• রোববার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

এগিয়ে যাচ্ছে পঞ্চগড়ের চা শিল্প

  এম মোবারক হোসাইন,পঞ্চগড়

০৫ জুন ২০২১, ১০:০১
চা বাগান (ছবি : দৈনিক অধিকার)

দেশের সর্বোত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে চা শিল্প। এ চা শিল্প শুধু পঞ্চগড় নয় এই প্রশ্নটি বদলে দিচ্ছে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলার জনজীবন। নতুন নতুন সম্ভাবনা জেগে উঠেছে এই এলাকায়। নতুন আশায় নতুন স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছে প্রান্তিক এলাকার মানুষ।

১৯৯৬ সালের কথা। রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ে সমস্যা ও সম্ভাবনা সরেজমিনে ঘুরে দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পঞ্চগড়ে তখন চারিদিকে অনাবাদী জমি। হিমালয়ান কন্যা খ্যাত এই জেলার পতিত সমতল ভূমিতে একটি মাত্র ফসল উৎপাদন করে চাষিরা। বিরাজ করছে ঘরে ঘরে অভাব অনটন। কুসংস্কারে জর্জরিত শিক্ষার অভাবে। প্রতিবছর বিরাজ করতো মঙ্গা আকাল। গ্রামে গ্রামে দরিদ্র পুষ্টিহীন মানুষ দেখে প্রধানমন্ত্রী বিচলিত হয়ে পড়েন। শেষ সীমান্ত তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট যাবার সময় রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে কিছুটা পথ পায়ে হেটে যেতে হয় তাঁকে। তার সাথে ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সহ দলীয় নেতৃবুন্দ। এ সময় সীমান্তের খুব কাছেই তিনি দেখতে পান ভারতীয় বিশাল বিশাল চা বাগান। সাথে সাথেই তিনি জেলা প্রশাসককে সেই ঐতিহাসিক প্রশ্নটি করে বসেন। পঞ্চগড় এবং ভারতের মাটি একই রকম। ভারতীয় মাটিতে চা হলে বাংলাদেশে হয়না কেন? তিনি সাথে সাথেই একটি চা গাছ সংগ্রহ করে পঞ্চগড়ে লাগাতে বলেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সিলেট থেকে চায়ের চারা সংগ্রহ করে সার্কিট হাউজে লাগিয়ে দেখলেন পঞ্চগড়ে চা চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনের পর দিন এই জেলায় গড়ে উঠেছে বৃহৎ বৃহৎ চা বাগান। সরকার স্থায়ীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে শুরু করে সমতল ভূমিতে ক্ষুদ্র চা চাষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একটি বক্তব্যে বলেন, 'আমি পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট গেলাম। বর্ডার পর্যন্ত হেটে গেলাম। বর্ডার পর্যন্ত গাড়ি যায় না। কয়েক মাইল হেটেই গেলাম। আমি দেখলাম ভারতে প্রচুর চা বাগান। একই মাটি। তখন ওদের সাথে একটা ঝগড়া চলছিল। তারা চা বাগানের ড্রেন চাচ্ছিল নো ম্যন্ডস ল্যান্ডে। আমাদের তরফ থেকে বাধা দেয়া হয়। তবে তাদের সাথে আলাপ আলোচনা পর সেটা করতে দেয়া হয়। তখন তৎকালীন ডিসিকে আমি বললাম ওদের কাছ থেকে একটি চারা এনে আমাদের মাটিতে লাগিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। ডিসির বাংলোতেই তিনি চা গাছের চারা তৈরি করল এবং তিনি টবে করে চা গাছ এনে আমাকে দেখাল যে আমাদের এই মাটিতে চা হবে। তারপরেই আমরা উদ্যোগ নিলাম। স্বাভাবিক ভাবে সরকারি ভাবে চা বাগান করতে গেলে অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বেসরকারি খাতে কারা উদ্যোক্তা তাদের সুযোগ করে দেয়া হোক। আজকে আমরা দেখছি ইংল্যান্ডের হেরোল্ডেও পঞ্চগড়ের চা পাওয়া যাচ্ছে'।

নানা গবেষণার পর ২০০০ সালে ক্ষুদ্র আকারে চা চাষ শুরু হয় এই জেলায়। বর্তমানে বদলে গিয়েছে এই জেলার পরিচিত্র। গড়ে উঠেছে বাড়িতে বাড়িতে চা বাগান। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে স্বস্তির নিশ্বাস। নতুন নতুন আধুনিক সুসজ্জিত বাড়ি হচ্ছে গ্রামে গ্রামে। চা চাষিদের ছেলে-মেয়েয়েরা হয়ে উঠছে উচ্চশিক্ষিত। নতুন নতুন স্বপ্নে বিভোর এখন এই জেলার মানুষ। শুধু পঞ্চগড়ই নয় উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় শুরু হয়েছে চা চাষ। গত তিন বছর থেকে উৎপাদনের দিক দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছড়িয়ে পঞ্চগড় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জেলার ক্ষুদ্র চা চাষিরা বলছেন সমতলে চা বাগান করে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সমতলের চা বাগান দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখন সারাবছর হাজার হাজার পর্যটক ঘুরতে আসেন এই এলাকায়। চা চাষিরা বলছেন এখন টি ট্যুরিজমের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এই এলাকায়। শুধু চাবাগান নয় এই এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় আঠারোটি চা কারখানা।

স্থানীয় অনেকেই এখন চা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে ইন্ডাস্ট্রির মালিক হয়ে গেছেন। তাদের উদ্যোগে স্থানীয় বেকারদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। তেঁতুলিয়ার চায়ের গ্রাম বলে খ্যাত পেদিয়াগজ এলাকার চা চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, আমার বাবা ইশাহাক মণ্ডল ও স্থানীয় আরও কয়েকজন প্রথম ক্ষুদ্র চা চাষ শুরু করে। বর্তমানে আমরা অনেক ভালো আছি। এই এলাকায় প্রচুর মানুষ চায়ের গ্রাম দেখতে আসে। ট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় কারখানা মালিক শেখ ফরিদ বলেন, আগে অন্য ব্যবসা করতাম। আমার মায়ের চা বাগান ছিল। ফ্যাক্টরিতে নিয়ে গেলে নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতাম। বর্তমানে নিজেই চা কারখানা স্থাপন করেছি। এই এলাকার অনেক বেকার মানুষের আমার চা কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সাথে স্থানীয় চাষিদের ঝামেলাও কমেছে।

তবে অভিযোগ উঠেছে কারখানা মালিকদের সিডিন্ডকেট আচরণের কারণে সঠিক দাম পাচ্ছেনা ক্ষুদ্র চা চাষিরা। কারখানা মালিকরা এক ধরনের দালাল তৈরি করে কাঁচা চা পাতার দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে অনেক সময় সকাল-বিকাল কাঁচা চা পাতার দাম উঠা নামা করে। সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অবৈধ ভাবে চাষিদের ঠকাচ্ছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি আশা করেন তারা।

তবে চাষিদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন চায়ের অকশন বিবেচনায় চা চাষিদের কা চাপাতার মূল্য পরিশোধ করা হয়।

বাংলাদেশ টি বোর্ডের নর্দান বাংলাদেশ চা প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডায়নামিক দৃষ্টি এবং একটি মাত্র প্রশ্নের কারণেই বদলে গিয়েছে এই এলাকার মানুষের জীবন যাত্রা। এই জেলার সমতলের চা বাগান ঘিরে টি ট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কাচা চা পাতার দাম বর্তমানে ঠিকই আছে বলে মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা ।

উল্লেখ্য যে ২০২০ সালে পঞ্চগড়সহ উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় সমতলের ১০টি চা-বাগান ও ৭ সহস্রাধিক ক্ষুদ্রায়তন চা-চাষির চা-বাগান থেকে ১ কোটি ৩ লাখ বা ১০ দশমিক ৩০ মিলিয়ন কেজি চা-উৎপাদিত হয়েছে। এ বছর চায়ের জাতীয় উৎপাদনের হয়েছে ৮৬.৩৯ মিলিয়ন কেজির মধ্যে উত্তরাঞ্চলের সমতলের চা-বাগান থেকে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে।

কোভিড পরিস্থিতেও এ বছর চা উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা-বোর্ড কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী (উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায়) জেলার ১০টি নিবন্ধিত ও ১৭টি অ-নিবন্ধিত চা-বাগান, ৭ হাজার ৩১০টি ক্ষুদ্রায়তন চা-বাগানে (নিবন্ধিত ১ হাজার ৫১০টি) মোট ১০ লাখ ১৭ হাজার ৫৭ একর জমিতে চা-চাষ হয়েছে। এ সব চা-বাগানসমূহ থেকে ২০২০ সালে ৫ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি সবুজ চা-পাতা উত্তোলন করা হয়েছে। যা থেকে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের ১৮টি চলমান চা-কারখানায় ১ কোটি ৩ লাখ কেজি চা উৎপন্ন হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় ২০২০ সালে ১ হাজার ৪৮৯ একর চা-আবাদি জমি বেড়েছে। আর চা উৎপাদন বেড়েছে ৭ দশমিক ১১ লাখ কেজি।

ওডি/এমএ

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড