• মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নুসরাত হত্যা : ঝুলে আছে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

  এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

২৪ অক্টোবর ২০২০, ১৯:১৪
ফেনী
ফাইল ছবি

ফেনীর আলোচিত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফী হত্যার রায় প্রকাশের ১ বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর তৎকালীন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ বহুল আলোচিত এ মামলায় অভিযুক্ত ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন।

পরে মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৪ আসামি খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করে। দীর্ঘ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রায় কার্যকর না হওয়ায় নুসরাতের স্বজনদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে।

এর আগে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানীর অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় বিগত বছরের ৬ এপ্রিল পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে ছাদে ঢেকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা করে তার সহপাঠীরা। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরই ঘটনাটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশী গণমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় তোলে। ঘটনাটি জড়িতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

অপরদিকে শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাকে থানায় ঢেকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ধারণ করে তা প্রচারের ঘটনায় ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সুমন আইসিটি আইনে আরও একটি মামলা দায়ের করেন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর )নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এখনো পুলিশ ওই বাড়িটিতে পাহারা বসিয়ে নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা দিয়ে আসছেন। বাড়িতে এখনো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেনি। নুসরাতের বাবা, মা ও দুই ভাই তার স্মৃতিরোমান্থন করে এখনো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।

নুসরাতের পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ শে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার হন নুসরাত জাহান রাফি। ওই ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন। একইদিনই পুলিশ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। ওই মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের অনুসারী ও সহপাঠীরা নুসরাত ও তার পরিবারের সদস্যদের চাপ দিতে থাকে।

২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল খুনিরা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা নেয়। ৬ এপ্রিল নুসরাত আলীম পরীক্ষা দিতে এলে সহপাঠীরা সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে হত্যার চেষ্টা চালায়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়।

ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ও অবস্থার অবনতি হলে নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল রাতে মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ওই বছরের ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১৬ জন আসামিকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট প্রদান করেন।

২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে ৬১ কার্য দিবসের মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণাকালে সকল আসামির ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেন বিচারক মামুনুর রশীদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে একলাখ টাকা করে জরিমানা দণ্ডেও দণ্ডিত করেন।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীণ সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

নিম্ম আদালতে রায়ের পর প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ, নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসাইন ও উম্মে সুলতানা পপি খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিলটি এখনও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এম. শাহজাহান সাজু জানান, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়।

সে অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়েছিলো। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়। আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেছেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংকটময় পরিস্থিতি কেটে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটির শুনানি হবে।

এদিকে নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে ১৫ এপ্রিল তৎকালীন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন।

মামলাটি তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২৭ মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেন আদালত। ১৬ জুন রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

১৭ জুলাই অভিযোগ গঠন শেষে ৩১ জুলাই থেকে এ মামলায় স্বাক্ষ্যগ্রহন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ নভেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত ২৮ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন বিচারক মোহাম্মদ আস সামছ জগলুল হোসেন। রায়ে ওসি মোয়াজ্জেমের ৮ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে ট্রাইব্যুনাল। এটি বাংলাদেশের প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত রায়।

মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায় বিচার পেয়েছি। রায় দ্রুত কার্যকরের মাধ্যমে নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে। ঘাপটি মেরে থাকা অপরাধীদের জন্য এটি হবে একটি নিদর্শন। রায়ের এক বছর পরও সাজা কার্যকর না হওয়া অপ্রত্যাশিত। জরুরী ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের আপিল শুনানি শেষে দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবি জানান তিনি।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড