাধ পর্যালোচনা করেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণ চিহ্নিত করেন।

বংশ পরম্পরায় চলতে থাকা বিরোধের মূল কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। থানা এলাকার প্রতিটি গ্রামে পাঁচ শতাধিক বিট ও কমিউনিটি পুলিশিং সভার আয়োজন করেন। দাঙ্গা-হাঙ্গামার কুফল সম্পর্কে সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করেন। ফিকল-টেটার কালো সংস্কৃতি থেকে হবিগঞ্জবাসীকে বের করার চেষ্টা করেন। হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের প্রাপ্ত সেবাটুকু প্রদানের প্রয়াসে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং খুব শীঘ্রই তিনি অভিনব এক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

মহৎ এই উদ্যোগের নাম ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ কার্যক্রম। দীর্ঘ মেয়াদী বিরোধ কিংবা ছোটখাটো যে কোনো ঘটনার অভিযোগপ্রাপ্ত হলে বিষয়টি মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত ঠেলে না দিয়ে অত্যন্ত মানবিক বিবেচনায় স্ব-উদ্যোগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশের নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদেরকে নিয়ে বিরোধগুলো সার্কেল অফিস ও থানায় বসে নিষ্পত্তি করেছেন।

এরই মধ্যে তিনি প্রায় ছয়শ সমস্যা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে শেষ করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে তার কর্মকালীন এই সার্কেলাধীন থানাগুলোতে পূর্বের তুলনায় (হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা- ২২০টি, লাখাই- ১২৪টি, শায়েস্তাগঞ্জ- ১০৫টি) সর্বমোট ৪৪৯টি মামলা কম রুজু হয়েছে। তার মানবিক কর্মকাণ্ডে দিনে দিনে অসহায় হতদরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের ভরসাস্থলে পরিণত হয় হবিগঞ্জ সদর সার্কেল কার্যালয়।

আরও পড়ুন : রামেকের করোনা ইউনিটে ১৬ দিনে ২৮২ মৃত্যু

ভুক্তভোগীগণ অত্র কার্যালয়ে আসার পর মো. রবিউল ইসলাম তাদের সকল অভিযোগ মনোযোগ সহকারে শুনতেন। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে অত্র কার্যালয়ে আসার জন্য নোটিশ পাঠাতেন। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ধার্য তারিখে উপস্থিত হলে তিনি মনোযোগ সহকারে একে একে সকলের বক্তব্য শুনে বাস্তবমুখী নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন।

নিরপেক্ষতার কারণে পক্ষ-বিপক্ষদ্বয় অকপটেই সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করতেন ও তাদের মধ্যকার বিরোধ খুব সহজেই মীমাংসা হতো। যার ফলশ্রুতিতে বংশ-গোষ্ঠীগত বিরোধ এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা বর্তমানে হ্রাস পেয়েছে। সাধারণ মানুষ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়েছে। মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন এসেছে।

মানুষ বুঝতে শিখেছে, মামলা-মোকদ্দমায় অর্থ ব্যয় করা মূল্যহীন। তিনি শুধু বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে পারদর্শী নয়, তিনি একাধারে অনেক গুণাবলি সম্পন্ন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি সৎ, বিচক্ষণ, সাহসী, দক্ষ এবং ধৈর্যশীল। তিনি অভিনব কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লু-লেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছেন। যে সকল মামলার আসামী গ্রেফতার নয় বরং মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়েছে সেই সকল মামলার মূল রহস্য উদঘাটন এবং আসামী গ্রেফতারে তিনি সক্ষম হয়েছেন। কর্মকালীন সময়ে তিনি প্রায় ২৫টি ক্লু-লেস হত্যা মামলা রহস্য উদঘাটন এবং আসামী গ্রেফতার করেছেন।

এক সময়ে হবিগঞ্জ জেলাবাসীর এক আতংকের নাম ছিল ‘ডাকাতি’। আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্যগণ হবিগঞ্জ জেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ডাকাতি পরিচালনা করত। প্রায় সময় ডাকাতি সংবাদ শুনা গেলেও ডাকাতরা থাকত ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফলশ্রুতিতে তারা তৈরি করেছিল বিভিন্ন গ্রুপ এবং দল। মো. রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবার সঠিক নেতৃত্ব, সাহসী অভিযান এবং নিরলস প্রচেষ্টায় প্রায় ৩৯ জন ডাকাতকে গ্রেফতার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

তার এ রকম কর্মকাণ্ডে হবিগঞ্জ সার্কেলের প্রায় ৯৫ ভাগ দাঙ্গা হ্রাস পেয়েছে। জনজীবনে ফিরে এসেছে শান্তি ও স্বস্তি। ফিকল-টেটার সংস্কৃতি আজকে ইতিহাস হতে চলেছে। মাডার, ডাকাতি হ্রাস পেয়েছে। জনসাধারণের মধ্যে দাঙ্গা, মাদক, ইভটিজিং, বাল্য বিবাহ, যৌতুক, প্রযুক্তির অব্যবহার বিরোধী মনস্তত্ব তৈরি হয়েছে।

এতে মামলা মোকদ্দমায় না জড়ানোয় হবিগঞ্জ সার্কেলাধীন থানাগুলোর জনগণ কোটি কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হতে রক্ষা পেয়েছে। ফলে প্রতিটি পরিবার, গ্রাম, ইউনিয়ন, সর্বোপরি সার্কেলাধীন এলাকায় শান্তিময় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিবেশ বিরাজ করেছে। এটি হবিগঞ্জের মানুষের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা ছিল।

যেটি তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম পেশাদারিত্ব, সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, আন্তরিকতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এভাবে পুলিশ ও জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের টেকসই সেতু বিনির্মিত হয়েছে। ২০১৮ সালের ৫ মার্চ অত্র সার্কেলে যোগদান করেন।

আরও পড়ুন : ময়মনসিংহ মেডিকেলের করোনা ইউনিটে আরও ১৩ মৃত্যু

চলতি বছরের ১৪ মার্চ ন্যায় নিষ্ঠ ও সততার প্রতীক মানবিক এই পুলিশ কর্মকর্তা হবিগঞ্জ জেলা হতে বদলি হন। তাঁর এই বিদায়ে হবিগঞ্জ বাসী অশ্রুসিক্ত। সততা, দক্ষতা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা, মানবিকতা এবং নিরলস কর্ম প্রচেষ্টায় হবিগঞ্জবাসীর হৃদয়ে তিনি যে জায়গা করেছেন, তা হবিগঞ্জবাসী কখনো ভুলতে পারবে না। তার কীর্তি গাঁথা কর্মের কথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ওডি/কেএইচআর

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet